০৬ মার্চ ২০২১
`

শহীদ কারা

-

দুনিয়ায় আল্লাহর দ্বীনকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বা বিজয়ী করতে গিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে যেসব মোমিন ব্যক্তি নিহত হয় তাদেরকে শহীদ বলা হয়। সহিহ বুখারির ৩১২৬ নং হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি একবার সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সা:-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে এটা আমরা কিভাবে বুঝব। এর উত্তরে আল্লাহর হাবিব সা: বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে সেই আল্লাহর রাস্তায় আছে। আর আল্লাহর রাস্তায় থাকা অবস্থায় সংগ্রাম করতে গিয়ে যে মারা যায় তাকেই ইসলাম শহীদ বলে ঘোষণা করেছে।
তবে সে ক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে সেটি হচ্ছে, দুনিয়ার কোনো লোভে পড়ে বা দুনিয়ার কোনো স্বার্থের জন্য যদি কেউ আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করে তবে সে শহীদ হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ অনেক হাদিসে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ অনেক শহীদকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন। আল্লাহ বলবেন, তুমি তো দুনিয়াতে এ জন্য জিহাদ করেছিলে যে, মানুষ তোমাকে বীর বা সাহসী বলবে। বাহবা পাওয়ার জন্য তুমি লড়াই করে নিহত হয়েছে। এরপর মানুষ তোমাকে বীর বলেছে। তাই তোমার প্রতিদান দুনিয়াতেই শেষ হয়েছে। আমার কাছে তোমার কোনো প্রতিদান গচ্ছিত নেই। সুতরাং তুমি জাহান্নামে যাও।
এখন প্রশ্ন হলো, যারা আল্লাহর রাস্তায় সরাসরি লড়াই করে মারা গেছেন তারা বাদে অন্য কেউ শহীদ হিসেবে গণ্য হবে কিনা? এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে হাজার আসকলানী রহ: বলেছেন, শহীদ দুই প্রকার। এক. যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছেন। দুই. যারা দুনিয়াতে আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়নি। কিন্তু পরকালে শহীদের মর্যাদা লাভে ধন্য হবেন।
এখানে প্রথম প্রকার হলো প্রকৃত শহীদ। এদেরকে আল্লাহ পাক মৃত বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় তাদের তোমরা মৃত বলো না। তারা জীবিত কিন্তু মানুষ তা বুঝতে পারে না। (সূরা বাকারা : ১৫৪) অন্য এক আয়াতে এসেছে, তারা রবের পক্ষ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত।
প্রকৃত শহীদদের মর্যাদা আল্লাহর দরবারে এত বেশি যে, নিহত হওয়ার পর তাদের গোসল দেয়ার প্রয়োজন নেই। তারা রক্ত মাখা শরীর নিয়ে রক্ত ঝরা অবস্থায় বিচার দিবসে আল্লাহর সামনে হাজির হবেন। কুরআনে এসেছে, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা হলো নবীদের, এরপর সিদ্দিকীন, এরপরেই শহীদদের মর্যাদা। (সূরা নিসা : ৬৯) এ জন্য প্রতিটি মুমিনের উচিত আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার আকাক্সক্ষা লালন করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করে যাওয়া।
আমরা যদি সাহাবিদের জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, তারা সব সময় শহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন। সহিহ বুখারির ১৮৯০ নং হাদিসে এসেছে হজরত ওমর রা: আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যে, হে আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু নসিব করুন এবং রাসূলের শহর মদিনায় আমার মৃত্যু দিন। আমরা জানি যে, ওমর রা: এক আততায়ীর হাতে শহীদ হয়েছেন। আর মদিনাতে রাসূল সা:-এর কবরের পাশেই হজরত ওমর রা:-এর কবর। সুতরাং তার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। এ আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, প্রকৃত শহীদ হলো তারা যারা সরাসরি আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে গিয়ে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তাদের মর্যাদা অনেক বেশি।
এই প্রকৃত শহীদ ছাড়াও অনেক ব্যক্তিকে আল্লাহ শহীদের মর্যাদা দেবেন। সহিহ মুসলিমের ১৯১৫ নং হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, রাসূল সা: একবার সাহাবিদের জিজ্ঞাস করলেন, তোমরা কি জানো কারা শহীদ? উত্তরে তারা বললেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছেন তারা। তখন রাসূল সা: বললেন, এ রকম হলে তো আমার উম্মতের মধ্যে শহীদের সংখ্যা একেবারে কমে যাবে। সাহাবিরা বললেন, তাহলে আর কারা শহীদ? রাসূল সা: বললেন, আল্লাহর রাস্তায় যারা নিহত হন তারা তো শহীদ বটেই পাশাপাশি আরো কিছু মানুষ শহীদের মর্যাদা পাবেন। তারা হলেনÑ মহামারীতে (ঈমান নিয়ে) যারা মারা যায়, পেটের রোগে যারা মারা যায়, পানিতে ডুবে যারা মারা যায়। এভাবে আরো কিছু বর্ণনায় ৭ বা ৮ ধরনের মৃত্যুবরণকারীদের শহীদের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।
সুনানে নাসাঈর ৪০৯৩ নং হাদিস বর্ণিত হয়েছে, অন্যায়ভাবে যদি কাউকে হত্যা করা হয় সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। সুনানে তিরমিজি ১৪২১ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার দ্বীনকে হেফাজত করতে গিয়ে মারা গেলে, সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেলে, রক্ত বাঁচাতে গিয়ে মারা গেলে, পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেলে, সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেলে, দেয়ালের নিচে বা ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে মারা গেলে, ফুসফুসের রোগে মারা গেলে, আগুনে পুড়ে মারা গেলে, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বা সন্তান ধারণের কারণে কেউ মারা গেলে তারা শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন।
সুতরাং আমরা বলতে পারি আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করার পাশাপাশি উপরিক্তভাবে মৃত্যুবরণকারীসহ হাদিসে যাদের শহীদের মর্যাদা দেয়ার কথা বলা হয়েছে তাদের সবাইকে শহীদ বলা যাবে। অবশ্যই ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে তবেই আল্লাহর দরবারে শহীদের মর্যাদা পাওয়ার আশা করা যায়। এই বিষয়ে আমরা এতটুকই বলতে পারি। বাদ বাকি আল্লাহই ভালো জানেন। আল্লাহ আমাদের শহীদী মৃত্যু দান করুন। আমিন।
লেখক : আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামিক স্কলার



আরো সংবাদ