২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
`

মিরাজ ও বিজ্ঞান

-

মিরাজ রাসূলুল্লাহ সা:-এর মুজিজা। আর এক মহা কৌশলীর কৌশল। কুন, ফাইয়া কুনের বাস্তবতা। ভূমণ্ডল-নভোমণ্ডল, মহাবিশ্বের জগৎপতির মহা কুদরত। যিনি বাতাসে ভাসিয়ে রেখেছেন গ্রহ, নক্ষত্র, যিনি সৃষ্টি করেছেন জন্ম-মৃত্যু, যার কুদরতে হয় প্রাণ সঞ্চালন, যিনি প্রত্যহ করেন মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ; তিনি হলেন সর্বসত্তার ধারক ও বাহক, সেই সত্তাই ঘটিয়েছে রাসূলুল্লাহ সা:-এর মিরাজ, তার পক্ষে এটি জটিল আর কঠিনের কিছুই নেই বরং অতি সহজ। সর্বশক্তিমানের বাণী- ‘পবিত্র মহিমান্বিত তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য, তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (সূরা বনি ইসরাঈল ১৭/১)।
প্রথমে রাসূলুল্লাহর মিরাজকে অবিশ্বাস বিজ্ঞান দিয়ে খণ্ডন করব, তারপর যুক্তি, পরে বাস্তব প্রমাণাদি দেবো। এ আয়াতাংশে রয়েছে, ‘পবিত্র মহিমান্বিত তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসায়।’ এ কথা শুনে কাফের-মুশরিকরা বলেছে- তা কিভাবে সম্ভব? যেখানে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত বেশ অনেক দিনের রাস্তা। প্রাচীন যুগের মানুষের কাছে আশ্চর্য হলেও আধুনিক যুগের মানুষের কাছে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। কারণ বিজ্ঞানের গতি সংক্রান্ত যান প্রমাণ করে, সামান্য সময়ে বহু দূর পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব। শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতির (হাইপারসনিক) একটি উড়োজাহাজ ঘণ্টায় ৪ হাজার ২২৮ কিলোমিটার গতিবেগে উড়েছে। এক্স-ফিফটিওয়ানে ওয়েভরাইডার নামের ওই উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া উপকূল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে আকাশে উড়িয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী। গবেষকদের আশা, এই উড়োজাহাজে চড়ে হয়তো কয়েক মিনিটেই বিশ্ব পরিভ্রমণ সম্ভব হবে। আবার নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই ০২:৫৬ তে যে চন্দ্র যানটি নিয়ে অবতরণ করেছে, (অ্যাপোলো-১১)-এর গতি সেকেন্ডে ১১.৬ কিলোমিটার। সুতরাং রাসূল সা:-এর বোরাকের গতি তত দ্রুতগামী, যত দ্রুত আল্লাহ চেয়েছেন।
আবার এমনো হতে পারে, আল্লাহ তার রাসূলকে ভবিষ্যতে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে মিরাজের ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো- কিভাবে ভবিষ্যতে প্রবেশ করা সম্ভব? আল্লাহ মহা সর্বশক্তিমান, তিনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞাত। কুন, ফাইয়া কুন অর্থাৎ- হও বললেই হয়। ভবিষ্যতে রাসূলুল্লাহ সা:কে প্রবেশ করানো তার পক্ষে কঠিন ও জটিলতার কিছুই নয়। আমি জানি, এ উদাহরণ হয়তো বা অবিশ্বাসীরা গ্রহণ করবে না। কিন্তু আমি যদি বলি ভবিষ্যতে প্রবেশ করা বিজ্ঞানসম্মত। আইনস্টাইনের থিওরি অনুসারে কম গতিশীল কোনো বস্তুতে সময় অধিক পরিমাণ চলে। আর যে বস্তু অধিক গতিতে চলে, তার সময়ও তুলনামূলক কম গতিসম্পন্ন বস্তুর চেয়ে কম দ্রুত চলে।
বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে বলা যায় এভাবে- যে বস্তুর গতি কম, তার সময় চলবে দ্রুত। আর যে বস্তুর গতি বেশি, তার সময় চলবে আস্তে। এটিকে time dilation বলা হয়।
আইনস্টাইনের টাইম ডিলেশনকে কার্ল সেগান মেথম্যাটিক্যালি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তিনি ১৯৮০ সালে তার বিখ্যাত ‘কসমস’ সিরিজে এ বিষয়ের যে পর্বটি করেছেন তার নাম দিয়েছে ‘টুইন প্যারাডক্স’ বা ‘জমজ বিভ্রান্তি’। আবার টাইম ডিলেশনকে কেন্দ্র করে হলিউডে ব্লকবাস্টার মুভিও তৈরি হয়েছে ২০১৪ সালে। বৈজ্ঞানিক লেখক কার্ল সেগানের কসমস সিরিজের ‘টুইন প্যারাডক্স’ বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরলে স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। ধরুন রহিম ও করিম জমজ দুই ভাই। তাদের দু’জনের বয়স ২০ বছর। হঠাৎ রহিম পরিকল্পনা নিলো স্পেসশিপে করে মহাবিশ্ব ভ্রমণে বের হবে। পৃথিবী থেকে পাঁচ হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে যা কিছু আছে তা দেখে আসবে। আর পাঁচ হাজার আলোকবর্ষ ভ্রমণ করবে মাত্র চার বছরের মধ্যে। ধরা যাক, রহিম এমন একটি স্পেসশিপ নিয়েছে যার গতি আলোর গতির থেকেও অনেক বেশি, অথবা তার সমপরিমাণ গতি। এখন রহিম তার ভাইয়ের কাছ থেকে নয়নাশ্রু ঝরিয়ে ২০১৭ সালে বিদায় নিয়ে স্পেসশিপে রওনা হলো মহাশূন্যের পথে। যখন রহিম তার ভাই করিমের কাছ থেকে বিদায় নিলো তখন তাদের বয়স কাঁটায় কাঁটায় ২০ বছর। দু’জনই টকবগে যুবক। এখানে রহিমের ভাই করিম পৃথিবীতে আছে আর রহিম আলোর গতির একটি স্পেসশিপে সেহেতু রহিমের গতি করিমের তুলনায় অনেক বেশি। আইনস্টাইনের থিওরির মতে, গতিশীল বস্তুতে সময় কম দ্রুত চলে। তাহলে রহিমের সময় চলছে আস্তে। থিউরি আবার বলেছে, কম গতিশীল বস্তুতে সময় অত্যন্ত দ্রুত চলে। তাহলে করিমের সময়গুলো চলবে দ্রুত। এখন ধরুন, স্পেসশিপে যাওয়ার সময় রহিমের হাতে যে ঘড়ি ছিল, সেই ঘড়ির সময় অনুযায়ী ঠিক কাঁটায় কাঁটায় চার বছর পর রহিম ৫০০ আলোকবর্ষ ভ্রমণ করে পৃথিবীতে এলো। এখন প্রশ্ন হলো- রহিমের বয়স কত? ২০+৪= ২৪ বছর। পৃথিবীতে এসে যখন রহিম জমজ ভাই করিমের সামনে যাবে, তখন তার বয়স কত হবে? তার বয়স কি ২৪ হবে? কস্মিনকালেও না! তখন তার ভাই করিমের বয়স হবে প্রায় ৭৫ বছরেরও বেশি। কারণ কম গতিশীল বস্তুতে সময় অত্যন্ত দ্রুত চলে। আর একই বয়সের রহিমের বয়স কেন ২৪ বছর? কারণ গতিশীল বস্তুতে সময় কম দ্রুত চলে।
প্রিয় পাঠক! বিষয়টি কী অবাক হওয়ার বিষয় নয়? পৃথিবী থেকে যাওয়ার সময় রহিমের মতোই করিমের বয়স ছিল ২০ বছর। রহিম পৃথিবীতে এসে দেখে তার সমবয়সী ভাই করিমের বয়স প্রায় ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধ লোক। বয়সের ভারে করিম নুয়ে গেছে। শরীর ভেঙে পড়েছে। এটাই হলো আইনস্টাইনের টাইম ডিলেশন থিওরি অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক লেখক কার্ল সেগানের ‘টুইন প্যারাডক্স’ বা ‘জমজ বিভ্রান্তি’।
এখন লক্ষণীয় বিষয় যেটা- আইনস্টাইনের টাইম ডিলেশন থিওরিটি কেন্দ্র করে কার্ল সেগান টুইন প্যারাডক্সের মাধ্যমে মেথম্যাটিক্যালি প্রমাণ করলেন, ভবিষ্যতে প্রবেশ করা যায়। তাহলে মিরাজের রজনীতে মহান আল্লাহ তার রাসূলকে রফরফের মাধ্যমে (দ্রুতগামী যন্তু, যেটাকে স্পেসশিপের সাথে তুলনা করা যায়) ভবিষ্যতের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে মিরাজের ঘটনাটা ঘটিয়েছেন। যদিও এক রাত্রি কিন্তু কত বছর কেটেছে (তা আল্লাহ ভালো জানে); যেমন রহিম চার বছর ৫০০ আলোকবর্ষ ভ্রমণ করে এসে দেখল তার জমজ ভাইয়ের বয়স প্রায় ৭৫ বছর। অথচ রহিমের বয়স ২৪ বছর। বিজ্ঞানের এ থিওরি প্রমাণ করে, রাসূলুল্লাহ সা:-এর মিরাজ সত্য ও বাস্তব।
(কাল শেষাংশ)



আরো সংবাদ