ঢাকা, শনিবার,৩০ মে ২০২০

প্রবাসের খবর

নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন ফিরে আসারা

মালয়েশিয়ায় ডিটেনশন ক্যাম্পে সহস্রাধিক বাংলাদেশী

মনির হোসেন

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬,শুক্রবার, ০৬:২৮


প্রিন্ট

সাগরপথে ও অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে মাসের পর মাস কারাগার এবং ১১ ডিটেনশন ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। এর মধ্যে শুধু কুয়ালালামপুরের অদূরের লেনটিং নামক একটি ডিটেনশন ক্যাম্পেই সহস্রাধিক বাংলাদেশী বন্দী রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইমিগ্রেশন ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের হাতে প্রতিনিয়ত তারা ‘ভয়াবহ’ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তাদের এসব কষ্ট দেখার জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম বিভাগের লোকজন থাকলেও তারা কেউ-ই খোঁজ নিতে যান না। যার কারণে দালালের কাছে একবার টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় আবারো দেশ থেকে টাকা পাঠানোর পর তাদের মুক্তি মিলছে। কিন্তু দুই দেশের আদম পাচার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতরা এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে কারণে এখনো দেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, রিজেন্ট, মালিন্দ্য ও মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফাইটে ‘ট্যুরিস্ট’ সেজে যাত্রী যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে।
গত বুধবার রাতে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফাইটে কারাগারে মানবেতর জীবন কাটানো হতভাগ্য ৯০ বাংলাদেশী দেশে ফিরে আসেন। তাদের অনেকেই হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় কেউ কেউ মালয়েশিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে তাদের মানবেতর জীবন কাটানো ভয়াবহ কষ্টের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সরেজমিন খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায়, বুধবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফাইট শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২ নম্বর যাত্রী টার্মিনালের গেট দিয়ে ট্রলিতে মালামাল নিয়ে যাত্রীরা বের হতে থাকেন। এ সময় ২৫ বছর বয়সী এক যুবক টার্মিনাল থেকে বের হতেই এক বৃদ্ধ তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেন। পরে দুইজনেই চোখ মুছতে মুছতে বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করেন। এ সময় হাতে শুধু পাসপোর্ট ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
বৃদ্ধ সামসুল মিয়াকে কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ও আমার ছেলে। নাম আলমগীর। এক কাপড়ে মালয়েশিয়া থেকে এসেছে। ৮-৯ মাস ধরে জেলখানায় ছিল। এখন ট্রেনে নরসিংদীর রায়পুরায় চলে যাচ্ছি।
প্রতারিত আলমগীর এ প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে বলেন, দালালের খপ্পরে পড়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রলারে চড়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়া, তিন মাস কাজের পর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে সাড়ে আট মাস বন্দী থাকা এবং ক্যাম্পে পুলিশি নির্যাতনের ভয়াবহ কাহিনী বলতে শুরু করেন।
স্বাস্থ্য ভেঙে পড়া আলমগীর বলেন, গত বছর দালাল জামাল উদ্দিনের প্ররোচনায় আমি ভিটামাটি বিক্রি করে দুই লাখ ১৫ হাজার টাকা তুলে দিই। একদিন আমাকে জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ট্রলারে মালয়েশিয়া যেতে হবে। একদিন আমাকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্য ট্রলারে তুলে দেয়। এক মাস সাগরে ভেসে ভেসে মালয়েশিয়ায় পৌঁছি। যাওয়ার পর আমি একটি গ্লাস ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করি। কাজ করা অবস্থায় পাসপোর্ট না থাকায় পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। এরপর থেকেই কুয়ালালামপুরের অদূরে লেনটিং ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দিজীবন কাটাতে থাকি। পরে একই দালালের মাধ্যমে দেশ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠানোর পর দেশে ফিরে আসি।
তিনি বলেন, আজকের (বুধবার) ফাইটে আমার মতো আরো ৯০-১০০ জন জেলখানা থেকে সরাসরি দেশে এসেছে। প্রতি বুধবারের ফ্লাইটেই জেলখানা থেকে বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠায়। কারাগারে কত মাস ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ৮ তারিখ থেকে কারাগারে ছিলাম। এ সময় সেখানে তারা আমাদের উপর কী ভয়াবহ অত্যাচার নির্যাতন করেছে তা আমি এখন বলে শেষ করতে পারব না। তারা পদে পদে কিল ঘুষি লাথি মারে। আর যে খাবার খেতে দেয় সেটা ‘আমাদের দেশের গাই গরুকে দিলেও খাবে না’। তা-ও পরিমাণে খুব কম। হাইকমিশনের কেউ খোঁজ নিতে যান কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাইকমিশন থেকে কেউ খবর নিতে আসেনি। তার মতে, আমাদের ক্যাম্পে এখনো হাজারের ওপর বাংলাদেশী আটক আছে। আটক সবারই পাসপোর্ট সমস্যা। সেখানে থাকা খাওয়ার খুবই কষ্ট। কয়েক দিন আগে একজন মারাও গেছে। তার নাম সাদেক। আমাকে যে দালাল পাঠিয়েছিল সেই দালালই তাকে পাঠায়।
আমলগীরের বড় ভাই মোকাররম হোসেন বলেন, আমার ভাইকে খুঁজে বের করতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। আমি চাই আমার ভাইয়ের মতো যেন আর কারো সর্বনাশ না হয়। একই সাথে আমি দালাল জামাল উদ্দিনেরও বিচার চাচ্ছি। এখনো গ্রামে ঘুরে ঘুরে ফুসলিয়ে লোক জোগাড় করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠাচ্ছে। অনেক সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছে।
গতকাল বিকেলে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার কাউন্সিলর সায়েদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন ধরেননি। তবে বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বুধবার রাতে ৯০-১০০ যাত্রী লেনটিং ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরে গেছে সেই তথ্য আমি এখনো জানতে পারিনি।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে থাকা বাংলাদেশীদের ধরপাকড় করতে পুলিশ ও ইমিগ্রেশন বিভাগ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। এতে শত শত বাংলাদেশীসহ অবৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশীরা ধরা পড়ছে। এরপর পাঠানো হচ্ছে দেশটির ১১টি ডিটেনশন ক্যাম্পে। এই সুযোগে দুই দেশে গড়ে উঠা দালাল সিন্ডিকেট তাদের মুক্ত করার নামে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে টিকিট ও অন্যান্য খরচের কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার জমজমাট ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। এই চক্রের সাথে হাইকমিশনের (শ্রম বিভাগ) কিছু সদস্য জড়িত রয়েছে বলেও প্রতারিত শ্রমিকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫