ঢাকা, বুধবার,২৭ মে ২০২০

সিনেমা

চলে গেলেন কিংবদন্তি অভিনেতা সিরাজুল ইসলাম

আলমগীর কবির

২৪ মার্চ ২০১৫,মঙ্গলবার, ১৪:৪২


প্রিন্ট

হুট করেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন কিংবদন্তি অভিনেতা সিরাজুল ইসলাম। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় নিকেতনের নিজ বাসায় ইন্তেকাল করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তার জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ মে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। তবে কোনো ভাইবোনই বছরের বেশি পৃথিবীর আলো দেখতে পারেননি। শুধু তিনিই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় বেঁচে ছিলেন। আবদুল হক ও ও আরিফান্নেসা দম্পতির বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তানই ছিলেন পরিবারের সব আশা-ভরসার প্রতীক। তাই কড়া শাসনের মধ্যে যে কেটেছে তার ছেলেবেলা তা বলা যাবে না। সেই ছোটবেলা থেকেই জন্মস্থানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাঙ্গাদীঘির পাড়ে বসে কবিতা লিখতেন। পাশাপাশি অভিনয়টাও যেন ছিল তার দখলে। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে নাটক মঞ্চস্থ হতো। সে নাটকে সিরাজুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তি আর নাটকে অভিনয় করা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। সে সময় তার স্কুলের বাংলার এক শিক্ষকই মূলত তাকে অভিনয়ে উৎসাহী করে তোলেন। তিনিই সিরাজুল ইসলামকে অভিনয়ের সুযোগ করে দিতেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলো। তখন তিনি নবম শ্রেণীর ছাত্র। বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে চলে এলেন ঢাকায়। বসবাস শুরু হলো বাংলাবাজারে। বাংলাবাজারে কিশোরী লাল জুবিলী স্কুলে ভর্তি হলেন সিরাজুল ইসলাম। শুরু হলো তার নতুন জীবন, ঢাকার জীবন, একেবারে অন্য রকম জীবনযাপন- পুরোপুরি হুগলি থেকে আলাদা। এখানে এসে মঞ্চে অভিনয়ে মনোযোগী হয়ে উঠলেন। যেসব স্থানে মঞ্চাভিনয় করতেন সেখানে বেতারের স্টাফ আর্টিস্ট রনেন কুশারীর যাতায়াত ছিল। তিনি একদিন সিরাজুল ইসলামের অভিনয় দেখে সরাসরি তাকে রেডিওতে অভিনয়ের কথা বলেন। রনেন কুশারী অনেকটা জোর করেই ধরে নিয়ে বেতারে অভিনয়ের সুযোগ করে দিলেন। শুরু হলো ক্যাজুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে বেতারে সিরাজুল ইসলামের যাত্রা। ‘রূপালী চাঁদ’ নাটকে একজন স্কুলশিক্ষকের চরিত্রে বেতারে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। এরপর মঞ্চ ও বেতারে সমানতালে ব্যস্ত সময় পার করেন। এর মধ্যে মেট্রিক দেয়া হলো। পরিবারের প্রধান কর্তা বাবাও মারা গেলেন। এর দুই বছরের মাথায় বেতারে প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করলেন সিরাজুল ইসলাম। তার প্রথম প্রযোজনা ছিল ‘বৃষ্টি’। এ নাটকটি নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ইংরেজি গল্পের অনুবাদ করে। অভিনয় করেছিলেন খান আতাউর রহমান, ডা: সাঈদুন্নেসা হোসেনসহ আরো বেশ কয়েকজন। এভাবেই চলতে থাকে তার জীবন। কায়েদে আযম কলেজেও চলছে তার ছাত্রজীবন। কবি ফজল শাহাবুদ্দিন তার সেই ছাত্রজীবনেরই বন্ধু ছিলেন।

এম এ বারী নিবেদিত, ইস্টার্ন থিয়েটার্সের মালিক মাজীদ প্রযোজিত মহীউদ্দিন পরিচালিত ‘রাজা এলো শহরে’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। এ ছবিতে তিনি একজন প্রফেসরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রফেসর সালাউদ্দিন পরিচালিত ‘ধারাপাত’ ছবিতে অভিনয় করে চলচ্চিত্রে প্রথম পারিশ্রমিক পান। তিন শতাধিক ছবিতে সিরাজুল ইসলাম অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘নাচঘর’, ‘অনেক দিনের চেনা’, ‘শীত বিকেল’, ‘বন্ধন’, ‘ভাইয়া’ , ‘রূপবান’, ‘উজালা’, ‘১৩ নং ফেবু ওস্তাগার লেন’, ‘নয়নতারা’, ‘আলীবাবা’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’, ‘নিশি হলো ভোর’, ‘সপ্তডিঙ্গা’, ‘মোমের আলো’, ‘ময়নামতি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘ জাহা বাজে শাহনাই’, ‘বিনিময়’, ‘ডুমুরের ফুল’ ইত্যাদি। ১৯৮০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান প্রথা চালু হলেও ১৯৮৫ সালে ‘চন্দ্রনাথ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এরপর আর সে পুরস্কার পাওয়া হয়নি তার। তাতে কোনো আক্ষেপ ছিল না গুণী এই শিল্পীর। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি একটি নাটকের দল ছিল। নাম অবসর। এ দলে মোট সদস্য ছিলেন ১৫ জন। মূলত তারাই নাটকে অভিনয়সহ সব কাজ করতেন। জিয়াউল হুদা উজ্জ্বল ম্যানেজার হিসেবে অবসর নাট্যদলের সব কাজ তদারক করতেন। অবসর নাট্যদলের ব্যানারে ‘ফাঁস’, ‘কেনাবেচার পালা’, ‘গরুর গাড়ির হেডলাইট’সহ প্রায় দশটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। ১৯৮০ সালে সিরাজুল ইসলাম প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটি প্রযোজনা করেন জাফর। এ ছবিতে অভিনয় করেন শাবানা, বুলবুল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, গোলাম মুস্তাফা, রানী সরকার, সুমিতা দেবী, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। ছবিটি ব্যবসায়িক সফল হওয়ায় একই প্রযোজক তাকে দিয়ে ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন ‘সোনার হরিণ’ ছবিটি। তদানীন্তন সময়ের এমন কোনো শিল্পী নেই যিনি এ ছবিতে কাজ করেননি। এ ছবিতেই প্রথম ও শেষবারের মতো একসাথে অভিনয় করেন শাবানা, কবরী, ববিতা ও সুচরিতার সাথে। ছিলেন রাজ্জাক (দ্বৈত চরিত্রে), বুলবুল আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা ও সুমিতা দেবীর মতো শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী। এ ছবিটিও ব্যাপক ব্যবসাসফল হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫