ঢাকা, শনিবার,৩০ মে ২০২০

অপরাধ

জরুরি ওষুধের দাম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে

হামিম উল কবির

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬,শুক্রবার, ০৭:০৯


প্রিন্ট

জরুরি ওষুধের দাম বেড়েছে। সামনের দিনগুলোতে অবশিষ্ট ওষুধগুলোর দামও বাড়বে। কোনো কোনো ওষুধের দাম হঠাৎ করে ১০০ থেকে ৩০০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো একের পর এক ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছে বলে ওষুধ ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা জানিয়েছেন। একটি কোম্পানি কোনো গ্রুপের ওষুধের দাম বাড়ালে এর কিছু দিন পর অন্য কোম্পানিগুলো তা অনুসরণ করে দাম বাড়াচ্ছে। দেখার যেন কেউ নেই। কিভাবে দাম বেড়ে গেল ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারাও এর সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারছেন না। এমনকি ওষুধ শিল্প সমিতির কর্তাব্যক্তিরাও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না, কেন বেড়েছে। জানা গেছে, দাম বাড়ানোর জন্য ‘বাংলাদেশ ওষুধ প্রসাশন অধিদফতরে’ দু’টি কমিটি রয়েছে। এ দুই কমিটির সভা দীর্ঘ দিন হয়নি বলে জানা গেছে। তাহলে দাম বাড়ল কিভাবে?
সরকারের নির্ধারিত এসেনশিয়াল ড্রাগস (১১৭টি) ছাড়া অন্য যেকোনো ওষুধের দাম আইন অনুযায়ী ওষুধ কোম্পানি যে দামে বিক্রি করতে চায় ওষুধ প্রশাসন তাই অনুমোদন করে দেয়। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো: রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো ওষুধের দাম বেড়েছে কি না বলতে পারেননি।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম শফিউজ্জামানও ওষুধের মূল্য বৃদ্ধির সঠিক কারণ বলতে পারেননি। তিনি জানান, গত ছয় মাসে ওষুধ প্রশাসনে দাম বৃদ্ধিসংক্রান্ত কোনো কমিটির সভা হয়েছে বলে তার জানা নেই। উল্লেখ্য, এসেনশিয়াল ড্রাগসের তালিকার বাইরে অন্য ওষুধগুলোর দাম বাড়ানোর জন্য দুইটি কমিটি রয়েছে। তবে তিনি বলেন, হয়তো বিশ্ববাজারে ওষুধের কাঁচামাল অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টের (এপিআই) দাম বেড়ে থাকতে পারে অথবা ওষুধ প্যাকেজিংয়ের জন্য ব্যবহৃত সামগ্রীর দাম বেড়ে থাকতে পারে। এসব বাড়লে ওষুধের দাম কিছু বাড়তেই পারে।
ওষুধ উৎপাদনের সাথে জড়িতদের সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে ওষুধের দাম বৃদ্ধির বড় কোনো কারণ নেই। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে এপিআইর দাম বাড়লে এখানে ওষুধের দাম বাড়ে। একটি বড় ওষুধ কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে এপিআইর দাম বাড়েনি। তিনি জানান, বেশ কিছু দিন ধরে কয়েকটি বড় কোম্পানি আমেরিকান বাজারে বিক্রির জন্য ইউরোপিয়ান-আমেরিকান গ্রেডের এপিআই ব্যবহার করছে। ইউরোপিয়ান-আমেরিকান গ্রেডের এপিআই চীন বা ভারতে উৎপাদিত এশিয়ান গ্রেডের এপিআইর চেয়ে চার গুণ বেশি দাম। এ কারণে কয়েকটি কোম্পানি তাদের ওই ওষুধগুলোর দাম বাড়িয়ে নেয় ওষুধ প্রশাসন থেকে। আর এ সুযোগে অন্যান্য কোম্পানিও ওদের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের উৎপাদিত ওষুধেরও দাম বাড়িয়ে নেয়। ওষুধের দাম বৃদ্ধির পেছনে এটাই হয়তো কারণ হয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির তথ্য অনুযায়ী স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইনসেপ্টা, অপসোনিন, ওরিয়ন, সানোফি-এভেনটিস, নোভার্টিস, সেনডোজ, বিকন ফার্মা, হেলথকেয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। নিউরোলজি, গ্যাস্ট্রোএ্যান্টোরোলজি, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, হার্ট ডিজিজ, ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগের ওষুধ, ঘুমের ওষুধ এবং ক্যালসিয়ামের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বাজার পরিদর্শন করে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নোভারটিজের ৩০টি গ্যালভাসমেট ট্যাবলেটের দাম ৮৪৫ টাকা থেকে ৯৪৫ টাকা করা হয়েছে। ৪ টাকার ভোল্টারিন ট্যাবলেট ৫.৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ওরিয়ন ফার্মার ৩০টির পেপ-২ ট্যাবলেট ৬০ টাকা থেকে ৭৮ টাকা, ঠাণ্ডার ওষুধ ডেসলরের ১০০টি ট্যাবলেট ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করা হয়েছে। বীকন ফার্মার ৫ মিলিগ্রামের ৫০টি ফেঙ্গিব্যাক ট্যাবলেট ২২৫ থেকে ২৫০ টাকা করা হয়েছে। ১০ মিলির ৫০টি ফেঙ্গিব্যাক ট্যাবলেট ৪০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা করা হয়েছে। সানোফি এভেনটিসের ১২০ মিলির ৩০টি টেলফাস্ট ট্যাবলেট ২০০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা এবং ১৮০ মিলির ২০টি টেলফাস্ট ২০০ থেকে ২৪০ টাকা করা হয়েছে। অপসোনিনের ৩০টি পাস ট্যাবলেট ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া ৫ মিলির ৫০টি পাস ট্যাবলেট ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা করা হয়েছে।
ভিটামিন বি১+ভিটামিন বি৬+ভিটামিন বি১২ ওষুধ ৩০টির দাম আগে ১৫০ টাকা থাকলেও এখন তা ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি প্লাস ১৫০ টাকার পরিবর্তে ২১০ টাকা, পটাশিয়াম বাই কার্বনেট ১২৫ টাকার সিরাপ ১৫০ টাকা। স্কয়ারের ক্যালবো-ডি ১৫ ট্যাবলেটের প্রতিপাতা ৭৫ থেকে বাড়িয়ে ১০৫ টাকা এবং ৩০ ট্যাবলেটের পাতা ১৫০ থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে নিউরো-বি প্রতি কৌটা ১৫০ থেকে ২৪০ টাকা করা হয়েছে। অন্যান্য কোম্পানির ওষুধের দামও একইভাবে বাড়ানো হয়েছে বলে ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
রামপুরা বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বেশ কিছু ওষুধ বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল না। স্বল্পসংখ্যক দোকানে পাওয়া গেলেও দাম বেশি। ওষুধ বিক্রেতারা জানান, ‘নিয়ে যান, বেঁচে থাকার জন্য লাগবেই তো। কয়েক দিন পর আর এ দামে পাওয়া যাবে না। ১০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হবে।’ আপনি কিভাবে জানলেন, বেশি দামে কিনতে হবে? ’ প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘অর্ডার দিয়েও সরবরাহ পাচ্ছি না। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, কোম্পানি দাম বাড়াবে। সে জন্য উৎপাদন করছে না।’ ওষুধ দোকানির কথাকে আমলে নেননি তিনি। অল্প কিছু ওষুধ কিনে নিয়ে এসেছিলেন সেদিন। এখন তিনি আফসোস করছেন। কারণ তার প্রয়োজনীয় প্রতিটি ওষুধের দাম বেশি। তিনি বললেন, আমি কোথায় যাবো, কার কাছে বলবো আমার অভিযোগ? আমার মতো সীমিত আয়ের লোকের পক্ষে অনাকাক্সিত বেশি দামে ওষুধ কেনা কত দিন সম্ভব বলতে পারছি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওষুধ কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ওষুধের দাম বৃদ্ধি কেবল এর কাঁচামালের দামের ওপর নির্ভর করে না। আন্তর্জাতিক বাজারে এপিআইর দাম বাড়েনি; কিন্তু দেশে অনেক কিছুর দাম বেড়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে বেড়েছে শুল্ক। ঢাকার বাইরে বিদ্যুতের খুব খারাপ অবস্থা। সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে জেনারেটর প্রয়োজন হয় বিদ্যুতের জন্য। পুরনো জেনারেটর দুই বছরের বেশি চালানো যায় না। নতুন কিনতে হয় ঝামেলাহীন উৎপাদনের জন্য। জেনারেটরে প্রতি ঘণ্টায় ১১০ টাকার তেল পোড়ে। কোনো ওষুধ কোম্পানি যদি আগে বিদ্যুতের পেছনে মাসে ২০ লাখ টাকা খরচ করত এখন হচ্ছে ৪০ লাখ টাকা। তিনি জানান, গত জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে বেতন দেয়া হচ্ছে। এর সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ কোম্পানির জনশক্তিরও বেতন বাড়াতে হয়েছে। এর সাথে মুদ্রাস্ফীতিও বেড়েছে অনেক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ এখন বিশ্বের ১২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে উন্নতমানের মেশিন ও কাঁচামাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই যে এত খরচ হচ্ছে এসব কোথা থেকে আসবে? খরচ পোষানোর জন্য স্বভাবতই ওষুধের দাম বাড়াতে হয় এবং এটা অযৌক্তিক কিছু না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫