০৬ এপ্রিল ২০২০

হোয়াইট হাউজে যাওয়ার দৌড়

-

যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার দৌড় সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করবে কে?
ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য গত বছর থেকে দলের ভেতরে একে অন্যকে টেক্কা দেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সামনের কয়েক মাসে আমরা দেখতে পাবো নির্বাচনে কে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মাঠে নামেন। ককাস থেকে শুরু করে কনভেনশন, হোয়াইট হাউজে যাওয়ার দৌড়ের বিষয়ে যা কিছু জানা উচিত, সেটিই এখানে তুলে ধরা হলো।
অন্য অনেক দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রাজনৈতিক দল নেই। দেশটিতে প্রধানত দু’টি দলই বেশি ভোট পেয়ে থাকে : ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান পার্টি। আধুনিক উদারনীতিতে বিশ্বাস করে ডেমোক্র্যাট পার্টিÑ যারা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী মূল্যের শিক্ষা, সামাজিক কর্মসূচি, পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নে বিশ্বাস করে। এই দলের সর্বশেষ প্রার্থী ছিলেন হিলারি ক্লিনটন, যিনি গত নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হেরেছেন।
রিপাবলিকান পার্টি, যে দলটি গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি অথবা জিওপি নামেও পরিচিতÑ আমেরিকান রক্ষণশীলতার প্রচারণা করে। যেমন সীমিত সরকারি নিয়ন্ত্রণ, কম কর হার, মুক্তবাজার পুঁজিবাদ, বন্দুকের অধিকার, নিয়ন্ত্রণমুক্ত শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অভিবাসন ও গর্ভপাতের মতো ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করায় বিশ্বাসী দল।
অন্যান্য ছোট ছোট রাজনৈতিক দলÑ যেমন লিবার্টারিয়ান, গ্রিন, ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টিও কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী মনোনয়ন ঘোষণা করে।
এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দেশজুড়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাকে বলা হয় প্রাইমারিস। যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানে এই ‘প্রাইমারি’ সম্পর্কে কিছুই বলা নেই- সুতরাং পুরো ব্যাপারটি নির্ধারিত হয় দল এবং রাজ্য আইন অনুযায়ী। যেভাবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ঠিক সেভাবেই, তবে দল নয়, বরং স্টেট সরকার প্রাইমারি নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে।
রাজ্য আইনে নির্ধারিত হয় যে, এই প্রাইমারি রুদ্ধদ্বার কক্ষে হবে কি না (অর্থাৎ যারা শুধু দলের রেজিস্টার্ড বা তালিকাভুক্ত, তারাই ভোট দিতে পারবেন) নাকি খোলা হবে (যেখানে যেকোনো ভোটার ভোট দিতে পারবেন)।
একজন প্রার্থী যদি প্রাইমারিতে বিজয়ী হন, তারা তখন স্টেটের সব প্রতিনিধির বা আংশিক প্রতিনিধিকে জয় করবেন, যা নির্ভর করে দলের আইনের ওপর। এই প্রতিনিধিরা দলের চূড়ান্ত সম্মেলনে তার পক্ষে ভোট দেবেন। এরপরে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। এই প্রাইমারি নির্বাচনপদ্ধতি পুরোপুরিই আমেরিকান একটা ব্যবস্থা। তবে অস্ট্রেলিয়া এবং ইসরাইলে অনেকটা একই ধাঁচে প্রার্থীদের পূর্ব-বাছাই প্রক্রিয়া রয়েছে।
ককাস কী? হাতেগোনা কয়েকটি স্টেটে, যেমন আইওয়ায় প্রাইমারির পরিবর্তে ককাস (রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সমিতি) রয়েছে। স্টেটজুড়ে প্রতিটি এলাকায় ককাসের আয়োজন করে দল। যেহেতু ককাস রাজ্য সরকার আয়োজন করে না, ফলে দলগুলো তাদের নিয়মনীতির ব্যাপারে (যেমন কে ভোট দিতে পারবে) বেশ শিথিলভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ডেমোক্র্যাট ককাসে কোনো ব্যালটে ভোট হয় না। এখানে ভোট হয় কক্ষের ভেতর দলবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়ার মাধ্যমে।
ট্রাম্প কখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন? ডেমোক্র্যাট দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ১৩ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই, যেখানে দলের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। রিপাবলিকান জাতীয় সম্মেলন আরেকটু পরের দিকে হবে, ২৪ আগস্ট থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত। জাতীয় সম্মেলনে ঘোষণা না করা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নন। এরপরে আমাদের চারটি বিতর্কের জন্য অপেক্ষা করতে হবে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তাদের ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হবেন। প্রেসিডেন্ট বিতর্কের ব্যাপারে ১৯৮৭ সালে গঠিত একটি নিরপেক্ষ কমিশন এই বিতর্কের আয়োজন এবং পরিচালনা করবে। তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের প্রথমটি অনুষ্ঠিত হবে ২৯ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ানায়। বাকি দু’টি হবে সেখানেই অক্টোবরে। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে উটাহে ৭ অক্টোবর।
সাধারণ নির্বাচনে কিভাবে বিজয়ী হন একজন প্রার্থী? পপুলার ভোট-প্রত্যেক প্রার্থী ভোটারদের যে ভোটগুলো পান- তার সাথে ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের জয়ী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সরাসরি ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হন না। বরং তিনি নির্বাচিত হন একদল কর্মকর্তাদের ভোটে, যাদের বলা হয় ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত এবং রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় আইনের এক জটিল ব্যবস্থা।
থিওরি বা তত্ত্ব অনুযায়ী, ইলেকটোরাল কলেজ সেই প্রার্থীকে বাছাই করে নেন, যিনি সর্বাধিক ভোট পান। কিন্তু সব সময়েই সেটা হয় না। যে প্রার্থী ৫৩৮টি ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে ২৭০টি ভোট পান, তিনিই হোয়াইট হাউজের দৌড়ে বিজয়ী হন। এর ফলে প্রার্থীদের কাছে কিছু কিছু রাজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ যেসব স্টেটে জনসংখ্যা বেশি, সেসব স্টেটে ইলেকটোরাল ভোটও বেশি থাকে। ফলে কোনো প্রার্থীর পক্ষে সাধারণ ভোটারদের বেশি ভোট পাওয়ার পরও ইলেকটোরাল ভোট কম পাওয়ায় হারতে হতে পারে। যেটা ঘটেছে ২০০০ সালে আল গোরের ক্ষেত্রে এবং ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের ক্ষেত্রে।
দোদুল্যমান, লাল এবং নীল স্টেট কী? রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত স্টেট যেমন আইডাহো, আলাস্কা এবং দক্ষিণের অনেক রাজ্যকে বলা হয় ‘রেড স্টেট’ বা ‘লাল রাজ্য’। ডেমোক্র্যাট প্রাধান্য পাওয়া স্টেটগুলো যেমন ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় এবং উত্তর-পূর্ব এলাকার স্টেটগুলোকে বলা হয় ‘ব্লু স্টেট’ বা নীল রাজ্য। সুইং স্টেট বা দোদুল্যমান স্টেট হচ্ছে সেসব রাজ্য যেগুলো প্রার্থীদের কারণে ভোট এদিকে বা ওদিকে যেতে পারে। যেসব রাজ্যে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়, অনেক সময় সেসব রাজ্যে প্রচারণা বিনিয়োগ বা প্রার্থীদের পাঠানো হয় না। ফলে ওহাইয়ো বা ফ্লোরিডার মতো দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতেই মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ২০২০ সালের এ রকম দোদুল্যমান স্টেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে অ্যারিজোনা, পেনসিলভানিয়া এবং উইসকনসিন স্টেটকে।
ভোটাররা কতক্ষণ ভোট দিতে পারেন? অন্য আরো অনেক বিষয়ের মতো যুক্তরাষ্ট্রে এটিও নির্ভর করে স্টেটগুলোর ওপর। বেশির ভাগ স্টেটে আগাম ভোটের সুযোগ দেয়া হয়। যার ফলে তালিকাভুক্ত ভোটাররা নির্বাচন দিনের আগেই তাদের ভোট দিতে পারেন। সেখানে ডাকযোগে ভোট দেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। যারা অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা, ভ্রমণ ও স্টেটের বাইরে পড়াশোনার কারণে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না, তাদের জন্য ডাকযোগে ভোট দেয়ার সুযোগ রয়েছে। যারা নির্বাচনের দিন ভোট দিতে যাবেন, তাদের সশরীরে ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়ে ভোট দিতে হবে। প্রতিটি স্টেট তাদের ভোট গণনার কাজ করে এবং সাধারণত সেই রাতেই বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়ে থাকে।
ইলেকটোরাল ভোটে যদি কেউ বিজয়ী না হন, তাহলে কী হবে? যদি কোনো একক প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ ইলেকটোরাল ভোট না পান, তাহলে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা শীর্ষ তিন প্রার্থীর ভেতর থেকে একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাছাই করবেন। বাকি দু’জন প্রার্থীর ভেতর থেকে একজনকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাছাই করবে সিনেট। যদিও এ রকম ঘটনা বিরল, তবে একবার এটি ঘটেছিল। ১৮২৪ সালে এভাবেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন কুইনসি অ্যাডামস। বিজয়ী ঘোষণার পরে কী ঘটে? নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্ত রূপান্তরকালীন সময় কাটে, যখন নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বাছাই করেন এবং পরিকল্পনা তৈরি করেন। জানুয়ারি মাসে নতুন প্রেসিডেন্ট (অথবা পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট) অভিষেক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শপথগ্রহণ করেন। হ


আরো সংবাদ