১১ আগস্ট ২০২২
`

জীবিকার সকল কিছু ছেড়ে দিতে হলেও খুশি, ঘাটের হকাররা

জীবিকার সকল কিছু ছেড়ে দিতে হলেও খুশি, ঘাটের হকাররা - ছবি: নয়া দিগন্ত

পদ্মা সেতু চালুর মধ্যে সমাপ্তি ঘটতে চলছে মাওয়া শিমুলিয়া ঘাটের চিরচেনা হকারি ব্যবসা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় তাদের ছাড়তে হবে হকারি। তারপরও খুশি তারা। বছর পাঁচেক আগে পরিবারের জোয়াল কাঁধে নিতে বরিশালের দেশের বাড়ি থেকে বের হন আকবর খলিফা। মামার হাত ধরে ২০১৭ সালে আসছেন এ শিমুলিয়া ঘাটে।

তখন থেকে শুরু করেন হকারি। জীবিকার তাগিদে কখনও তিনি শিমুলিয়া ঘাটে আইসক্রিম, কখনও আমড়া, আবার কখনও কাঁচা আম কিংবা বাদাম বিক্রি করতেন তিনি। ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ চালানো সবুজ এখন তিন কর্মচারীর মালিক। ঘাট ঘিরে আকবরের কারণে ছয় সদস্যের সংসারের চাকা ঘুরছে পাঁচ বছর ধরে। সেই মানুষটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হয়েছে তাই চলে যাবেন দেশের বাড়ি।

শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকা সাংবাদিকদের সাথে কথা হয় আকবর খলিফার। বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে এ ঘাটে আছি। হকারি করে পরিবার চালাই। এখন তিন কর্মচারীর মহাজন আমি। তাদের বেতন দেই। আমারও সংসার চলে, তাদেরও সংসার চলে। ব্রিজ (পদ্মা সেতু) চালু হয়েছে এখন, প্রথম দিনেই ঘাটের যে অবস্থা তাতে বাড়ি চলে যেতে হবে। সকলে চলে যেতে বলেছে অনেক আগেই। কর্মচারীরাও চলে যাবে। বরিশাল গিয়ে নিজের কেনা অটো চালাব। তবে, এখান থেকে চলে যেতে অনেক খারাপ লাগবে।’

আকবর খলিফা বলেন, ‘ঘাটের জন্য একটা মায়া জন্মায়ছে। পাঁচ বছর হলো এখানে আইছি। এখানে থাকার খুব ইচ্ছা হয় কিন্তু সেটা চাইলেও আর সম্ভব না। চইলা গেলেও পরাণটা এখানে রইয়া যাবে।’

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত থেকে গাড়িতে চড়ে মাত্র ছয় থেকে আট মিনিটে পৌঁছে যাচ্ছেন শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে। এতে সম্পূর্ণ গুরুত্ব হারিয়েছে পদ্মা পাড়ের ঘাট দু’টি। পাশাপাশি শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তও তখন হয়ে উঠবে নিরবতা।

প্রথম দিনেই বন্ধ হয়ে গেছে মাওয়া-জাজিরা রুটে হকারদের জমজমাট বেচাকেনা। যাত্রীদের তেমন পদধুলি পরবে না এই শিমুলিয়া ঘাটে। প্রথম দিনেই সুনসান নিরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

প্রায় দু’যুগ আগে শিমুলিয়া ঘাটে হকারি শুরু করেন ফরিদপুরের আমিন মুন্সি। বাদাম বিক্রি দিয়ে শুরু। গত পাঁচ বছর ধরে মালাই বিক্রি করছেন তিনি। দু’যুগের বন্ধন ছেড়ে তিনিও অন্যত্র চলে যাবেন।

তিনি বলেন, ‘সেতু চালু হইলো আমরা সবাই খুশি। কিন্তু সেতু চালুতে আমাদের কাজ থাকলো না। হয়তো এখানে আরো কিছু দিন থাকব, এরপর অন্য জায়গায় গিয়ে হকারি করব। এ ঘাটে যে মায়া, সেটা কোথাও গিয়ে পাব না। ঘাটের জন্য একটা মায়া জন্মায়ছে। তিন বছর হলো এখানে আইছি। এখানে থাকার খুব ইচ্ছা হয়, কিন্তু সেটা চাইলেও আর সম্ভব না। চইলা গেলেও পরাণটা এখানে রইয়া যায়।’

হকারদের মতো শিমুলিয়া ঘাট ঘিরে যাদের সংসারের চাকা ঘুরছে, স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দু’প্রান্ত যুক্ত হওয়ার পর তাদের কপালে যেন চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেছে। বিশেষ করে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের হকারদের জীবন-জীবিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

মাওয়া-জাজিরা প্রান্তের হকারদের কেউ কেউ ঢাকায়, আবার কেউ নিজ এলাকায় ফিরে যাবেন বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকদের। কিন্তু সেতু চালু হলে ঘাট থাকবে, আমাদের কাজ থাকবে না। হয়তো এখানে আরো কিছু দিন থাকব, এরপর অন্য জায়গায় গিয়ে হকারি করব।

মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের হকার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাবাজার ও জাজিরা ঘাটে ২০০ মতো হকার রয়েছেন। লঞ্চ, ফেরি বা স্পিডবোট ব্যবহারকারী যাত্রী তাদের ক্রেতা। লঞ্চ বা ফেরিতে ঘুরে ঘুরে তারা শসা, গাজর, বাদাম, কাঁচা আম, মালাই, আইসক্রিম, ঝালমুড়ি, ছোলা, সেদ্ধ ডিম, শিঙাড়া, নারিকেল-চিড়া, দইসহ নানা রকম মুখরোচক খাবার বিক্রি করেন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা, কেউবা রাত অবধি ঘাট এলাকা ঘুরে খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসার চালান। যাত্রী না পেলে তারা বেকার হয়ে পড়বেন হকারদের ভাষ্য, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও জাজিরা ঘাটে বর্তমানে ৮৭টি লঞ্চ, দু’শতাধিক স্পিডবোট ও ৫৭টি ফেরি চলাচল করছে। প্রতি দিন সেবা নিচ্ছেন হাজার হাজার যাত্রী। ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে এসব যাত্রীর পা পড়বে না এ রুটে। ফলে হকারদের আর গুরুত্ব থাকবে না।

শিমুলিয়া ঘাটের পাশে রানীগাঁও এলাকার বাসিন্দা আব্দুর সত্তার বলেন, ‘সেতু চালু নিয়ে এপাড়-ওপাড়ের সবাই খুশি। আমরাও চাইছিলাম সেতু চালু হোক। মানুষের ভোগান্তি কম হোক। হয়তো কিছু লোক বেকার হয়ে পড়বে। জীবিকা নির্বাহ কষ্টকর হয়ে পড়বে। তারপরও সবার ভালো চাওয়াই আমাদের কাম্য।’

কাজ হারালেও পদ্মা সেতু চালু নিয়ে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসিত গোপালগঞ্জের পুলিয়র বাসিন্দা মো: কামাল হোসেন। ১০ বছর ধরে স্থানীয় এক খাবারের হোটেলে কাজের পাশাপাশি শিমুলিয়া ঘাটে হকারিও করেন তিনি। বলেন, ‘ভাই, ভাবতেই আনন্দ হচ্ছে। সেতু চালু হয়ে গেছে, এক টানে ঢাকা চলে যাব। আবার ঢাকা থেকে খুবই অল্প সময়ে বাড়ি পৌঁছে যাব। ঘাটে এসে কারও আর বসে থাকা লাগবে না। আমরা যারা ঘাটে হকারি করি তারা অন্যকিছু করে খেতে পারব। আমিও অন্য কাজ খুঁজে নেব। গ্রামে গিয়া ধান কাটব। শীতকালে লেপ-তোশকের কাজ করব। বিভিন্ন জায়গায় গিয়া কামলা দেব।’ আমার ভালোই লাগছে ।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর মূল পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) আট বছরের অধিক সময় নিয়ে এটির নির্মাণকাজ শেষ করে। গত ২২ জুন সেতুটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়া হয়।


আরো সংবাদ


premium cement