২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছোট গল্প

বিন্ধুর মধ্যে সিন্ধুর গভীরতা
-

ছোট গল্প কথাসাহিত্যের অন্তর্গত এক ধরনের গদ্য রচনা। এটা সাহিত্যের একটা নবীনতম বিভাগ। বাঙালি লেখকরা ছোটগল্প লেখার প্রেরণা পান ইউরোপ থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই বাংলা ছোটগল্পের সার্থক রূপকার। এর আগে এ দেশে যেসব কাহিনী প্রচলিত ছিল সেগুলো প্রায়ই রূপকথা ও উপন্যাসধর্মী রচনা। উপন্যাসের সঙ্গে ছোটগল্পের সুস্পষ্ট পার্থক্য আকৃতিগত। ছোটগল্পে উপন্যাসের ব্যাপ্তি নেই।
এডগার এলেন পো বলেছেন, ‘যে গল্প আধ থেকে এক বা দু’ঘণ্টার মধ্যে এক বৈঠকে পড়ে শেষ করা যায় এবং যা একটা নির্দিষ্ট অবস্থা অভিজ্ঞতা বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তাই ছোটগল্প।’ এইচ জি ওয়েলস বলেছেন ‘ছোটগল্প দশ থেকে পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে শেষ হওয়া বাঞ্ছনীয়।’ তবে আকৃতিতে ছোট হলেই কেবল ছোটগল্প হয় না। আকৃতিগত ছাড়াও প্রকৃতিগত ও মর্মগত অনেক ভিন্নতাও এর রয়েছে। ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য জীবনের খণ্ড চিত্রের উন্মোচন। ছোট গল্পকার একটা গল্পে জীবনের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশকে রসঘন করে ফুটিয়ে তোলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছন্দোবদ্ধ পঙক্তিতে ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের এই সংজ্ঞা থেকে ছোটগল্পের আঙ্গিক ও চরিত্র বৈশিষ্ট্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব রকম বাহুল্য ও অতিকথন বর্জন করে অনাবশ্যক চরিত্র ও ঘটনার ভিড় পরিহার করে লেখক যখন তার রচনাকে একটা সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনায় উন্নীত করেন তখনই সৃষ্টি হয় সার্থক ছোটগল্প।
ছোটগল্প সমগ্র জীবন থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষই কেবল প্রকাশ করে। অল্প কথায় কোনো অবস্থার চরম পরিণতিতে পৌঁছানোই ছোটগল্পের উদ্দেশ্য। এই রচনায় সব জোর দেয়া হয় সমাপ্তির ওপর। সর্বশেষ ভাগে ঘটে রহস্যের উন্মোচনÑ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যা পাঠকের কাছে একেবারে অভাবনীয়। এই চমকপ্রদ সমাপ্তি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় চিন্তার আরেক নতুন বিন্দুতে। ছোটগল্পের আঙ্গিক গঠন হয় খাড়া ঋজু। লেখককে গল্পের ঘটনাটা আগেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাজিয়ে নিতে হয় একটা রৈখিক বিন্যাসে। এই ঘটনা বিন্যাসের নাম প্লট। গল্প লেখকের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো প্লট নির্ধারণ। প্রধান এই কারণে যে, গল্পের আকর্ষণ সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্লটের ওপর। জুতসই প্লট ছাড়া গল্প জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে না।
গল্প শুরুর আগে গল্পকারকে কিছু মৌখিক বিষয় ভেবে নিতে হয়। ঘটনা বা পরিস্থিতি বর্ণনার আড়ালে তিনি কোনো বক্তব্য বা বাণী প্রকাশ করতে চান। অর্থাৎ মূল বক্তব্য আগেই ঠিক করে নিতে হবে। যখন গল্পকারের এই লক্ষ্য স্থির হয়ে যায়, তখন গল্পের প্লট আপনাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গল্পকারের লক্ষ্য স্থির করার কাজটা অনেকটা পথিকের পথ পরিকল্পনার অনুরূপ। পথিককে যেমন সময় শ্রম বিপদের ঝুঁকি ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে পথ নির্বাচন করতে হয়, তেমনি গল্পকারকে মোটমুটি সংক্ষেপে সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে তার বাণী পরিবেশনের অনুকূল সুবিধার কথা মাথায় রেখে গল্পের প্লট বা কাঠামো নির্ধারণ করতে হয়।
সুতরাং লক্ষ্য স্থির বা বক্তব্য ঠিক করতে পারাটাই গল্পকারের জন্য প্রধান ব্যাপার। গল্পের সূচনা সমাপ্তি কোনো অংশ নিয়েই গল্পকারকে আর তেমন ভাবতে হয় না। অনেকটা মূল ব্যক্তব্যই গল্পের পুরো কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়। কাঠামোর ছাঁচে যেন আপনাতেই গল্পের অবয়ব ফুটে ওঠে। সেজন্য ছোটগল্পের প্লট হয় মূলভাবনির্ভর, কাহিনীনির্ভর নয়। তাকে সব সময় উপগল্পের বন্ধন থেকে মুক্ত রাখতে হয়। সমগ্র গল্পে একটা মাত্র রসই থাকে প্রধান।
ছোট আকৃতি ছোটগল্পকে কিছু অনন্য ও অনিবার্য বৈশিষ্ট্য দান করে। এর পাত্রপাত্রী বা চরিত্রের সংখ্যা হয় খুব অল্প। শুরু ও শেষ হয় নাটকীয়। হঠাৎ করেই এটা শুরু হয় আবার পাঠকের মনে অতৃপ্তি রেখেই হঠাৎ শেষ হয়ে যায়। এর ঘটনা হয় গতিময়, বর্ণনা হয় কাব্যিক মাধুর্যমণ্ডিত, ভাষাবিন্যাস হয় নির্মেদ কিন্তু ইঙ্গিতধর্মী, উপমা অলঙ্কার হয় বিষয়ানুগ। এ কারণে সাহিত্যে একমাত্র কবিতার সঙ্গেই ছোটগল্পের তুলনা চলে।
কখনো চরিত্র, কখনো ঘটনা, কখনো শুধু অনুভূতি, আবহ ও পরিমণ্ডল ছোটগল্পে মুখ্য হয়ে ওঠে। কখনো সংলাপের ভঙ্গি কখনো বর্ণনার ঔজ্জ্বল্য, কখনো ইঙ্গিতময়তা ছোটগল্পকে বিশিষ্ট করে তোলে। কুশলি হাতে ক্ষুদ্র পরিসরে রচিত ছোটগল্প প্রায় এমন সত্যের উন্মোচন ঘটায়, যা সমকালীন হয়েও চিরকালীন। লেভ তলস্তোয়ের ‘একজন মানুষের জন্য কতটুকু জমি প্রয়োজন,’ ম্যাক্সিম গোর্কির ছাব্বিশ জন লোক ও একটি মেয়ে, ‘মানুষের জন্ম’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের আবেদন জাতি ধর্মের অতীত সর্বজনীন।
জীবনের অনেক ঘটনাবলির মধ্যে কোনো একটি বিশেষ ঘটনা বা জীবনের খণ্ডাংশ নিয়ে ছোটগল্প রচিত হবে। ছোটগল্পের সূচনায় থাকবে আকস্মিকতা। একটি চমক বা উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি হবে। ছোটগল্পের ভাষা সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল হবে। ছোটগল্প জীবনের বিলাসিতাকে ধারণ করে না তাই সমগ্র অবয়বের মধ্যে একটি বোধ থাকে যা পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। ছোটগল্পের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গল্পকার যেখানে পরিসমাপ্তি টানেন, পাঠকের সেখানে চিন্তার শুরু হয়।
বাংলাদেশের ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্যে যারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তারা হলেনÑ আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, শাহেদ আলী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, শওকত আলী, আল মাহমুদ, রাবেয়া খাতুন, আবু ইছহাক, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান আজিজুল হক, রিজিয়া রহমান, রাহাত খান, মাহমুদুল হক, রশীদ হায়দার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমদ ছফা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আতা সরকার, মঞ্জু সরকার, হরিপদ দত্ত, শহীদুল জহির, সিরাজুল ইসলাম, জাফর তালুকদার, মঈনুল আহসান সাবের, সুশান্ত মজুমদার, মনি হায়দার, লুৎফর রহমান রিটন, জহির রায়হান, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, হুমায়ুন আজাদ, বিপ্রদাস বড়–য়া, প্রশান্ত মৃধা, মহীবুল আজিজ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বুলবুল চৌধুরী প্রমুখ। তাদের অনেকেই বাংলা ছোটগল্পের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন ও করে যাচ্ছেন।


আরো সংবাদ