০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

আদালতে নজরুলের জবানবন্দী

-

নানা সঙ্কটের জালে আচ্ছন্ন ছিল নজরুলের সমাজব্যবস্থা। পুরো ভারতবাসী ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলে। পৃথিবীর চালচিত্র ছিল অমানবিক। বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহ, শাসন-শোষণ, গ্লানি, বঞ্চনা, অন্যায়, অনিয়ম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর পোড়ামাটি নজরুলের হৃদয়কে করেছে অশ্রুসিক্ত। ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিকদের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত ভারতবাসীর নিজস্বতা স্বজাত্যবোধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মৌলিক অধিকারগুলো অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে।
বিংশ শতকের শুরু থেকে যখন হতাশা, নিরাশা, দূরাশায় ঝাপসা অন্ধকার পুরো পৃথিবীকে ঝাপটে মেরে ধরে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, মূল্যেবোধের অবক্ষয়, ভারতবাসীর কাঁধে উড়ে এসে জুড়ে বসে, ঠিক সেই মুহূর্তে বিষের বাঁশিতে অগ্নিবীণা বাজিয়ে ধূমকেতুর ন্যায় সত্যবাণী নিয়ে বিদ্রোহী নজরুলের, মানবতাবাদী নজরুলের, বিপ্লবী নজরুলের, প্রেমিক নজরুলের পদার্পণ। আসলে নজরুলের চেতনায় ও প্রেরণায় ছিল বন্ধুর মর্যাদার চেয়ে সত্যের মর্যাদা অনেক বড়।
সাহিত্যাকাশে এক বিস্ময় নক্ষত্র হিসেবে তার সফল বিচরণ। গান, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্পগ্রন্থ, প্রবন্ধগ্রন্থ, উপন্যাস, নাটক, জীবনীগ্রন্থ, অনুবাদ, গীতসঙ্কলন, পত্রিকা সম্পাদনা হরেক সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইতিহাসে যেমন অমৃত লোক হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দীর জন্য নিজের আসনকে পাকাপোক্ত করেছেন, তদরূপ পাঠকের মনের মুকুরে নিজেকে শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে আপন গুণে প্রশংসার পঞ্চমুখে পরিণত করেছেন। নজরুল তার মেধা, মনন, চিন্তাশীলতা, স্বদেশপ্রেম, উদার মানবিকতা, জাতিপ্রেমে নিজেকে সমাসীন করেছেন বৈশ্বিক নাগরিকে।
তার জীবন আন্দোলনে ছিল মুক্তিকামী মানবতার উচ্চারণধ্বনি। নজরুলের জন্ম পরাধীন দেশে বলেই আজীবন তিনি মুক্তিকামী মানবতার সপক্ষে তার লিখনী ধারণ করেছেন। ব্রিটিশ বেনিয়াদের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন খড়গহস্ত। যার ফলে নজরুল বিদ্রোহের অনন্য দ্যোতক তার অগ্নিবীণা। কাব্যগ্রন্থটি উন্মেষের সাথে সাথেই তার বিদ্রোহের প্রলয় ঝঞ্ঝায় ব্রিটিশ সিংহাসন টলমলিয়ে ওঠে। জুলুমবাজ জালিম সরকারের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহের কালজয়ী দৃষ্টান্ত বিদ্রোহী কবিতাÑ
‘মহা বিদ্রোহী রণকান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না’
ফাতেহা-ই-দোয়াজ দহম কবিতায় উচ্চারণ করেনÑ শংকারে করি লংকার পার কার ধনু টংকার।
আসলে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রবন্ধে নজরুল আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে জবানবন্দী দিয়েছেন, তাতে প্রমাণিত হয় সত্যিই তিনি শংকাকে লংকায় পার করেছেন। নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন-শোষণ, অমানবিক, অনৈতিক, নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে নজরুলের বিদ্রোহ ভদ্রতার মাধ্যমে ুদ্রতা থেকে আর্দ্রতার দিকে ধাবিত হয়। নজরুল তার ধূমকেতুর মাধ্যমে সব অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে সাধ্যমতো গদ্য লেখেন। তার লেখনীর প্রভাব ব্রিটিশের স্বভাবে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার বক্তব্য পাঠকসমাজে হয় উজ্জীবিত। তার আগমন যেন মুক্তিকামী মানুষের বার্তাবাহক হিসেবে প্রভাব ফেলে।
অন্য দিকে তার অগ্নিবীণার আগুনে ব্রিটিশ মসনদ যেন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বিদ্রোহের প্রলয় ঝঞ্ঝার দোদুল্যমান ব্রিটিশ সিংহাসনকে রক্ষায় তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। অগ্নিবীণাকে কেন্দ্র করে (১৯২২ সালে) ব্রিটিশ বিচারক তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি মুক্তির জন্য যুক্তির উক্তি দিয়ে এক জ্বালাময়ী অভিভাষণ প্রদান করেন। সেই দীপ্তিময় উচ্চারণই পরিবর্তী সময়ে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে সাহিত্যের রুপালি পাতায় সোনালি অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নেয়।
নজরুল চাটুকার বিচারকের আদালতে ভয়-লেশহীন, ভীতি, সন্দেহ, সংশয় আশঙ্কা, মানবিক সব দুর্বলতাকে প্রবলতর উত্তাপ দিয়ে দলিত-মথিত করে ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেনÑ
আমি কবি অপ্রকাশক সত্যকে প্রকাশ করিবার জন্য অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।
তার মত দৃঢ়চেতা, প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী সেকালে-একালে অথবা কস্মিনকালেও দৃশ্যমান হয়নি। আদালতকে তিনি বলেনÑ আমি পরম আত্মবিশ্বাসী। আর যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি, কাহারো তোষামোদ করি নাই। প্রশংসা এবং প্রসাদের লোভেও কাহারো পিছনে পোঁ ধরি নাই।
আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের জাতির দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্যের তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।
আমি অন্ধ বিশ্বাসে, লাভের লোভে, রাজভয়ে বা লোকভয়ে, মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারি না। আমার হাতের ধূমকেতু আর ভগবানের হাতে অগ্নিমশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচারকে দগ্ধ করবে। আমার এই শাসনবিরুদ্ধ বাণী আবার অন্যের কণ্ঠে ফুটে উঠবে। নজরুল তার জবানবন্দীতে বলতে থাকেনÑ
‘আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির মৃত্যু হবে না।’
কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরি করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং বাঁশির সৃষ্টির কৌশলে, অতএব দোষ বাঁশির নয়, সুরেরও নয়, দোষ তার, যিনি আমার কণ্ঠে তার বীণা বাজান, তিনি বলতে থাকেনÑ
সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়। সত্যদ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মের আলোকে ন্যায়ের দুয়ারে তা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অমøান, অনির্বাণ, সত্যস্বরূপ।
মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার ওপর অগাধ বিশ্বাস, আল্লাহর রাজত্বে, ক্ষমতায়, শক্তি সত্তায় তার অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস থেকে আদালতের কাঠগড়ায় দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ করেন তাকে শাস্তি দেয়ার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নেই। তাকে বন্দী করার মতো পুলিশ বা কারাগার আজো সৃষ্টি হয়নি।
নজরুল বিচারকের সীমাবদ্ধতা, তার ন্যায়বিচার করার এখতিয়ার কতটুকু আছে, বেশির ভাগ বিচারক সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে রায় দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাই বিচারককেই সামনে রেখে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেনÑ বিচারক জানে আমি যা বলছি, যা লিখেছি, তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে। কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই বিচারাসন কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচার, এ বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে? ভগবানকে? এ বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? রাজা, না ভগবান? না আত্মপ্রসাদ?
নজরুল এটাও ব্যক্ত করেছেন, তার বিচারক একজন কবি, শাসক শ্রেণীর আঙুলের ইশারায় যে বিচার হবে তাতে বাধা দেয়ার মতো ক্ষমতাও বিচারক কবির নেই।
তাই সমগোত্রের হওয়া সত্ত্বেও নজরুল তার ওপর হতাশ হয়েছেন।
ব্যক্ত করেছেন হৃদয়ের উত্তাপ উচ্ছ্বাসগুলোÑ
শুনেছি আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির কাছে। কিন্তু বেলা শেষের শেষ খেয়া এ প্রবীণ বিচারককে হাতছানি দিচ্ছে, আর রক্ত-ঊষার, নব-শঙ্খ আমার অনাগত বিপুলতাকে অভ্যর্থনা করছে, তাকে ডাকছে মরণ, আমায় ডাকছে জীবন, তাই আমাদের উভয়ের অস্ত তারা আর উদয় তারার মিলন হবে কি না, বলতে পারি না। না! আবার বাজে কথা বললাম?
আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এত ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো এটা কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এত দিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষ রূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসনকিষ্ট বন্দী সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই আমি রাজদ্রোহী? এ ক্রন্দন কি একা আমার? না এ আমার কণ্ঠে ওই উৎপীড়িত নিখিল নীরব ক্রন্দসীর সম্মিলিত সরব প্রকাশ? আমি জানি, আমার কণ্ঠের ওই প্রলয় হুঙ্কার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আর্তপীড়িত আত্মার যন্ত্রণা চিৎকার। আমায় ভয় দেখিয়ে মেরে এ ক্রন্দন থামানো যাবে না। হঠাৎ কখন আমার কণ্ঠের এই হারা বাণীই তাদের আরেক জনের কণ্ঠে গর্জন করে উঠবে।
নজরুলের রাজবন্দীর জবানবন্দী সব রাজবন্দী, প্রতিহিংসার শিকার, অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, অপমানিত, নিগৃহীত চিত্তকে সাহস জোগাবে সত্যে উদ্ভাসিত হতে, অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে, পুতুল বিচারকের সম্মুখে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সত্যের অমিয় সুধাকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করতে।


আরো সংবাদ


premium cement