১০ এপ্রিল ২০২০

ট্রাম্পের ‘শান্তি পরিকল্পনা’ মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অশনিসঙ্কেত

-

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত তার বহুদিনের লালিত তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এটাকে তিনি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ নামেও অভিহিত করেছেন। এই পরিকল্পনায় পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র এবং ওল্ড সিটিসহ জেরুসালেমকে ইসরাইলের অবিভক্ত রাজধানী করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ঘোষণায় ইসরাইলকে সব বসতি দখল করে নেয়ার এবং সাথে সাথে জর্দান উপত্যকাও দখলে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, জর্দান উপত্যকা হলো জর্দানের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তসহ পশ্চিমতীরের একটি বড় অংশ। ট্রাম্প এভাবে চতুর্দিকে ইসরাইলি ভূখণ্ডের নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি ফিলিস্তিনি দ্বীপরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। যেখানে ফিলিস্তিনিদের কোনো স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব থাকবে না। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র সব ভূখণ্ডের ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে। তথাকথিত এই পরিকল্পনা প্রকাশ করার কিছুক্ষণ পরই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সব বসতি এবং জর্দান উপত্যকা দখল করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। ইসরাইলের ডানপন্থী দলগুলোর সদস্যরা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধীরা এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনার বাস্তবে অবসানের জন্য এই পরিকল্পনা প্রকাশে উল্লাস প্রকাশ করেন। একই কারণে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সমর্থকরা এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে নিন্দা জানান এবং এটাকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কফিনে শেষ পেরেক বলে অভিহিত করেন।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও আরব লিগ ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত আরব লিগের বৈঠকে মাহমুদ আব্বাস তথাকথিত শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সাথে ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক বাতিলের হুমকি দিয়েছেন। বৈঠকে মাহমুদ আব্বাস বলেন, এই পরিকল্পনার পর তিনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেন যে, নিরাপত্তা সম্পর্কসহ তাদের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকবে না। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ট্রাম্পের এই চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম, জর্দান উপত্যকার দখলদারিত্ব ও অবৈধ বসতি স্থাপনে ইসরাইলকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। ইসরাইলি স্বার্থ সুরক্ষায় হোয়াইট হাউজ এই চুক্তি প্রকাশ করেছে। মাহমুদ আব্বাস বলেন, ইসরাইলের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনায় আমেরিকাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেবে না ফিলিস্তিনিরা। আরব লিগের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আবদুল ঘেইত বলেন, এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের বৈদেশিক নীতির তীব্র পরিবর্তন প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে কোনো শান্তি বা সমাধান আসতে পারে না। মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, ‘জেরুসালেম বিক্রির জন্য নয়। তিনি বলেন, জেরুসালেম ছাড়া ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কোনো ফিলিস্তিনি, আরব মুসলমান খ্রিষ্টান সন্তান এটা মেনে নেবে না। আমরা শুরু থেকেই এই চুক্তি নাকচ করে আসছি। ফিলিস্তিনিরা ইতোমধ্যেই তথাকথিত এই পরিকল্পনাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা পশ্চিম তীরের নাবলুস, গাজাসহ বিভিন্ন শহরে ইতোমধ্যেই এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। গাজার ক্ষমতায় থাকা হামাসের কর্মকর্তা সামি আবু জুহরি বলেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা আগ্রাসন ও ষড়যন্ত্র। ফিলিস্তিনিরা এই চুক্তিকে প্রতিহত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বশংবদ কয়েকটি আরব দেশ এটাকে স্বাগত জানালেও ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। একই সাথে ফিলিস্তিনের ভূমিকে ইসরাইলের অধিভুক্ত করা ঠেকাতে জাতিসঙ্ঘকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গত ৩০ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে কার্টার এই আহ্বান জানান। কার্টার বলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলিদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা হ্রাস করেছে নতুন পরিকল্পনা।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭৮ সালে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি’ নামে ঐতিহাসিক চুক্তির প্রধান রূপকার ছিলেন জিমি কার্টার। ওই চুক্তির জন্য কার্টার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ৯৫ বছর বয়সী কার্টার বলেছেন, দীর্ঘদিনের এ সঙ্ঘাত অবসানের গ্রহণযোগ্য সমাধান হলো দুটি রাষ্ট্র গঠন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত অবসানের প্রচেষ্টা পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে যাবে। তিনি বিবৃতিতে বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা আত্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ, জোর করে ভূমি অধিগ্রহণ এবং দখলকৃত অঞ্চলগুলো সংযুক্ত করা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে হাস্যকর ভূমিকায় নিয়ে গেছেন। ট্রাম্পের ইহুদি জামাতাকে কথিত শান্তি পরিকল্পনার দায়িত্ব দিয়ে তিন বছর আগে থেকেই যে প্রয়াস তিনি শুরু করেছিলেনÑ নেতানিয়াহুকে সাথে নিয়ে হোয়াইট হাউজে তিনি সেই ইহুদি নাটকটিই মঞ্চায়ন করলেন। সুতরাং এই একপেশে পক্ষপাতদুষ্ট পরিকল্পনা আর যাই হোকÑ কোনো শান্তি পরিকল্পনা নয়। শান্তি পরিকল্পনা সঙ্ঘাতের দুই পক্ষকে নিয়েই তাদের সাথে আলোচনাও বিতর্কের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় শুধু উপস্থিত একপক্ষ ইসরাইল। সেখানে ফিলিস্তিন নেই। ট্রাম্প জেরুসালেমকে আগেই ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তর করেছেন। কিন্তু প্রায় গোটা বিশ্বই তার প্রতিবাদ করেছে। ইসরাইলে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনেই নেতানিয়াহু পরাজিত হয়েছেন। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। আদালতে তার বিচার চলছে। আর ট্রাম্প নিজেও ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি। ভবিষ্যতে ইসরাইল ও আমেরিকায় নির্বাচন আসন্ন। সেই নির্বাচনে দু’জনই জয়ী হতে চান। আর নির্বাচনে জেতার জন্যই ইহুদিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে মোক্ষম দাওয়াই।
ট্রাম্পের পক্ষপাতদুষ্ট কথিত শান্তি পরিকল্পনা একটি প্রতারণা ও ধাপ্পাবাজি। ফিলিস্তিনিরা জেরুসালেমকে নিজেদের রাজধানী বলে গত ৭০ বছর ধরেই দাবি করে আসছেনÑ আন্তর্জাতিক বিশ্ব ও জাতিসঙ্ঘের কাছে এতদিন সেটাই বৈধতা পেয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র গত পাঁচ দশক ধরে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারিত্বকে অবৈধ বলে এসেছে। এখন হঠাৎ সেখানে ইসরাইলি সার্বভৌমত্বের কথা বলছে। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অবৈধ বসতির বিরোধিতা করেছে। ট্রাম্প এখন সেগুলোকে বৈধতা দিচ্ছেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা ঘোষণার পর নেতানিয়াহু বলেছেনÑ হোয়াইট হাউজে ইসরাইলের জন্য আপনার মতো এমন বন্ধু আর আসেনি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্টার ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে সত্য কথাটাই উচ্চারণ করেছেন। তিনি এই একপক্ষীয় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন মুসলিম বিশ্ব, আরব লিগ, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ জাতিসঙ্ঘকে ট্রাম্পের অন্যায় পরিকল্পনা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে।


আরো সংবাদ