২৩ অক্টোবর ২০২০

ছায়াময় মায়াময়

-

চল্লিশ দিন পার না হতেই কুসুমের বাপ বাড়ি থেকে বের হয়ে ‘কামাই’ করতে চলে গেল। এতগুলো মানুষের খানাখাদ্যের জন্য সের তিনেক চাল আর সের দুয়েক আলু রেখে গেল। যাওয়ার সময় কুসুমের হাতে ময়লা দুইটা দশ টাকা, তিনটা পাঁচ টাকা আর ক’টা দুই টাকার নোট দিয়ে কইল- ‘মাওরে, এই তোর নয়া বইনটার জন্য যা নাগে টাগে আনি দেইস।’ এই টাকা গুনতে সে জিভের ডগায় আঙুল ভেজালো দু’বার। কুসুমের মা মুখ ফিরিয়ে শুয়েছিল, মুখ ফেরাল না বা কোনো কথাও বলল না। ‘ভাই গুলাক দেখিস, আর তোর মাও কাঁচা পোয়াতি, এলাও চল্লিশ দিনও হয় নাই তারপাকেও এনা খেয়াল থুস। বউয়ের দিকে মুখ তুলে কন্যাকে বলে ‘মুই গেনুরে মা... ব্যবসা বাণিজ্য না করলে কামাই হইবে ক্যাম্বা করি! বাড়িত বসি থাকলে কি আর কামাই হাঁটি হাঁটি আইসে’! বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে- ‘ওই নেংড়ি হাঁট যাই’ বলে সে বাণিজ্যের পথে হাঁটা ধরল। অচেনা মানুষকে চেষ্টা করে চেনা যায় কিন্তু চেনা মানুষ অচেনা হলে! ঘরে মায়ের এ অবস্থা, একটা নয়া ছাওয়াল- বাপকে কুসুমের অচেনা ঠেকে!
দিন দৌড়ায় না, দিন বসেও থাকে না দিন চলে নিজস্ব নিয়মে। চাল আলু হাতের টাকা সব শেষ। কলার থোর, ক্ষেতের শাক, এবাড়ি ওবাড়ির চেয়েচিন্তে আনা ভাত তরকারি বা এখন আম কাঁঠালের সময় সে আম কাঁঠাল কোনো কিছুর তলানিও আর পড়ে নেই। কাঁঠালের বিচিগুলাও শেষ। দুই দিন ধরে নিক্কোল উপাস। কুসুম ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে চারপাশ থেকে ওকে সেই গহ্বরেই ঠেলে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কে ঠেলছে! বাপ! মা! গেড়িগুগলি ভাইবোন গুলা! তারপরও ও বোঝে সময় আসন্ন। সব দরজা বন্ধ হয়ে সেই দরজার দিকেই এগিয়ে দিচ্ছে নিয়তি... ভেতরটা কেমন যেন ওপরের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। সব ফেলে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারে না, ছোট ছোট ভাইবোনগুলা কোনো সময় মুখফুটে বলে না বুবু ভাত দে। কেবল মাঝে মধ্যেই খেলা বাদ দিয়ে মায়ের পিঠের কাছে, নেংড়ির মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে আঁচিল হয়ে লেগে থাকে। ওদের দিকে তাকালে মনটা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যায়। আজ সকালে মাও মিনমিন করে কইছিল- ‘মাও, এ্যানা কারো বাড়ি থাকি চাউল চায়া আনলি হইত রে মা। প্যাটে কেমন বিষ করে, তোর বইনটাও দুধ পায়ছে না’।
আর কার বাড়ি থাকি চাউল আনবে! আর কে দেবে! এক ওই মাস্টারনি নানী কিছু দেয়, সেইবা আর কত দেবে! মায়ের ছাওয়ালটা হওয়ার পর থেকে ভাত, রুটি, কাপড়-চোপড় দিছে, কিছু টাকা পয়সাও দিছে, আর কত! কুসুম জানে চাউলটা কার কাছ থাকি আনা লাগবে। তার জন্যও তো একটা সময় আছে, একটা প্রস্তুতি আছে...মনটাকে পাত্থর বানাইতে হয়, শরীরটাকে পর করে দিতে হয়। দুনিয়াটা এমন ক্যানে! হ্যাঁ সে চাউল, আটা, আকালি পেঁয়াজ সবই দেবে, একসময় কইবে ‘যা যা লাগে তুই নিয়া যানা আহহারে! নে নে... আর কী লাগবে! নাশতার বাদে সুজি সেমাই লাগবে না! চিনি’! সব দেয়া শেষে আবার কিছু চকোলেট, লেবেঞ্চুস হাতে দিয়ে কইবে ‘এগুলা তোর জন্যে, তুই খাস ময়না’।
কিন্তু... তার তো আছে, ঘরভর্তি জিনিস আছে, এই উপাস করা মানুষগুলারে যদি কিছু দেয় তো কী হয়! কুসুমের ছোট্ট মাথায় কিছু ঢোকে না, কিচ্ছু বোঝে না।
আরো কিছু দিন চলে যায়, কিন্তু আর তো পারা যাচ্ছে না, কুসুমের নিজেরওতো প্যাট আছে, সে প্যাটও খাবার চায়, খালি হলে চিনচিন করে নাভি থাকি গলা পর্যন্ত জ্বলে। গুরি গুরি ভাইবইনগুলা এক্কেরে নেতায় পড়ছে, কাল রাইতে দুইটায় মায়ের হাতে মাইর খাইছে। বাপ যে আপাতত আসবে না সে কথা কুসুম ভালো করেই জানে। তার বাণিজ্য কবে শ্যাষ হইবে সেটা সেই জানে, আর তার আল্লাহ জানে!
ওর কানে ফুসমন্তর দেয়া আছে দুপুর সময়টা সুনসান, সুবিধাজনক। সে সময় কেউ কেনাকাটা করে না। পাড়ার মানুষ গোসল খাওয়া সেরে ঘুম দেয় না-হলে টিভিতে সিরিয়াল দেখে। কাজেই দুপুরই সই... সারাটা সকাল কুসুম কান্দাকাটি করে হলুদ রঙের মুখটা তেলুয়া পিঠার মতন ফুলায় ফেলল অতঃপর ওড়নার কোনায় চোখ মুখ মুছে কচি বুকের ওপর ন্যাতা ওড়নাটা ছড়ায়ে দিয়ে পা বাড়ালো, পা বাড়ালো ক্ষিধের অন্ধকার থেকে ভরাপেটের আলোতে, যে আলো আর অন্ধকারকে সে এক ওড়নাতে সেলাই করে। মা ওর কান্নাকাটি দেখিও দ্যাখে না, শুনিও শোনে না, বাণিজ্য করা বাপের বেটিদের কান্নাই সম্বল, দুনিয়াতে সবচাইতে নিষ্ফলা হইল মাইয়া মাইনষের চউখের জল, দেখি কি হইবে! বরং বেটি যেদিন যেদিন কান্দে সেদিন বাড়ির সব্বারই ভরাপেটের ঢেকুর ওঠে। কুসুমের সাথে সাথে তিন ঠ্যাঙ্গা নেংড়ি আর গনগনে সূর্যটাও হাঁটতে থাকে। কুকুরটা শক্তি, সামর্থ্য আর একটা পা হারিয়ে, জগতের কোথাও জায়গা না পেয়ে ঠাঁই নিয়েছে কুসুমদের ঘরে, ওরা যে যেখানে যায় এই নেংড়িও সাথে থাকে, হয়তো কৃতজ্ঞতা দেখায়। স্থির হয়ে বসা মায়ের চোখের দু’টি জলের ধারা বাড়ির চৌহদ্দি, রাস্তা, মাঠ পেরিয়ে গিয়ে মেশে খালপাড়ের জলের সাথে।
এপাড়া ওপাড়া দূরত্বের পথ রোদে পোড়া ধুলা উড়তে উড়তেই শ্যাষ হয়। এই বয়সেই কুসুম মানুষের হৃদয়বৃত্তির চরম পরিচয় জেনে গেছে। অতি কঠিন দিন পার করে করে বেড়ে ওঠা মেয়েটা একটু পরে কী হবে জেনেও দোকানে পৌঁছে শুকনা ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে, সেটাই বুঝি অবুঝ কন্যার সবুজ হাসি হয়ে যায়! মুখ তুলে সে হাসি দেখে একেবারে বিভ্রান্ত হয়ে যায়, বাপের জানি দোস্ত ফেজ্জাচাজি। কন্যার চোখের দিকে একনজর তাকায়, তাকিয়ে সব বুঝে যায়। বোঝার পরে তার ব্যস্ততা দেখার মতো।
‘ও তুই আলছিস! ও ময়না আলছিস! ওরে মোর ময়নাপাখি আইছেরে! এদ্দিনবাদে আসলু! খাড়া, খাড়া’ এই বলে সে অতি দ্রুত হাতে মালসামাল গুছিয়ে, এক হাতে কুসুমকে টেনে নিয়ে কচ্ছপের মতো গলা বাড়িয়ে ডানে-বামে দেখে নিয়ে দোকানের ঝাপ বন্ধ করে দেয়। দোকানের পেছনে মালামাল রাখার জায়গার পাশে একটা চিটচিটে শীতল পাটি বিছানো আছে, সময়ে দোকানদারের বিশ্রাম নেয়ার জন্য।
দোকানের ওপরে একটা শিরীষ বা কড়ই গাছ দিন দিন আকাশ ছুঁতে চাচ্ছে, আজকাল গ্রামগঞ্জে কাক তেমন দেখা না গেলেও এই গাছে কয়েকটি কাক থাকে। এখন এই ভ্যাঁপসা ভুতুরে দুপুরে একলা ডালে বসে একটা দুঃখী কাক থেমে থেমে কা কা করছে, অদ্ভুতভাবে গাছ থেকে ঘুরে ঘুরে নিচে পড়ছে সবুজ পাতার দল, সাদাটে সবুজ ফুলের পাপড়ি, আর বাতাসী দোলায় ঘুঙুরের মতো বাজছে শিরীষের লম্বা লম্বা শুকনো শুঁটিগুলো।
পাতার মতো কুসুমের পলকা শরীরটা ধুলো মাটির নিচে পড়ে সবুজ হারাতে থাকে, পান জর্দা ঘামের তীব্র গন্ধে শূন্য পাকস্থলী উলটে আসতে চায়। ন্যামন্যামা দাড়ির গা গুলানী সুড়সুড়ি চোখেমুখে চোকতা পাতার মতো চুলকানি শুরু করে। দাঁতে দাঁত চেপে সব কিছুই সয়ে যায় সে। কুসুমের বাপ মাঝে মইদ্যে বউ সাওয়ালদের উদ্দেশে নানারকম বচন ছাড়ে, তার একটা হইলো-‘বুজলা কুসুমের মাও, প্যাটে খাইলে পিটে সয়, সওয়া নাগে, সওয়া নাগে, সওয়ার নামই জীবন’।
কুসুমও সহ্য করে... কিন্তু সেটা কি অনন্তকাল! ফেজ্জার কোন তাড়া নেই। তার হাতে অঢেল সময়। অবশেষে অঢেলও ফুরায়, পাহাড়ও শ্রান্ত হয়। মেয়েটা ডানকানা মাছের মতো ছোট্ট বুকটা ভরে বাতাস টেনে নেয়। ওর ভেতরে বাড়ি ফেরার অস্থিরতা কাজ করে।
অবশ্য মানুষটা ডালি ভর্তি করে সব কিছু দিয়ে দেয়। বারবার জিজ্ঞেস করে এত ভারি ডালি, ব্যাগ নিয়া যাওয়ার পাবু ময়না! না হয় কাল আসি বাকিগুলা নিয়া যাস, ও দ্রুত ওপর নিচ মাথা নাড়ে। পারবে, সে আজই পারবে। সবকিছু নিয়ে টালমাটাল পা বাড়ালে গাছের নিচে শুয়ে থাকা কুকুরটা গায়ের ধুলা ঝেড়ে পিছু নেয়, সূর্যটাও বসে থাকে না। লাল নীল জামাকাপড়ের একটা ভ্যান ওদের পাশ দিয়ে চলে যায়, কারো বাড়িত বুঝি ভ্যান বোঝাই সাগাই আইলো। বাড়ির মানুষের খানা খাদ্যের বোঝা ঘাড়ে না থাকলে কুসুম আনন্দ কৌতূহলে দুই পায়ে ধুলা উড়াতে উড়াতে ভ্যানের পেছনে ছুটত কার বাড়িতে সাগাই আইলো দেখার জন্য। ভ্যানের পেছনের কোনো দুষ্টু বালক থাকলে জিভ ভ্যাংচাইত বা ধুলা ওড়ার জন্য হুমকি ধমকি দিত... আর হিহি করে হাসত...কুসুমও সে হিহির সাথে নিজেকে মেলাত... বালক বালিকার হিহির সাথে উড়ত পথের ধুলা...
বাড়িতে এলে ভাইবইন গুলা ধরাধরি করি ডালি, ব্যাগ মার সামনে নিয়ে যায়। মা মুখ তোলে না, কথাও কয় না। কুসুম সোজা চলে যায় কলতলায়। ভাইয়েরা জানে বুবু এখন কলের নিচে বসি থাকপে।
আলো বিলিয়ে বিলিয়ে সূর্যটাও কি ক্লান্ত হয়ে আসে! শেষ বেলার দুঃসহ নিদাঘ ছড়িয়ে সেও পশ্চিমাকাশে মুখ লুকাতে যায়। মায়ের রান্না হয়ে যায়। বাচ্চাদের খাওয়া হয়ে গেলে, মেয়েটার জন্য ভাত বেড়ে রেখে, বাচ্চাদের এঁটো ঝুটার সাথে দুমুঠো ভাত দিয়ে কুকুরটাকেও খেতে দেয়, কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে নিরাসক্ত ভাবে নিজের ভাতের থালাটা টেনে নেয়...
ভাই এসে কল চাপতে থাকে, ক্লান্ত হলে, আরেকভাই আসে, হাত লেগে এলে বান্দরের মতো হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে চাপে, কুসুমের মাথা থেকে সারা শরীরে মাটির অভ্যন্তরের ঠাণ্ডা জলের ধারা আশীর্বাদ হয়ে ঝরতে থাকে, মিঠে জলের বান পরম মমতায় সব ধুয়ে মুছে দিতে থাকে... দীর্ঘ সময়ে ওর মুখ হাত পা শঙ্খের মতো সাদা আর ঠোঁট দুটো পিঙ্গল বর্ণ হয়ে যায়। ছোট্ট কচি শরীরটা বিশাল এক শিরীষ গাছ হয়ে যায়। উঁচু, উঁচু আরো উঁচু... ছায়াময়, মায়াময়, সহনশীল, ছায়ায় আশ্রিত নেড়ি কুকুর, ডালে বসে থাকা দুঃখী কাক, ঘন সবুজ পাতা ঝরে গিয়ে আবার আসে নতুন পাতা, সবুজ কুশি, ফুল ফোটে আবার শুষ্ক ডালে।

 


আরো সংবাদ