২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

লেজার লাইটের উৎপাতে শাহজালালে বিমান অবতরণে ঝুঁকি

রাতে বিমান অবতরণের সময় লেজার লাইটের উৎপাত যাত্রীদের চোখেই ধরা পড়ে। ছবিটি ঢাকার বিমানবন্দরে বিমান অবতরণের আগে তোলা। - ছবি : বিবিসি

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাতে উড়োজাহাজ অবতরণের ক্ষেত্রে লেজার লাইটের উৎপাতে বিমান অবতরণ ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিমান অবতরণের সময় সেটিকে লক্ষ্য করে লেজার রশ্মি নিক্ষেপের ঘটনা গত কয়েক বছর ধরেই চলছে এবং এটি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

একাধিক পাইলটের সাথে কথা বলে জানা গেল, অবতরণকারী বিমানকে লক্ষ্য করে লেজার লাইটের উৎপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে।

পাইলটরা বলছেন, ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম এবং সৈয়দপুরেও বিমান অবতরণের সময় প্রায়ই লেজার লাইট মারা হয়।

পাইলট আবদুল্লা আল ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যখন আমি বিমান ল্যান্ড করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন যদি লেজার লাইট এসে আমার চোখে পড়ে আমি কিছুক্ষণের জন্য অলমোস্ট ব্ল্যাংক হয়ে যাই।’

বিভিন্ন দেশী-বিদেশী বিমান সংস্থা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বারবার অভিযোগ দিয়েছে। এদের মধ্যে সাউদিয়া এবং কাতার এয়ারওয়েজও রয়েছে বলে জানা গেছে।

পাইলটরা বলছেন, বিমান উড্ডয়নের সময় লেজার লাইটের আলো তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। বিমান অবতরণের সময় এটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।

‘বেশিরভাগ অ্যাকসিডেন্ট দেখবেন ল্যান্ডিংয়ের সময় হয়। ল্যান্ডিংয়ের সময় খুব প্রিসিশন (সুনির্দিষ্টভাবে) মনিটর করতে হয়।’

রাতে অবতরণের সময় রানওয়ের আলো দেখা পাইলটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অবতরণের সময় বিমান যখন এক হাজার ফুটের মধ্যে নেমে আসে তখন লেজার লাইট এলে সেটিকে বুলেট শুট করার মতো মনে হয় পাইলটদের কাছে।

‘আপনি যখন গাড়ি চালান, তখন যদি গাড়ির ভেতরে লাইট জ্বলে তাহলে আপনি গাড়ি চালাতে পারবেন না। গাড়ির ভেতরে আলো নিভিয়ে আপনাকে গাড়ি চালাতে হবে,’ বলেন পাইলট ফারুক।

বিমান অবতরণের সময়ও বিষয়টি একই রকম। ভেতরের আলো নিভিয়ে দেয়া হয়, যাতে সামনে সবকিছু দেখা যায়।

‘যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমি কমপ্লেইন করতে করতে (লিখিত, ভারবাল) ফেড-আপ।’

পাইলটরা বলছেন, কেউ এটাকে তেমন একটা নজর দিচ্ছে না।

বিমানকে লক্ষ্য করে লেজার লাইট মারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হয়। লেজার লাইটের কবলে পড়ে বিমান জরুরি অবতরণ করানোর ঘটনাও ঘটেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিমান লক্ষ্য করে লেজার মারা শাস্তিযোগ্য বিষয়। আমেরিকার ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব মতে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশটিতে বিমান লক্ষ্য করে লেজার মারার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৩৫ হাজার।

ফেডারেল এভিয়েশন বলছে, বিমান চলাচলের জন্য লেজার একটি ভয়াবহ হুমকি। এজন্য সেখানে পাঁচ বছরের জেল এবং আড়াই লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন লেজার যদি পাইলটের চোখে গিয়ে পড়ে তাহলে তিনি সাথে সাথে দৃষ্টিহীন হয়ে যেতে পারেন।

লেজারের বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। সুপার মার্কেটে পণ্যের বারকোড পড়া দিয়ে তার শুরু।

লেজার রশ্মি দিয়ে ডাক্তাররা অস্ত্রোপচার করেন। এই রশ্মি দিয়ে নানা বস্তু কেটে ফেলা যায়।

সেনাবাহিনী কোনো টার্গেট নির্ধারণে লেজার ব্যবহার করে। আবার বিনোদনেও এর ব্যবহার রয়েছে, যেমন ধরুন লেজার লাইট শো। অনেকে লেজার তাক করে মজা করলেও হঠাৎ চোখে এসে পড়লে তা যন্ত্রণার কারণও হতে পারে।

কী করছে কর্তৃপক্ষ?
লেজার লাইট নিয়ে পাইলটদের অভিযোগ জমা পড়ছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা মো: সোহেল কামরুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিষয়টি মোকাবেলার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে।

এছাড়া এনিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে বলে জানান কামরুজ্জামান।

সচেতনতার অংশ হিসেবে এখন মোবাইল ব্যবহারকারীদের কাছে এসএমএস পাঠানো হচ্ছে।

এসএমএসে বলা হয়েছে, ‘উড্ডয়নরত বিমানের দিকে লেজার নিক্ষেপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকার জন্য সকলকে অনুরোধ করা হচ্ছে।’

তবে এধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য এখনো কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি শাহ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিবিসি বাংলাকে বলেন, লেজার লাইটের তৎপরতা বিষয়ে তারা অভিযোগ পেয়েছেন, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কাউকে হাতেনাতে ধরা সম্ভব হয়নি।

‘বিভিন্ন সময় বাড়ির ছাদ থেকে এসব লেজার লাইট মারা যায়। আমাদের মোবাইল টিম তৎপর আছে তাদের ধরার জন্য,’ বলেন ওসি আখতারুজ্জামান।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ


premium cement