২২ মে ২০২২
`

ঢাবির অধ্যাপক সাইদা হত্যা : আনারুলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

ঢাবির শিক্ষক অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফার খুনের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আনারুল - ছবি : নয়া দিগন্ত

টাকাই কাল হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফারের। সাথে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয়ার সময় বাঁধা দেয়ায় তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে নির্মাণ শ্রমিক আনারুল ইসলাম।

মঙ্গলবার বিকেলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. নিয়াজ মাখদুম এর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফারকে হত্যার কথা স্বীকার করে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে গ্রেফতারকৃত আনারুল ইসলাম।

তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এদিন তাকে আদালতে হাজির করে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।

জিএমপির উপ-কমিশনার (অপরাধ-উত্তর) জাকির হাসান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সাইদা গাফফার (৭১) হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আনারুল ইসলামকে (২৫) গত শনিবার তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় আনারুল। আদালতে জবানবন্দি প্রদানকালে সে অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফারকে হত্যার কথা স্বীকার করে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফার গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানাধীন দক্ষিণ পাইনশাইল এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আবাসন প্রকল্পের ভেতরে নিজ প্লটে বাড়ি নির্মাণ কাজ তদারকি করতেন। ওই প্লটের চারটি গাছ কাটার জন্য দায়িত্ব দেন তার নির্মাণাধীন বাড়ির রাজমিস্ত্রির হেলপার আনারুল ইসলামকে। গাছ কাটার কাজ শেষে ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিজের ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন ঢাবির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফার। এ সময় তার সাথে ছিল আনারুল। নির্জন পথে কিছুদুর যাওয়ার পর অধ্যাপক সাইদার গলায় ঝুলানো পার্টস (ব্যাগ) থেকে মুজুরি বাবদ ৩০০ টাকা দেন আনারুলকে। এ সময় ওই পার্টসে আরো টাকা দেখতে পায় সে।

তিনি জানান, ব্যাগে থাকা টাকার লোভ সামলাতে না পেরে আনারুল অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফারের কাছ থেকে হঠাৎ ব্যাগটি টেনে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। ব্যাগটি গলায় আটকে গেলে তার প্রাথমিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ সময় অধ্যাপক সাইদা চিৎকার শুরু করলে তার মুখ চেপে ধরে আনারুল। উপায়ান্তর না পেয়ে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আনারুলের ডান হাতে কামড় দেন সাইদা গাফ্ফার। এতে আনারুলের হাত জখম হয়। পরে অধ্যাপক সাইদাকে মাটিতে ফেলে নাক-মুখ ও গলা চেপে ধরে। একপর্যায়ে অধ্যাপক সাইদার গায়ে থাকা চাদর দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখে। তার দেহ নিস্তেজ হলে নিহতের পা ধরে টেনে পাশের ঝোপের ভেতর নিয়ে ফেলে রাখে। পরে তার ব্যাগ থাকা ১০ হাজার টাকা ও দুইটি মোবাইলসহ ভাড়া বাসার চাবি নিয়ে নেয়। এ সময় নিহতের পায়ের স্যান্ডেল ও ব্যাগ ঝোপের ভেতর ফেলে দেয় এবং একটি মোবাইল সেট মাটিতে পুঁতে রাখে। অপর বাটন মোবাইল ও চাবি নিয়ে নিহতের ভাড়া বাসায় যায় আনারুল। ওই বাসায় ঢুকে আরো টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করার জন্য সে আলমারি খুলে তছনছ করে। সেখানে কিছু না পেয়ে আলমারি ও বাসার দরজা খোলা রেখে রাতেই গাইবান্ধা এলাকার শ্বশুর বাড়িতে পালিয়ে যায় সে। পরদিন সেখান থেকে নিজ বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করে। হত্যার এ ঘটনা সে একাই ঘটিয়েছে বলে স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে গ্রেফতারকৃত আনারুল ইসলাম।

তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার তিনদিন পর ওই ঝোপ থেকে নিহতের লাশ এবং স্যান্ডেল, ব্যাগ ও মোবাইল উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতের কাছ থেকে দুই হাজার ৬৫০ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। ছিনিয়ে নেয়া বাকি টাকা সে খরচ করে ফেলেছে। পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফার খুনের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফারকে হত্যার ঘটনায় মামলার একমাত্র আসামি গ্রেফতারকৃত আনারুল ইসলামকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিএমপির কাশিমপুর থানার এসআই দীপংকর রায়। গ্রেফতারকৃত আনারুল গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুর থানার বুর্জুগ জামালপুর গ্রামের আনসার আলীর ছেলে।

প্রসঙ্গত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক সাইদা গাফ্ফার গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানাধীন দক্ষিণ পাইনশাইল এলাকার মোশাররফ হোসেন মৃধার বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। ওই বাড়িতে থেকে তিনি স্থানীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আবাসন প্রকল্পের ভেতরে নিজ প্লটে বাড়ি নির্মাণ কাজ তদারকি করতেন। গত ১১ জানুয়ারি রাতে ওই এলাকা হতে নিখোঁজ হন তিনি। তার সন্ধান না পেয়ে মেয়ে সাহিদা আফরিন ১২ জানুয়ারি কাশিমপুর থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করেন। পরে তার ছেলে সাউদ ইফখার বিন জহির একটি মামলা করেন।


আরো সংবাদ


premium cement