২৪ জুলাই ২০২১
`

মাদারীপুরে শাজাহান খান ও আ’লীগ সভাপতি সমর্থকদের সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত ১৫

মাদারীপুরে শাজাহান খান ও আ’লীগ সভাপতি সমর্থকদের সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত ১৫ - ছবি : নয়া দিগন্ত

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান ও মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।

শনিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সদর উপজেলার কলাবাড়ি ও ঘটকচর এলাকায় দফায় দফায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে দুটি ব্যাংক, অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল, বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও বসতঘরে ভাঙচুর চালানো হয়।

এ দিকে মহাসড়কের পাশে দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ চলায় প্রায় আধা ঘণ্টা বন্ধ থাকে যানবাহনের চলাচল। এতে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য শাজাহান খানের বাবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আছমত আলী খানের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লা।

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী জানান, সম্প্রতি রাজৈরে এক অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য শাজাহান খানের বাবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আছমত আলী খানের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লা। একইসাথে সংসদ সদস্য শাজাহান খান বর্তমানে বিএনপিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তোলেন। এরই প্রতিবাদে এক সপ্তাহ ধরে সংসদ সদস্য সমর্থিত নেতা-কর্মীরা জেলা সদর ও রাজৈর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ করে আসছিলেন।

অন্য দিকে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সংসদ সদস্য শাজাহান খান ও তার সমর্থকদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে সভা-সেমিনার চলে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সকালে আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লার পদত্যাগ ও বিচারের দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের কলাবাড়ি এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভের আয়োজন করেন শাজাহান খানের কর্মীরা। একই সময় ওই স্থানে শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লার সমর্থকরা প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। এতে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

পুলিশের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পুলিশ লাঠিপেটা করে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপরই উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় তিন পুলিশসহ আহত হন অন্তত ১৫ জন। এ সময় সংসদ সদস্য সমর্থিত নেতা-কর্মীরা ঘটকচর বাসস্ট্যান্ডের পাশের সরদার মার্কেটে ভাঙচুর ও হামলা চালান। এতে ওই মার্কেটে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের ঘটকচর শাখা, রেখা বিউটি পার্লার, একটি হোটেলে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়।

এ ছাড়া মার্কেটের প্রায় ৭টি ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ১০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। বর্তমানে পরিস্থিতি থমথমে থাকায় পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

ভাঙচুরের শিকার সরদার মার্কেটের স্বত্বাধিকারী ও কেন্দুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহরাব হোসেন সরদার বলেন, ‘জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রুবেল খান, সংসদ সদস্যের ছেলে আসিবুর রহমান খান, কেন্দুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জয়নাল মাতুব্বর লোকজন নিয়ে আমার নিজস্ব মার্কেটে হামলা ও ভাঙচুর চালান। এমন কোনো দোকানপাট নেই যে তাণ্ডব চালানো হয়নি। দুটি ব্যাংক, মসজিদ-মাদরাসা পর্যন্ত তারা বাদ রাখেননি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করব। আমি এর কঠোর বিচার চাই।’

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য শাজাহান খানের বাবাকে নিয়ে যে কথা বলেছি, তার ভুল বা সঠিক কী ছিল, সেই ব্যাখ্যা তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে আমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেছেন। তার সমর্থকদের দিয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর শুরু করেছেন। আজ যে হামলা ভাঙচুর হয়েছে, তা সংসদ সদস্যের ছেলে ও ভাতিজার নেতৃত্বে বিএনপির লোকজনকে দিয়ে করানো হয়েছে। হামলায় একজন মুক্তিযোদ্ধার মার্কেট ও তার
বসতঘর ভাঙচুর হয়েছে। এর দায়ভার সংসদ সদস্যের নিতে হবে। তিনি কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারবেন না।’

অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে সংসদ সদস্য শাজাহান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমার বাবাকে নিয়ে যে কথা বলেছেন, তা আমার ও মাদারীপুরবাসীর জন্য অপমানজনক। আমি রাজনৈতিকভাবে এলাকার জনগণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এর প্রতিবাদ করে যাব। আমার ছেলে, ভাতিজাসহ আমার পরিবারের স্বজনরা আজ তারই অংশ হিসেবে মানববন্ধনে যোগ দিতে কলাবাড়ি যান। সেখানে তাদের লক্ষ্য করে প্রথমে ঢিল ছোড়া হয়, এরপরই ঘটকচর এলাকায় আসার পর আবারো তাদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়া হয়। পরে সোহরাব সরদারের নেতৃত্বে হামলা চালানো হলে আমার ছেলে ও ভাতিজারা তা প্রতিরোধ করে। সেখানে তারা কোনো ভাঙচুর ও মারামারি করতে যায়নি।’

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তাফা রাসেল বলেন, ‘বিবাদমান দুপক্ষের বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। দু’পক্ষকে আমরা একত্র হতে দেইনি। ফলে মারামারি হয়নি। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধরা দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইটপাটকেল ছুড়ে ভাঙচুর করে, যা কয়েকটি সিসিটিভি দেখে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘দু’পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপে আমাদের তিনজন পুলিশ আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায়নি। থানায় কোনো পক্ষ অভিযোগও করেনি।’



আরো সংবাদ