২৮ অক্টোবর ২০২১
`

বিনয়ী হওয়ার উপায় ও উপকারিতা

-

বিনয় একটি মানবীয় গুণ। যে গুণের অধিকারী হতে পারলে একজন মানুষের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেড়ে যায়। যদি এই বিনয়ের উদ্দেশ্য মহৎ ও সুন্দর হয়। এ কারণে বিনয়ের পদ্ধতি হতে হবে আল্লাহ ও প্রিয় রাসূলের দেখানো পথ ও মত অনুসারে। আল্লাহকে রাজিখুশি করার নিয়তে। মানুষ যখন কোনো কথা বলবে বা আচরণ প্রকাশ করবে তার সেই কথা ও আচরণে কোনো প্রকার ঔদ্ধত্য থাকবে না। হাদিস শরিফে এসেছে,‘যার অন্তরে তিল পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।...’ (তিরমিজি)।
এই অহঙ্কার পরিহার করে বিনয়ী হওয়ার কথা কুরআনের বহু জায়গায় বলা হয়েছে। লোকমান হেকিম তার পুত্রকে যে নসিহত করেছিলেন আল্লাহ তায়ালা তা পবিত্র কুরআনে হুবহু তুলে ধরেছেন। একজন মেষ পালক হাবশি গোলামকে আল্লাহ তায়ালা কত মর্যাদা দান করেছেন। যে তার জ্ঞান-গরিমার মাধ্যমে খোদার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছেন। পুত্রকে দেয়া তার উত্তম নসিহত গোটা মানবজাতির জন্য উদাহরণ হিসেবে আল্লাহ তায়ালা সূরা লোকমানে বর্ণনা করেছেন। কিভাবে তিনি এত মর্যাদাবান ব্যক্তি হলেন? তাঁর এই সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমি কোনো দিন কারো সাথে মিথ্যা কথা বলিনি। কারো আমানতের খেয়ানত করিনি। আর কখনো কারো সাথে বেহুলা কাজে সময় ব্যয় করিনি।’ এই লোকমান হেকিম তার পুত্রকে নসিহত করে বলছেন, ‘হে প্রাণপ্রিয় পুত্র, কখনো অহঙ্কার বশে মানুষের জন্য গাল ফুলিয়ে রেখে তাদের অবজ্ঞা করো না। আর আল্লাহর জমিনে কখনো ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে বিচরণ করো না। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারী ও অহঙ্কারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা লোকমান-১৮) ‘রাহমানের বান্দা তারাই, যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে...। (সূরা ফুরকান-৬৩) একই বিষয় সূরা বনি ইসরাইলের ৩৭ নম্বর আয়াতে আরো জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর জমিনে তোমরা দম্ভভরে বিচরণ করো না। তুমি কখনোই তোমার পদভারে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না। আর উচ্চতায় তুমি কখনো পর্বত সমানও হতে পারবে না।’ তাই রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর জন্য যে ব্যক্তি বিনয়ী হয় আল্লাহ তাকে সমুন্নত করেন। সে নিজের চোখে তুচ্ছ হলেও মানুষের চোখে অনেক বড় বলে বিবেচিত হয়।’ (বায়হাকি)।
মানুষ যদি নিজেকে একজন উত্তম মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহ এ বান্দাকে অবশ্যই সাহায্য করেন। কারণ যে বান্দা আল্লাহকে খুশি করতে চায় আল্লাহ কখনো তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না, বরং তাকে তাঁর কুদরত ও অনুগ্রহ দিয়ে ভরে দেন। সবসময় তাকে সাহায্য করেন। এ কারণে অন্তরে কোনো প্রকার অহঙ্কার না রেখে সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করে জ্ঞান-গরিমা ও পদমর্যাদায় ছোট কোনো ব্যক্তির কাছ থেকেও শিক্ষা অর্জনের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে প্রয়োজনে নিজের ভুল হলে নিঃসঙ্কোচে তা স্বীকার করা। মনে রাখতে হবে, ভুল স্বীকার করলে কখনো মানুষের সম্মান হ্রাস পায় না বরং তা আরো বৃদ্ধি পায়। নিজের সাধ্যমতো মানুষের দিকে সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। দুনিয়াবি ফায়দা হাসিলের জন্য নয়, বরং মহান আল্লাহ পাককে সন্তুষ্ট করার জন্য।
বিনয়ের সাথে মানুষের সাথে কথা বলা অনেক সুন্দর একটি অভ্যাস। যা রাসূলের সুন্নত। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার মাঝে নিজেকে একজন বিনয়ী মানুষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা। নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রকাশের অভিপ্রায় না করে সওয়াবের লক্ষ্যকে নিজের ইচ্ছে বানিয়ে নেয়া। কারো উপকার সাহায্য-সহযোগিতা করে কখনো তা মুখে প্রকাশ না করা। বরং এজন্য আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান কামনা করা। এতেই মানুষের প্রকৃত সফলতা। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাকে কখনো তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেন না। আখিরাতে তার জন্য উত্তম প্রতিদানের পাশাপাশি দুনিয়াতেও তাকে সম্মানজনক জায়গা করে দেবেন।
মনে রাখতে হবে, বিনয়ী হবার জন্য অবশ্যই ব্যক্তিকে তার আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় বিনয়ী ও ন¤্রতা অর্জনের অনুশীলন করতে হবে। কারণ এটি যেমন মানসিকতার পরিবর্তন তেমনি অনুশীলনের বিষয়। যে মানুষকে সম্মান করে অন্য ব্যক্তিরাও তার আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে সম্মান করতে চায়। তাই অন্যকে গুরুত্ব দেয়া বিনয়ী অর্জনের ভালো একটি উপায়। এ কারণে দেখা যায়, যারা বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করেন তারা অপরের ত্রুটি না ধরে, বরং তার ভালো কাজগুলোর প্রশংসা করেন। নিজের সমালোচনা বেশি করেন। যদি অন্যের সমালোচনা করেও থাকেন তা সেই ব্যক্তির কল্যাণের জন্য। তার মর্যাদাকে খাটো করার লক্ষ্যে নয়।
যে ব্যক্তি ভদ্র ও বিনয়ী তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক। হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত এক হাদিসে মহানবী সা: বলেছেন, ‘দান করলে সম্পদ কমে না, আর ক্ষমা করলেও আল্লাহতায়ালা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর কেউ আল্লাহর জন্য বিনয়ী হলে আল্লাহ তার সম্মান আরো বাড়িয়ে দেন।’ (মুসলিম) তিনি অন্য এক হাদিসে বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি ওহি করেছেন যে, তোমরা একে অপরের প্রতি বিনয় প্রদর্শন করবে, যাতে কেউ কারো ওপর বাড়াবাড়ি ও গর্ব-অহঙ্কার না করে।’ (আবু দাউদ) তিরমিজি শরিফের এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘মুমিন ব্যক্তি নম্র-ভদ্র হয়ে থাবে। আর পক্ষান্তরে পাপী ব্যক্তি হয় ধূর্ত ও চরিত্রহীন।’ -সাহিত্যিক ও গবেষক



আরো সংবাদ