০৯ এপ্রিল ২০২০

জীবন ঘিরে উপলব্ধি

-

তিরাশি বছরে উত্তীর্ণ প্রবীণের জীবন ও জগৎ সম্পর্কে উপলব্ধি কেমন? এ সম্পর্কে হয়তো অনেকেরই জানার আগ্রহ রয়েছে। জন্মের পর এ রূপ-রসময় সৌন্দর্যময় বিচিত্র ভুবনে বিরাশিটি বছর অতিবাহিত করে তিরাশি বছরের জীর্ণ, পুরনো কালের সিঁড়িতে পা রেখে জীবন ও জগতকে ঠিক অতটা সুন্দর মনে হয় না। রূপ-রসময়, বিচিত্র সৌন্দর্য-বৈভবপূর্ণ এ পৃথিবীকে অনেকটাই শ্রাবণের মেঘ-মেদুর ছায়াচ্ছন্ন আকাশের মতোই ফ্যাকাসে, বিবর্ণ মনে হয়। সামনের দিকে যতই দৃষ্টি মেলে ধরি, ততই সব কিছু ধূসর-মলিন ও অস্পষ্ট হয়ে আসে। মনে হয় ঘন কালো অন্ধকারে সব কিছু আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তবে পিছনের দিকে তাকালে কিছুটা আলোর দ্যূতি যেন চোখে পড়ে। স্মৃতির আবছা আলোয় দীর্ঘ পথ চলা, দূরন্ত বেগে প্রাণপণ চেষ্টায় দুস্তর পথ পাড়ি দেয়ার ক্লান্তিকর মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়ে। এক অজানা, অচেনা, রহস্যময়, সুন্দর মোহমুগ্ধকর পৃথিবীর মায়া-মরীচিকার জালে নিজেকে সম্পূর্ণ জড়িয়ে-পেঁচিয়ে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলার পথে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির আনন্দ-বেদনায় আবেগকুল চিত্তে সহস্র বাধার উত্তুঙ্গ বিন্ধ্যাচল পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছার যে প্রত্যয়Ñ এ যাবৎকাল কোনোমতে স্বীয় অস্তিত্ব বজায় রাখার পেছনে হয়তো সেটাই প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে আমার মনে আজ এ উপলব্ধি হয়েছে যে, আশা-আকাক্সক্ষা, কোনো কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা, স্বপ্ন-সম্ভাবনা এসবই জীবনের রথকে নিরন্তর এগিয়ে চলার প্রেরণা জোগায়। তবে সব আশা যেমন পূর্ণ হয় না, প্রত্যাশা অনুযায়ী যেমন প্রাপ্তি ঘটে না, অনেক স্বপ্ন-সম্ভাবনাও হয়তো তেমনি অনেকের জীবনে অপূর্ণই থেকে যায়। তবু ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশা’ অর্থাৎ জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষ আশা ও স্বপ্ন নিয়েই বেঁচে থাকে। কোন একটি স্বপ্ন ভঙ্গের পর, আরেকটি নতুন স্বপ্ন এসে চোখে-মুখে-মনে ঈষৎ দোলা দিয়ে যায়। এভাবে স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে এক দিন প্রহরান্তে ক্লান্ত-বিষণœ নাবিকের মতো মানুষ অথৈ সমুদ্রের সীমাহীন জলরাশির মাঝে এসে পড়ে। বহু পুরনো জীর্ণ তরীতে, ছিন্ন পাল, ভাঙা মাস্তুলে দরিয়ার নোনা পানিতে, বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার আঘাতে একসময় সে বিধ্বস্ত হয়। এভাবে সে নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু পরাভব স্বীকার করে না। এটাই বেঁচে থাকা। আদতে বেঁচে থাকার চেষ্টাটাই জীবন। বেঁচে থাকার এ প্রাণপণ প্রয়াসের মধ্যেই বেঁচে থাকার অর্থ ও তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
ছোটবেলায় বড় হওয়ার সাধ জাগত মনে। বড় হওয়া মানে শুধু বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া নয়, গায়ে-গতরে বৃদ্ধি পাওয়াও নয়, আস্ত বড় মানুষের মতো স্বাধীনভাবে সব কিছু করার অধিকার অর্জন করা। সেই সাথে মনের লালিত স্বপ্নগুলো একে একে পূরণ করে সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করা। তখন জীবনের এলোমেলো আঁকাবাঁকা পথে এক একটি বাঁক ঘুরে মনে হয়েছে যেন মহাবীর আলেকজান্ডারের মতো বিশ্বজয় করে ফেলেছি অথবা মরক্কোর বিশ্বখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বা চীনের হিউ এন সাঙয়ের মতো বিশ্ব পরিভ্রমণে বহির্গত হয়ে একের পর এক বিভিন্ন দেশের রহস্যময় নানা দৃশ্য উন্মোচন করে চলেছি। সামনে আরো অনেক পথÑ একে একে সব পথে ক্রমাগত অভিযান চালিয়ে একদিন কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে যাবো হয়তো। তখন প্রতিটি দিন মনে হতো আনন্দ ও সম্ভাবনায় পূর্ণ গন্তব্যে পৌঁছার এক একটি স্বর্ণোজ্জ্বল সিঁড়ি। তিমিরাচ্ছন্ন নিস্তব্ধ রাত্রিকে মনে হতো স্বপ্ন রচনার এক অপার্থিব মহামুহূর্ত। শৈশব-যৌবনের সে অতীতের দিনগুলো ছিল কত আনন্দ-চঞ্চল, আবেগ-উত্তেজনায় পূর্ণ, বর্ণ-গন্ধময় ও রোমাঞ্চকর।
সে পলাতক দিনের সুস্মিত সুগন্ধি স্মরণ করে এখনো কিছুটা আপ্লুত হই। স্মৃতি-বিস্মৃতির অন্তরালে নিজের অতীতকে খুঁজে ফিরি নিজের অজান্তেই। মনের মর্মর বীণায় অনুরাগের সুরধ্বনি সৃষ্টি করে। অতীতের সে সুখস্মৃতি হৃদয়তন্ত্রীতে এক ধরনের অনাবিল আনন্দের হিল্লোল তোলে। মনে হয়, আর একবার যদি সেই হারানো অতীতকে ফিরে পেতাম! যদি সে অতীতের ছায়াচ্ছন্ন নিবিড় প্রান্তরে এবড়ো-খেবড়ো পথের পাশের মৃদু স্রোতস্বিনীর স্বচ্ছ জলরাশিতে আর একবার অবগাহন করে শুদ্ধ-পরিস্নাত হতে পারতাম! কিন্তু বাস্তবে এমনটি কখনো ঘটে না। তাই অতীত-অতীতই থেকে যায়, আমাদের বর্তমানও ক্রমাগত অতীতের নিভৃত গহ্বরে বিলীন হতে থাকে। এভাবেই আমরা একে একে সবাই মহাকালের নিঃসীম অন্ধকারে আত্মলীন হই।
আগে আসন্ন জন্মদিনের ভাবনায় একধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। নতুনভাবে জীবনকে সাজাবার, নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় হৃদয়-মন-অনুভূতি আনন্দ-চঞ্চল হয়ে উঠতো। কিন্তু এখন জন্মদিনের কথা স্মরণ হলেই মৃত্যু-চিন্তা এসে সারা শরীর-মন-হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মনে হয় দূর অতীতের কোন এক বিশেষ ক্ষণে এ পৃথিবীতে আমার আবির্ভাব ঘটেছিল, শান্ত-স্নিগ্ধ-স্বচ্ছতোয়া করতোয়া নদীর তীরবর্তী শ্যামল-সবুজে ঘেরা মায়া-মমতাময় আমার নানাবাড়িতে। তারপর মা-বাবা-স্বজনদের অপত্য স্নেহ-ভালোবাসা, আদরযতেœ ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা, ক্রমান্বয়ে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ বিস্তৃত সৌন্দর্যময় মায়াময় পৃথিবীর হাতছানিতে দেশ-বিদেশ-মহাদেশ ভূমণ্ডলের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত মনের আনন্দে সর্বত্র ঘুরে বেড়াবার সুযোগ পেয়ে অনেক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়েছে। মহান আল্লাহর প্রদত্ত অসংখ্য নিয়ামতে জীবন পূর্ণ হয়েছে, নানাভাবে জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছি। মহান রবের অসীম অনুগ্রহে এত কিছু পেয়েছি যে, তার শোকরগুজার করে শেষ করতে পারব না। অনেক ত্যাগ, কষ্ট, দুর্ভোগ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও নিরন্তর সংগ্রাম ও ধৈর্যধারণের ফলে শেষ পর্যন্ত আমার ধারণা, আল্লাহ আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। মূলত মানুষের শেষ গন্তব্য তো অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে মৃত্তিকার অন্তরালে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আমরা সবাই সে গন্তব্যে পৌঁছার জন্যই অপেক্ষমাণ।
পৃথিবীর এ বিচিত্র খেলাঘরে আবির্ভাবের পর থেকে কত মানুষের সাথে দেখা হয়েছে কত মানুষের সাথে পরিচয়, জানাশোনা হয়েছে। স্বজন-সৃহৃদ, শত্রু মিত্র, অনুরাগী সমালোচক বহু মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি। একে একে তাদের অনেকেই চলে গেছেন। বাগানে যেমন সবুজ বৃক্ষরাজি, কচি কিশলয় বেড়ে ওঠে, একসময় বড় হয়, লতাপাতা, শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, ফুল ফোটে ফল দেয়, তার পর একদিন সব ঝরে পড়েÑ মৃত্তিকায় মিশে যায় চিরতরে। কিন্তু বিরানভূমিতে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আবার মৃদু সমীরণ প্রবাহিত হয়, আকাশ থেকে সুশীতল বারিধারা বর্ষিত হয়ে জমিনকে সিক্ত করে তোলে। আবার নতুন গাছপালা, বৃক্ষলতা, সবুজ কিশলয়ের উদগম ঘটে। নতুন ফসলে পূর্ণ হয় মাঠ-প্রান্তর-বনাঞ্চল।
মানুষও তেমনি। নতুনদের স্থান করে দেয়ার জন্য পুরনোকে বিদায় নিতে হয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। মহান স্রষ্টা এভাবেই প্রাকৃতিক নিয়ম প্রবর্তন করে পৃথিবীকে সর্বদা তরুণ, সতেজ, প্রাণচঞ্চল ও গতিশীল করে রেখেছেন। এ গতিই জীবন। মূলত গতির টানেই পুরনো একসময় যবনিকার অন্তরালে চলে যায়। তবে এটাকে ঠিক চলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া বলা যায় না, বরং এটাকে রূপান্তর বা কক্ষচ্যুতি বলা যায়। অর্থাৎ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যায়। মায়াময় পৃথিবীর খেলাঘর ছেড়ে আখিরাতের অনন্তলোকে যাত্রা করে।
জীবনের এ অনিবার্য পরিণতির কথা ভেবে মনে খানিকটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয় বৈকি! পৃথিবীর এ নশ্বর জীবনে আমরা নানাকাজে সর্বদাই ঘর থেকে বাইরে, গ্রাম থেকে শহরে, দেশ থেকে বিদেশে এখানে-ওখানে যাতায়াত করি। এ আসা-যাওয়ার মুহূর্তে আমাদের সবারই কিছু একটি প্রস্তুতি থাকে। প্রস্তুতি ছাড়া আমরা কেউ কখনো ঘর থেকে বাইরে পা ফেলি না। কম করে হলেও পোশাক-আশাক, খাওয়া-দাওয়া, পথের খরচ প্রভৃতি প্রস্তুতি অবশ্যই নিতে হয়। জীবনান্তে আখিরাতের অনন্ত জীবনে যাত্রারম্ভে আমাদের প্রস্তুতি সম্পর্কেও তাই একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন।
আখিরাতের বা সে অনন্তযাত্রার প্রস্তুতি বলতে কী বোঝায়? সে যাত্রায় আমাদের প্রস্তুতি অথবা সম্বলই বা কী হবে? মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় আমাদের সাথে শুধু রক্ত-মাংসের একটি কলেবর নিয়ে এসেছিলাম। সে কলেবরটির সৃষ্টি হয়েছিল মায়ের গর্ভে, মায়ের রক্তে, মায়ের শরীরী সত্তা থেকে। অতঃপর পৃথিবীর আলো-হাওয়া, রোদ-বৃষ্টিতে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আমরা বাড়িঘর, বিত্তবৈভব, জাগতিক অনেক প্রাচুর্যের সঞ্চয়ে জীবনকে পূর্ণ করে তুলেছি, কেউ কেউ অনেক যশখ্যাতি অর্জন করেছে, ক্ষমতা ও মর্যাদার উত্তুঙ্গ শিখরে আরোহণ করে সমাজ বা রাষ্ট্রকে শাসন করার, অধীনস্থ করার শক্তিও অর্জন করেছে, নিজের শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটাতে নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ সাধনেও পরান্মুখ হয়নি। আবার কেউ হয়তো নিজের মেধা-মনন, যোগ্যতা ও চেষ্টায় পৃথিবীতে অনেক স্মরণীয় মহৎ কীর্তি রেখে যেতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর সময় এর কোনো কিছুই কেউ সাথে নিয়ে যেতে পারে না। সব কিছু দুনিয়ায় রেখে যেতে হয়। এমনকি মাতৃগর্ভে যে শরীরী অবয়ব তিলে তিলে গড়ে ওঠে, পৃথিবীতে আবির্ভাবের পর সে শরীরী সত্তাকে নানা উপাদেয় খাদ্য ও পানীয় দ্বারা তা সুস্থ, সবল ও চকমকে করে রাখার চেষ্টা হয়েছে, সে শরীরী সত্তাকেও সাদামাটা তিন প্রস্ত সফেদ কাপড়ে আবৃত করে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়।
তা হলে আখিরাতের সম্বল বলতে কী বোঝায়? অনন্তলোকে যাত্রায় আমাদের সাথে করে নেয়ার আর কীইবা আছে? আসলে মানব-জীবনের দু’টি সত্তাÑ একটি ‘রূহ’ বা আত্মা, অন্যটি শরীরী সত্তা। রূহ হচ্ছে স্রষ্টার ‘আদেশ’ বা ইচ্ছার প্রকাশ। কুরআনের ভাষায়: ‘কুল্লীর রুহু মিন আমরি রাব্বি’ অর্থাৎ রূহ হলো রবের আদেশ। (সূরা বনি ইসরাইল : আয়াত-৮৫)
আদি মানব আদমকে আ: মাটির দ্বারা সৃষ্টির পর আল্লাহ তাতে ফুঁ দিয়ে প্রাণের সঞ্চার করেন। আদমের শরীর থেকে মা হাওয়া এর সৃষ্টি। এর অর্থ নারী-পুরুষ এক অবিভাজ্য সত্তা। তাদের মর্যাদা সমান। আদম-হাওয়াকে পৃথিবীতে প্রেরণের পর তাদের দৈহিক মিলনে মানব সন্তানের পয়দা হয়। সেই নিয়মেই মানব জাতির বংশবিস্তার। এর দ্বারা প্রমাণ হয়, সব মানুষ এক আদমের সন্তান এবং সব মানুষ পরস্পর ভ্রাতৃসম।
অতঃএব, রূহের সৃষ্টি আসমানে, শরীরী সত্তার পয়দা পৃথিবীতে মাতৃগর্ভে। মহান স্রষ্টার অপরিসীম কুদরতে নারী-পুরুষের দৈহিক মিলনে মানবিক সত্তার আবির্ভাব ঘটে। বেলাশেষে খেলার অবসান হলে রূহ তার আদি অবস্থানে ফিরে যায়। যে ভেলায় চড়ে সে পৃথিবীতে পদার্পণ করে, তা ‘লাশ’ হয়ে অনাদৃত পড়ে থাকে ধূসরিত পৃথিবীর বুকে।
রূহ যখন অনন্তলোকে যাত্রা করে, তখন কি সে শূন্য হাতেই চলে যায়? তা হলে তার পৃথিবীতে আসার অর্থ কী? তার এ আসা-যাওয়া কি সম্পূর্ণ নিরর্থক?
মহান স্রষ্টা যখন বলেন যে, মানুষকে তিনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি, তা হলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী? মহান রব এ প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন সুস্পষ্টভাবেÑ ‘আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।’ (সূরা যারিযাত : আয়াত-৫৬)।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে ইবাদত সম্পর্কে। সহজভাবে ইবাদতের অর্থ স্রষ্টার ওপর অবিচল বিশ্বাস স্থাপন, তার সাথে অন্য কাউকে শরিক না করা এবং বিশ্বাস স্থাপনের পর তিনি কোন উদ্দেশ্যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং সে উদ্দেশ্য পূরণে সচেষ্ট হওয়া। এ উদ্দেশ্য যথাযথ প্রতিপালনের মাধ্যমেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি বিধান সম্ভব এবং এতেই সৃষ্টির সার্থকতা।
স্রষ্টা-প্রদত্ত নির্দেশনা সম্পূর্ণ সঠিক, নির্ভুল, সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের। এভাবে যাপিত জীবনকে সৎ আমল বলা যায়। রূহের অনন্তলোকে যাত্রায় এ সৎ আমল যে যতটা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে, সে ততটাই সফল। আখিরাতের অনন্ত জীবনে দুনিয়ার আমলের ভিত্তিতেই প্রত্যেকের শুভ-অশুভ পরিণতি নির্ভর করে।
তাই জীবনসায়াহ্নে আজ নিজেকেই প্রশ্ন করি, আমার যাপিত জীবনে আমি কতটুকু সৎ আমল করেছি? আখিরাতের শুভ পরিণতি আমি কি আশা করতে পারি? এ প্রশ্নই আজ আমাকে নিরতিশয় ব্যাকুল ও উদ্বেগাকুল করে তুলেছে। আশা ও নির্ভরতা এতটুকু যে, মহান রব, তিনি রহমান ও রাহিমÑ দয়ালু, দাতা ও ক্ষমাশীল। বিশ্বাসী অনুতপ্ত চিত্তের প্রার্থনায় তিনি বান্দার প্রতি ক্ষমার দৃষ্টি প্রসারিত করেন। সে একান্ত দয়াময়ের করুণা ও ক্ষমাই আমার একমাত্র ভরসা। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাপ্রার্থীকে ক্ষমা করে থাকেন। নিরাশার নিরন্ধ্র অন্ধকারে প্রত্যাশার এ ক্ষীণ আলোকরশ্মি আশাকে আশান্বিত করে, মনে প্রশান্তি আনে।

 


আরো সংবাদ