১০ এপ্রিল ২০২০

শাহিনবাগ : ভারতীয় মুসলমানদের নতুন দিশা

-

আপনি যখন ইভিএমের বোতামে চাপ দেবেন, তখন সেটি এমন জোরে চাপ দেবেন যাতে বিদ্যুৎ শাহিনবাগেও অনুভূত হয়। কথাটি বলেছিলেন অমিত শাহ, দিল্লি নির্বাচনের আগ দিয়ে বিজেপির এক নির্বাচনী প্রচারণায়। ‘হাজার হাজার শাহিনবাগ প্রতিরোধ করুন’Ñ ছিল তার বার্তা। তারপর আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রাসাদ শাহিনবাগ বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে অভিযুক্ত করার জন্য এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে, শাহিনবাগ এখন আর স্র্রেফ কোনো স্থানের নাম নয় বা বিক্ষোভের স্থানীয় এলাকা নয়। এটি ইতোমধ্যেই মিসরের তাহরির স্কয়ার, তুরস্কের তাকসিম স্কয়ার ও নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের মতো বিশ্বপর্যায়ে উচ্চারিত হচ্ছে। প্রতিটি রাত অতিবাহিত করা মানে ভারতের ভিন্ন কোনো না কোনো স্থানে আরেকটি এমন ভেনু তৈরি হয়। কলকাতার পার্ক সার্কাস, লক্ষেèৗর ঘণ্টা ঘর, বেঙ্গালুরুর মসজিদ রোডে শাহিনবাগ তৈরি হয়ে গেছে।
একটি প্লাকার্ডে লেখা রয়েছে : ‘তোমরা ভাগ করেছ, আমরা গুণ করেছি।’
একটি নীরব সম্প্রদায় কথা বলছে
শাহিনবাগ বা অন্য যেকোনো স্থানে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের বিরুদ্ধে যেখানেই অবস্থান ধর্মঘট হোক না কেন, এটা পরিষ্কার যে, এগুলো সাধারণ প্রতিবাদস্থল নয়। এখানে রাজনৈতিক কোনো বক্তৃতা শুনে লোকজন সরে পড়ে না, তারা স্রেফ রাস্তায় চলতে থাকে। দিনের যেকোনো সময় শাহিনবাগ হয় প্রাণবন্ত। শিশুরা বসে থাকে তাদের মায়েদের পাশে, দাদীরা বসেন মঞ্চে, বাসা থেকে খাবার আসে, ছবি আঁকা হয়, গান গাওয়া হয়।
দানবের মতো মনে হওয়া সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে অগ্রাহ্য করে বিক্ষোভকারীরা শাহিনবাগকে পরিণত করেছেন ভীতিহীন আর দৃঢ়সঙ্কল্পের স্থানে। সর্বোপরি, বিপ্লব হলো জনগণের শক্তির উৎসব।
অনেক হতাশাবাদী জানতে চাইতে পারেন, বিক্ষোভকারীরা কী অর্জন করেছে, তারা কি নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহের পরিকল্পনা বদলাতে পারবে? স্বাধীনতার পর থেকে প্রথমবারের মতো ভারতের মুসলিমরা একটি ভাষা পেয়েছে, তাদের বেদনা, তাদের আকাক্সক্ষা প্রকাশের জন্য নতুন রাজনীতির ব্যাকরণ দেখতে পেয়েছে। মোদির শাসনের গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো (যারা পিটিয়ে হত্যার পরও কিছু বলত না, যারা অন্যায় অযোধ্যা রায়ের পরও নীরব থেকেছে, যারা ভয় আর হতাশায় মুষড়ে পড়েছিল) তারা কথা বলতে শুরু করেছে। একটি নীরব সম্প্রদায় নিজের জন্য কথা বলছে। এসব অবস্থান ধর্মঘটে মুসলিম তরুণ ও নারীরা ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে’ অধ্যায়নরত গড়পড়তা ভারতীয়দের চেয়ে এখন অনেক বেশি সচেতন, অনেক বেশি হালনাগাদ, অনেক বেশি অবগত, অনেক বেশি সমালোচক, অনেক বেশি আত্মসচেতন। আমার কাছে আমাদের এই সম্মিলিত লড়াই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
আমাদের নীরবতা কি সহায়ক হয়েছিল?
অনেক অনেক দিন ধরে মুসলিমরা নীরব ভোটব্যাংকে নেমে এসেছিল। তাদের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল পেছনে থেকে অন্যদের তাদের হয়ে কথা বলার সুযোগ দিতে। এই অন্যরা ছিল স্বঘোষিত সেক্যুলারবাদী, উদার ও এমনকি বর্ণবাদবিরোধী যোদ্ধা। তাদের অনেকে সম্প্রদায়টির সত্যিকারের কল্যাণকামী হলেও বাকিরা তাদের আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইত মুসলিম ভোট হাসিলের মাধ্যমে। তারা বলত, মুসলিমদের নীরব থাকা উচিত নয়তো শেষে হিন্দুত্ববাদীরা সমাজকে মেরুকরণ করে ফেলবে। আমরা কয়েক দশক ধরে তাদের কথাই শুনছিলাম।
এই কৌশলে মুসলিম বা ভারতের জন্য কী অর্জন হয়েছে? তাদের নীরবতা কি ভারতের মেরুকরণ ঠেকাতে পেরেছিল? ফ্যাসিবাদের উত্থান কি ঠেকানো গেছে? এটি কি সেক্যুলারবাদকে রক্ষা করতে পেরেছিল? মুসলিমদের সঙ্ঘ ত্যাগ করে কি বিজেপির ভোটে ভাগ বসানো গেছে? রাজনৈতিক নিরাপত্তা তো দূরের কথা, সামাজিক বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
অন্য যেকোনো সম্প্র্রদায়ের (এসসি, এসটি বা ওবিসি) তুলনায় মুসলিমদের মধ্যে সাক্ষরতার হার সর্বোচ্চ। কিন্তু উচ্চতর শিক্ষায় তাদের ভর্তি সর্বনি¤œ, এমনকি অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের তুলনায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর এতে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সাচার কমিটি, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিটি ও অমিতাভ কান্দু কমিটি ভারতের সবচেয়ে বড় এই সম্প্রদায়ের বঞ্চনার কাহিনী জানিয়েছে। সরকারি চাকরি, পুলিশ, সেনাবাহিনী, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তাদের চাকরির হার অনুপাতের তুলনায় অনেক কম। একটি জায়গায় তারা তাদের অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি হারে আছে। সেটা হলো জেলখানায়।
তাহলে আমাদের নীরবতায় কী হয়েছে?
বর্তমানে সিএএ প্রতিবাদের মাধ্যমে মুসলিমরা কেবল কথাই বলছে না, তারা ইতিহাসও নতুন করে লিখছে। মূলধারার রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিপরীতে মুসলিমরা কোনো ভোট ব্লক বা কোনো প্রাধান্য সৃষ্টিকারী সম্প্রদায় নয়। তবে এসব প্রতিবাদের মাধ্যমে অনেক সুপ্ত আবেগ (বা জোর করে চেপে রাখা আবেগ) মুসলিম সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তুলেছে। ফলে এই সম্প্রদায়ের ‘প্রতিনিধিত্ব করার দাবিকারী’ যারা মূল কেন্দ্র দখল করেছিলেন, তারা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে। আর কাদের মাধ্যমে? ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক মুসলিমদের মাধ্যমে, তারা হলো নারী ও তরুণরা।
যারা গৎবাধা বক্তব্য দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে মুসলিমদের তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করতে চাইছিল বা করে আসছিল, ওইসব লোক ও দলের জন্য এটা একটা তরঙ্গ। সিস্টেম ও ঐতিহ্যবাহী মুখপাত্রদের মধ্যকার প্রতীকী সম্পর্ক নড়ে গেছে। মুসলিম রাজনীতির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়েছে।
অযোধ্য রায়ের পর এক সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্লেষ মেশানো এক লেখায় অযোধ্যার চূড়ান্ত রায়ের জন্য মুসলিমরা কিভাবে দায়ী তা জানিয়েছিলেন। জাভেদ আনন্দের মতে, শাহ বান রায়ের প্রতিবাদ করে এবং সেটি বাতিল করতে পেরে মুসলিমরা আসলে হিন্দু উগ্রপন্থীদের অ্যাজেন্ডাকেই সহায়তা করেছিলেন। তিনি মুসলিমদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে নসিহত করলেও রাজীব গান্ধী সরকারের প্রতি একটি বাক্যও প্রয়োগ করেননি। উল্লেখ্য, এতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসোনাল ল’ বোর্ডকে ভারতের মুসলিমদের ‘একমাত্র প্রতিনিধি’ করেছিল। এআইএমপিএলবি কি কংগ্রেস সরকারকে উৎখাত করবে বা চ্যালেঞ্জ করবে? প্রশ্নই ওঠে না। তবে কংগ্রেস সরকার এখনো সেটাই করে যাচ্ছে, কারণ তার মুসলিমদের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
মুসলিম রাজনীতির ইতিহাস এমন উদাহরণে ভর্তি, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়কে সেক্যুলার দলগুলো মারপ্যাঁচ কষে নীরব করে দিয়েছে। তবে আমরা আর কারো হাতে ব্ল্যাকমেইল হবো না।
হ্যাঁ, আমরা সেক্যুলার। তবে সেক্যুলারবাদের জন্য আমাদের লড়াই মূল বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। আমরা মুসলিমরা যে অপর্যাপ্ততা ও সাংঘর্ষিকতার অস্পষ্টতার কাঠামোতে আবদ্ধ রয়েছি, তার মধ্যে থেকে লড়াই করব না। আমরা সিএএ-এনআরসি-এনপিআরের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। আমরা কেবল সেক্যুলারবাদের সুরক্ষার জন্যই লড়াই করছি না, আমরা সামাজিক ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে চাই। আর আমরা আমাদের নাগরিকত্ব সুরক্ষিত করেই থেমে যাব না। মুসলিম হওয়ার অধিকার আমাদের আছে এবং আমরা এখনো ভারতের সমান নাগরিক।
এই মুহূর্তটি কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের মতো। আমরা একটি সম্ভাবনার তীক্ষè প্রান্তভাগ। সম্ভাবনা আবারো সমান হচ্ছে।
লেখক : অ্যাক্টিভিস্ট ও সাবেক জেএনইউর ছাত্র
দ্য প্রিন্ট থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 


আরো সংবাদ