১৮ অক্টোবর ২০২১
`

বিদআত ও কুসংস্কার

-

ইসলাম একটি সর্বজনীন দ্বীন বা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে রয়েছে আল্লাহ প্রদত্ত বিশ্ব নবী সা:-এর আদর্শের সমন্বয়ে নিজস্ব রীতিনীতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যা মানুষকে শেখায় সভ্যতা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। বিশ্বাসী বুকে বপন করে মানবতার বীজ আর সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে তোলে সত্যিকার মানুষ।
ইসলামের রীতিনীতি ছেড়ে মানুষ যখন অজ্ঞতাবশত অথবা পার্থিব কোনো স্বার্থে দুনিয়াবি সংস্কৃতি, নিয়ম-নীতি অনুসরণ, অনুকরণ করে তখন তা কুসংস্কারে রূপ নেয়। অতএব, ইসলাম ধর্মে অনুপ্রবেশ করা এ জাতীয় ভিন্ন ধর্মীয় রীতিনীতি, বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি ও মনগড়া নব-উদ্ভাবিত বিষয় যা দ্বীন ইসলামের অংশ মনে করে নেকির আশায় আবিষ্কার বা আমল করা হয় তাকে শরিয়তের পরিভাষায় বিদআত বলে অভিহিত করা হয়।
ইমাম নববি রহ: বলেছেন, পূর্ব নমুনা ছাড়া কোনো বিষয় আবিষ্কার করার নাম বিদআত। আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ: বলেছেন, ভিত্তিহীন কোনো জিনিস নতুন করে শুরু করার নাম বিদআত। আল্লামা তাজউদ্দিন শাফি রহ: লিখেন, বিদআত অর্থ দ্বীনের পরিপূর্ণতা এবং নবী করিম সা:-এর ইন্তেকালের পর মনমতো আবিষ্কার ও ইচ্ছেমতো যেসব আমল করা হয়েছে।
শরিয়তের পরিভাষায় ইবাদতের ওই সব নতুন নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতিকে বিদআত বলা হয় যা সওয়াবের উদ্দেশ্যে দ্বীনের অংশ বা কাজ মনে করে করা হয়। যা রাসূলুল্লাহ সা:, খোলাফায়ে রাশেদিন, সব সলফে সালেহিন, আয়াম্মায়ে মুজতাহিদিনের পবিত্র স্বর্ণযুগের পর আবিষ্কার করা হয়েছে।
বিদআতের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়Ñ
১. এমন আমল যা নবী সা: ও সাহাবি রা: কর্তৃক হয়েছে এমন কোনো সরাসরি প্রমাণ নেই।
২. এটি রাসূল সা:-এর সুন্নাহ মনে করা হয়েছে এবং পালনকারী সুন্নাহর মর্যাদায় পালন করেছে। ৩. এটিকে উন্নতমানের বন্দেগির নিয়তে বাধ্যতামূলক মনে করে সওয়াবের আশায় করা হয়েছে।
একই সাথে এটাও বুঝতে হবে যে, সব জিনিস দ্বীনের সহায়ক হিসেবে আবিষ্কার করা হয় কিন্তু দ্বীনের অংশ মনে করা হয় না। যেমনÑ দুনিয়ার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, জীবন ধারণ সহজ হয় এমন বস্তুর ব্যবহার, দেশের প্রতিরক্ষার জন্য নতুন নতুন সরঞ্জাম ক্রয় ও ব্যবহার করা, এলমে তাসাউফের চর্চা, কুরআন শিখতে তাজবিদের নতুন নতুন কৌশল, বসবাসের ঘর নির্মাণ, মাইক ও শব্দযন্ত্র ব্যবহার ইত্যাদি দ্বীনের অংশ নয় তবে দ্বীনের সহায়ক বা দ্বীন পরিপালনের মাধ্যম। এগুলোকে কেউ বন্দেগি মনে করে না কিংবা ভোগ ব্যবহারে সুন্নাহর মর্যাদাও দেয় না। তাই এগুলো বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
‘বলুন, হে আহলে কিতাবিগণ, তোমরা স্বীয় ধর্মে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না এবং এতে ওই সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।’ (সূরা মায়েদা-৭৭)
বিদআতের সূচনা প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে কাসির রহ: স্বীয় তাফসিরে ইবনে কাসিরে হাফেজ ইবনে আবি হাতেম রহ:-এর সূত্রে রবি ইবনে আনাস রা: থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি দীর্ঘ দিন যাবৎ খুব ইবাদত করত। সে কুরআন-সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসারী ছিল। দীর্ঘ দিন ইবাদত-বন্দেগি করার পর একদিন শয়তান এসে তাকে প্ররোচিত করল যে, অতীতের লোকেরা যে সব আমল করে গেছে তুমিও দেখি সেই সব পুরনো আমলই করে চলেছ। এভাবে অতীতের লোকদের আমল করতে থাকলে জনগণের কাছে তোমার পরিচিতি বা মর্যাদা আসবে না। লোকে তোমাকে চিনবে না। সুতরাং জনসাধারণের কাছে পরিচিতি ও মর্যাদা লাভের জন্য তোমাকে নতুন কিছু আমল আবিষ্কার করা দরকার এবং তা জনগণের কাছে প্রচার করতে হবে। তাহলে অতি দ্রুত তোমার প্রসিদ্ধ লাভ হবে এবং জনসাধারণের কাছে তুমি আলোচিত হবে।
লোকটি ছিল আবেদ, সে শয়তানের পরামর্শ অনুযায়ী তাই করল। নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে লোকসমাজে প্রচার করতে লাগল। এভাবে কিছু দিন সে এই কাজে লিপ্ত ছিল। লোকজনও তার অনুসরণ করছিল। একপর্যায়ে সে অনুতপ্ত হয়ে লোকালয় ছেড়ে নির্জনে গিয়ে ইবাদতে মাশগুল হলো এবং বিদআত আবিষ্কারের মহাপাপ থেকে তওবা করল। কিন্তু আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলোÑ ‘তুমি একা ভুল করলে তোমাকে ক্ষমা করা হতো, কিন্তু সাধারণ মানুষকেও তুমি পথভ্রষ্ট করেছ। তাদের অনেকেই এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের সবার দায়ভারও তোমাকেই নিতে হবে। অতএব তোমার তওবা কবুল করা হবে না।’ (ইবনে কাছির, সূরা মায়েদা, আয়াত-৭৭ এর ব্যাখ্যা)
আজকাল ইউটিউবের কল্যাণে বিদআতপন্থীদের বক্তৃতাগুলো শুনলে নিজেকে প্রতিষ্ঠার এমন হীনচেষ্টা নজরে পড়ে। বর্তমান জমানার কিছু আমলি বিদআতের ব্যাপারে ইসলামিক স্কলাররা বলেন, যেমনÑ বুজুুর্গ লোকদের কবরের উপর গৃহ ও গম্বুজ তৈরি করা, দরগাহ বা কবরের পাশে গরু ছাগল জবাই করা ও খাবার বিতরণ করা, মৃত ব্যক্তির ইছালে ছাওয়াবের উদ্দেশে চারদিনা, চল্লিশদিনা ও বার্ষিকীর আয়োজন করা, ওরস করা। এক মিনিট নীরবতা পালন করা, মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববি থেকে, অনুরূপভাবে কবরস্থান থেকে পশ্চাত দিক হয়ে বের হয়ে আসা, মৃত্যুর পর কবর পাহারা দেয়া, কবরস্থানে মিলাদ পড়া, কবরে মশারি দেয়া। রাসূল সা:-এর নাম শুনলে চোখে বৃদ্ধাঙুল বুলানো। মসজিদ বা মাজার দেখলে হিন্দুদের মতো হাত মুখে ও কপালে লাগানো। কবরে ধূপ, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো প্রভৃতি আমলি বিদআত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো আমলই আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে দু’টি শর্ত পাওয়া না যাবে।
১. ইখলাছের সাথে ইবাদত করা, অর্থাৎ আমল বা ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য করা। রাসূল সা: বলেন, ‘প্রত্যেক কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। মানুষ যে নিয়ত করবে তাই পাবে।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি) ২. সুন্নাতের অনুসরণ অর্থাৎ ইবাদতে রাসূল সা:-এর সুন্নাতের পূর্ণ অনুসরণ।
রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের পক্ষ থেকে স্বীকৃত নয় এমন কোনো আমল করল, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (মুসলিম)
সুতরাং যার ঈমান ও আমল একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য এবং রাসূল সা:-এর সুন্নাত মোতাবেক হবে, তার সে আমল আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি এ দু’টি শর্ত বা কোনো একটি পাওয়া না যায়, তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।
সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ



আরো সংবাদ


মেয়ের চিকিৎসায় ১০ দিন ধরে ঢাকার হাসপাতালে থেকেও মন্দির ভাঙার আসামি (১২৯০৫)‘বাতিল হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প’ (১২২০৬)প্রধানমন্ত্রী মোদি কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন (৯৫৬৯)কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা ভারতের তালেবানভীতি থেকে? কেন সেই ভীতি? (৯৪১৪)কাশ্মিরে এক অভিযানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতীয় সেনা নিহত (৮০৩৮)৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতেই হবে : তথ্য প্রতিমন্ত্রী (৬৬০০)সঙ্কটের পথে রাজনীতি (৫৯৭৭)গ্রাহকদের উদ্দেশে কারাগার থেকে যা বললেন ইভ্যালির রাসেল (৪৮৯৫)পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি পুনর্নির্ধারণ (৪৮৬২)কিছু ‘বিভ্রান্তিকর খবরের’ পর বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ভারত (৪৮২৯)