স্বাধীনতা স্তম্ভ ও জাদুঘর

প্রীণন পাখোয়াজ

বেশ কয়েক বছর ধরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা বিশেষ অংশ টিন দিয়ে ঘিরে দেয়া ছিল। উদ্যানে ঘুরতে আসা লোকজনের জানার আগ্রহ ছিল সেখানে কী হচ্ছে। সে আসরে এতদিন ধরে কী হচ্ছিল, তা গত বছরই উন্মুক্ত হয়েছে সবার কাছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর। ভূগর্ভস্থ ওই জাদুঘর খুলে দেয়া হয় গত বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর খুলে দেয়ার পর থেকে দর্শকেরা ভিড় করছেন সেখানে। স্বাধীনতা জাদুঘরটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার বাস্তব নিদর্শনে আরো সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৪৪টি প্যানেলে বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতিসত্তার স্বাধীনতার ইতিহাস আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে।
আলোকচিত্রের মধ্যে রয়েছে মুঘল আমল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ের ছবি, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ছবি। আছে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এবং ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিশাল আকৃতির দু’টি ছবি। এ ছাড়া যে টেবিলের ওপর
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন তার অনুকৃতি (রেপ্লিকা)। বিভিন্ন বিদেশী পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপি এবং স্বাধীনতার সপক্ষে বহির্বিশ্বে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পুস্তিকার ছবি।
স্বাধীনতা জাদুঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য স্থাপত্যশৈলী। পাতালে অবস্থিত জাদুঘরটির বিশাল এলাকাজুড়ে ফাঁকা জায়গা। পুরো জায়গাজুড়েই স্থানে স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ের ছবি। জাদুঘরের মাঝখানে রয়েছে একটি ফোয়ারা। ফোয়ারাটি নেমে এসেছে মাটির উপরিভাগ থেকে। গত সপ্তাহে ঘুরে দেখতে গিয়ে দেখা গেল দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হয়ে দেখছেন সব স্থাপত্য। জাদুঘরের স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ দর্শনার্থী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্থাপত্য অসাধারণ, অসম্ভব সুন্দর। দেখে মজা পাচ্ছি। ইতিহাস জানতে পারছি। কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রেখে সাজালে আরেকটু বুঝতে সুবিধা হতো।’
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে স্বাধীনতা জাদুঘর পরিচালিত হচ্ছে। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে গণপূর্ত বিভাগ। স্বাধীনতা সংগ্রাম জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা সৈয়দ এহসানুল হক জানান, জাদুঘরটি প্রতি শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা এবং ১২ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশমূল্য দুই টাকা। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। এ ছাড়া সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘরটি বন্ধ থাকবে।
৬৭ একর বিস্তৃত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই স্থাপনার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ হাজার ৬৬৯ বর্গমিটার পাকা চাতাল বা প্লাজা এবং এর চারপাশে রয়েছে তিনটি জলাশয়, বাঙালি জাতিসত্তার অমরতার প্রতীক ‘শিখা চিরন্তনী’ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভিত্তি করে নির্মিত একটি দেয়ালচিত্র। জাদুঘরের উপরিভাগে রয়েছে ১৫৫ আসনসংখ্যার আধুনিক মানের মিলনায়তন। স্বাধীনতা
স্তম্ভটি বস্তুত ১৫০ ফুট উচ্চ একটি গ্লাস টাওয়ার। গ্লাস টাওয়ারে স্থাপিত লাইটের আলোকরশ্মি পাঁচ কিলোমিটার উঁচুতে প্রক্ষেপিত হয়, যা ঢাকাবাসী ইতোমধ্যেই রাতের আকাশে দেখেছেন।
ভূগর্ভস্থ ওই স্বাধীনতা জাদুঘর এক বছর আগেই খুলে দেয়া হলেও অনেকে সে খবর জানেন না। ওখানে গিয়ে তাই অনেককেই পাওয়া গেল যারা অবাক হয়ে স্থাপত্য দেখছেন আর বলাবলি করছেন- এটা কবে খুলে দেয়া হলো জানতাম না। দর্শনার্থী ফারজানা রিমি বলেন, ‘এটা খুব ভালো কাজ হয়েছে। নতুন প্রজন্ম এই স্বাধীনতা জাদুঘরে এসে দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখানে ইতিহাসের পাশাপাশি আলোকচিত্রও রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে আগ্রহী করে তুলবে।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.