০৬ এপ্রিল ২০২০

ইদলিব নিয়ে যুদ্ধের মুখে তুরস্ক-রাশিয়া

-

সিরিয়ার ইদলিবে রুশ সমর্থিত সিরিয়ার সরকারি বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে ৩৪ জন তুর্কি সেনাকে হত্যা করার পর তুরস্কের পাল্টা হামলায় বাশার আল আসাদের অনুগত সিরীয় বাহিনীর বহু সেনা নিহত হয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের দাবি অনুযায়ী, সিরিয়ার দুই হাজার এক শ’রও বেশি সেনা নিহত হয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় আসাদ বাহিনী বিরোধীদের হাত থেকে ইদলিবের নিয়ন্ত্রণ নিতে কিছুদিন ধরে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তুর্কি সেনাদের ওপর হামলা তারই নজির। ইদলিবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই সিরীয় প্রদেশটিতে উত্তেজনা এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে।
২৭ ফেব্রুয়ারির হামলায় বহু তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পর ওই দিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান দীর্ঘ ছয় ঘণ্টাব্যাপী দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে এক জরুরি সভায় মিলিত হন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) নেতা কেমাল কিলিক দারোগ্লুও তার দলের সদর দফতরে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। সিরিয়ার হামলার পর আঙ্কারা পূর্ণ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ হামলার ঘটনাকে ‘২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বরের’ চেয়েও খারাপ বলে বর্ণনা করেছেন। ওই সময়ে তুর্কি সেনারা সিরিয়ায় ক্রেমলিনের সামরিক অভিযানের সাথে সম্পৃক্ত থাকা একটি রুশ জঙ্গি বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করেছিল। তখন আঙ্কারা বলেছিল, তারা আইনসঙ্গত কাজ করেছেÑ কারণ, রুশ বিমানটি তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। মস্কো ওই দাবি নাকচ করে দিলে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়।
আঙ্কারা এখন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে মস্কোর সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসতানা শান্তিপ্রক্রিয়া, এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আক্কু নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ইদলিব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও যৌথ প্রকল্পগুলো চলমান রয়েছে।
২০১৮ সালের শেষের দিকে আসতানায় ইদলিবে নো ফ্লাই জোন কার্যকর করার ব্যাপারে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল, পরবর্তীতে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং এলাকাটি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এমনকি পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হয়ে এলেও মস্কো ও আঙ্কারার সম্পর্ক যে ফাটল ধরেছে তা বজায় রয়েছে।
তুরস্কের প্রধান লক্ষ্য হলো সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটির ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক করা। ইদলিবের ব্যাপারে আঙ্কারার উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রধান দুটি কারণ হলোÑ প্রথমত, শরণার্থী সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেলে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্রনীতি ভেঙে পড়তে পারে। দেশটিতে ইতোমধ্যেই প্রায় ৪০ লাখ সিরীয় শরণার্থী বসবাস করছে। দ্বিতীয়ত, তুরস্ক ইদলিব ত্যাগ করলে তুরস্কের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত বিপন্ন হয়ে পড়বে। অথচ এ সীমান্ত অঞ্চলটি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করতে তুরস্ক তিনটি আন্তঃসীমান্ত অভিযানÑ ইউফ্রেটিস শিল্ড, ওলিভ ব্রাঞ্চ এবং পিচ স্প্র্রিং পরিচালনা করে। সেখান থেকে তুরস্ক সেনা প্রত্যাহার করলে সন্ত্রাসীরা পুনরায় তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
এরদোগান সিরীয় বাহিনীকে সোচি চুক্তি অনুযায়ী, নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা চুক্তি অমান্য করেছে এবং ফিরে যায়নি। এতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। ইদলিবে রাশিয়ার সমর্থনে সিরীয় বাহিনী হামলা জোরদার করলে আঙ্কারা সিরীয় শরণার্থীদের স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপ যেতে আর বাধা দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ইদলিব প্রশ্নে আলোচনার জন্য রাশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল আঙ্কারায় আলোচনা বৈঠকে থাকা অবস্থায়ই ইদলিবে বাশার আল আসাদের সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালায়। রুশ সমর্থিত সিরীয় বাহিনীর অভিযানের মুখে মানবিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এই অভিযানে ১০ লাখ বেসামরিক লোক বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। ইতোমধ্যেই সিরিয়া ছেড়ে ৩৬ লাখ শরণার্থী তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। সর্বশেষ সঙ্ঘাতের কারণে তুরস্কের স্থলসীমান্ত দিয়ে শরণার্থীরা ইউরোপের দিকে পাড়ি দিচ্ছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, যুদ্ধের ফলে সিরিয়া থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আর সামলাতে পারবে না তার দেশ।
সিরীয় বাহিনীর হামলায় ৩৩ তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পর আঙ্কারার পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা ন্যাটো মিত্র তুরস্কের পাশে আছি। ন্যাটো মহাসচিব জেন্স স্টলটেনবার্গ সিরিয়ার সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও বাশার বাহিনীর অভিযান থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইদলিব পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সেখানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
ইদলিবে তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পর তুরস্কও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। পাল্টা হামলায় আসাদ বাহিনীর কয়েকটি বিমান ভূপাতিত করা ছাড়াও তুরস্কের ড্রোন হামলায় আসাদ বাহিনীর তিন জেনারেলসহ ২৬ সেনা নিহত হয়ছে। এ ছাড়া ইরান সমর্থিত ২১ ব্যক্তি নিহত হয়েছে। সিরিয়ায় তুর্কি সেনাদের সাথে রুশ সেনাদের সঙ্ঘাত এড়িয়ে চলার আহ্বান সত্ত্বে¡ও রাশিয়া আসাদ বাহিনীকে পূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি তুরস্ক-রাশিয়া শিগগিরই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে? সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত নিয়ে আলোচনার জন্য আজ বৃহস্পতিবার এরদোগানের রাশিয়া সফর করার কথা। এরদোগান সেখানে পুতিনের সাথে বৈঠক করবেন। দুই প্রেসিডেন্ট আলোচনা করে কি যুদ্ধ এড়াতে পারবেন? নাকি তুরস্ক-রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। হ

 


আরো সংবাদ