৩০ জুলাই ২০২১
`

মানিকগঞ্জে কাঁচা মরিচের কেজি ৫ টাকা

মানিকগঞ্জের ঘিওরের বরংগাইল হাটে মরিচ বিক্রির জন্য আড়তে তুলেছেন কৃষকরা - ছবি : নয়া দিগন্ত

মরিচ চাষ করে বিপাকে পড়েছেন ঘিওর উপজেলাসহ মানিকগঞ্জের কৃষকরা। এবার মরিচের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মরিচ চাষিদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা। উৎপাদন খরচ, ক্ষেত থেকে মরিচ তুলে বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে যে টাকা খরচ হয় সে টাকাও উঠছে না। এতে চাষিরা মরিচ নিয়ে পড়েছেন মহাবিপাকে। মানিকগঞ্জে প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র পাঁচ টাকায়। অথচ একই মরিচ রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে দাম বেড়ে হয়ে যাচ্ছে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। এবার যদি মরিচের দাম আর না বাড়ে তাহলে মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে চাষিদের। এ অঞ্চলের কাঁচা মরিচ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণের দাবি মানিকগঞ্জের কৃষকদের।

অপর দিকে করোনাভাইরাসের কারণে বিমান চলাচল ও রফতানি প্রক্রিয়াজাত করণে নানা জটিলতার কারণে প্রায় শূন্যের কোটায় মানিকগঞ্জের কাঁচা মরিচের রফতানি বাজার। নামে মাত্র অল্প কিছু মরিচ পাঠানো হচ্ছে বিদেশের বাজারে।

জেলার ঘিওর উপজেলার ঘিওর হাট, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড, কেল্লাই আড়ত, বাঠইমুড়ি বাজার, হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা, বাল্লা, বাস্তা, মাচাইন, শিবালয় উপজেলার বরংগাইল, নালী, রূপসা, তাড়াইল, শাকরাইল এবং মরিচ কেনাবেচার বিখ্যাত হাটবাজার। মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গত বছর মরিচের দাম ভালো হওয়াতে এবার মরিচের আবাদ বেড়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। এ বছর পাঁচ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমিতে মরিচ আবাদের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ছয় হাজার ৭৫০ হেক্টর।

সরজমিন গত বৃহস্পতিবার জেলার বৃহত্তর মরিচ হাট বরংগাইলে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত কৃষক বস্তা ভর্তি মরিচ নিয়ে বসে আছেন একটু ভালো দাম পেয়ে বিক্রির আশায়। কিন্তু তাদের এই আশা সফল হয়নি। অনেকটা ক্রেতা শূন্য বাজার। এক সপ্তাহ ধরে কাঁচা মরিচের দাম একই জায়গাতেই রয়ে গেছে। হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসা বেশ কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার মরিচের বাম্পার ফলনই কাল হয়েছে কৃষকের। উৎপাদন কম হলে দাম ভালো পাওয়া যেত এমন কথা অনেকের।

বিভিন্ন হাট থেকে কৃষকদের কাছ থেকে পাইকারি কিনে বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় খুচরা বিক্রেতা মো: বাহাদুর মিয়া জানান, জেলার ঘিওর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলা মরিচ চাষের জন্য বিখ্যাত। এ অঞ্চলে উৎপাদিত বিন্দু জাতের মরিচের বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভালো দাম পেলে এ এলাকার কৃষকরা মরিচ চাষে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে।

বরংগাইল আড়তে কাঁচা মরিচ বিক্রি করতে আসা রাধাকান্তপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মো: মুন্নাফ মোল্লা বলেন, এ বছর তিন বিঘা জমিতে মরিচের চাষ করেছি। সময়মতো সার, কীটনাশক প্রয়োগ এবং পরিচর্যার ফলে এ বছর যথেষ্ট পরিমাণ ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারে মরিচের চাহিদা না থাকায় আমরা হতাশার মধ্যে দিন পার করছি। বাজারে প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে। ক্ষেত থেকে মরিচ তোলা বাবদ শ্রমিককে কেজিপ্রতি দিতে হয় পাঁচ টাকা। বাজারে আনতে মণপ্রতি রিকশাচালককে দিতে হয় ২০ টাকা। আমার নিজের পারিশ্রমিক দিনে ৫০০ টাকা। অথচ বাজারে নিয়ে এক মণ মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা। এখন আমাদের নীরবে কান্না করা ছাড়া অন্য কোনো গতি নেই।

এই হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসা অনেক কৃষকের ধারণা, এখান থেকে পাইকরারা কম দামে মরিচ কিনে শহরের বেশি দামে বিক্রি করছেন। শহরের সাথে গ্রামে দামের ফারাক আকাশ পাতাল।

ঘিওর উপজেলার ধূলন্ডি গ্রামের মরিচচাষি তারাপদ সরকার বলেন, অন্যের কাছ থেকে এক বছরের জন্য বর্গা নিয়ে ১৪ হাজার টাকা খরচ করে মরিচ ক্ষেত করেছিলাম। কিন্তু আমাগো এখন মাথায় হাত। মরিচের দাম নেই। ক্ষেত থেকে তোলার খরচ ও পরিবহন খরচই উঠছে না।
বরংগাইল পাইকারি মরিচ বাজারের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক জানান, প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টন মরিচের আমদানি হয় বরংগাইল বাজারে। এখান থেকে প্রায় অর্ধশত আড়তদার মরিচ কিনে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠান। তবে বিমান চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় বিদেশের বাজারে মরিচ রফতানি করা যাচ্ছে না। যে কারণে চাহিদা কমেছে মরিচের। আর এতে করে লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহ-উপপরিচালক কৃষিবিদ আশরাফ উজ্জামান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর মরিচের বাম্পার ফলন হয়েছে। দাম কয়েকদিন আগেও ভালো ছিল। বর্তমানে দাম অনেক কম থাকায়, কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বিদেশে রফতানি না করতে পেরে মরিচের বাজার নিম্নমুখী। তবে বর্ষা মৌসুম আসার কারণে মরিচের বাজার এখন একটু চাঙ্গা হবে।



আরো সংবাদ