২৯ অক্টোবর ২০২০

লুট হচ্ছে গ্যাস বিপাকে গ্রাহকরা


রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় অবাধে লুট হচ্ছে গ্যাস। তিতাসের মেইন লাইন ও সাবলাইন থেকে কতিপয় ঠিকাদার সিন্ডিকেট এককালীন ও মাসিক টাকার চুক্তিতে গ্রাহকদের সাথে আঁতাত করে এসব করছে। বছরের পর বছর ধরে এসব সংযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। যখন কোনো ঘটনা ঘটে তখনই কেবল তাদের টনক নড়ে।

সূত্র জানায়, তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাস সরবরাহের মেইন লাইন থেকে রাজধানীর শ্যামলী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কয়েকটি হোটেল, মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান হাউজিংয়ের সি ব্লকের আংশিক থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত, চাঁদ উদ্যান হাউজিং, আবাসিক হাউজিং, শাহজালাল হাউজিং, আরাম হাউজিং, চন্দ্রিমা হাউজিং, ফিউচার হাউজিং, মেট্রো হাউজিং, বসিলা মডেল টাউন ও বসিলা ব্রিজের গোড়ায় চেক পোস্টের দক্ষিণ পাশের ১৮টি বাড়িতে হাজার হাজার ফুট অবৈধ গ্যাসলাইন নির্মাণ করে প্রতি বাড়িতে লাখ থেকে দেড় লাখ টাকায় গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসে চুলা প্রতি ৫০০ টাকা হারে আদায় করা হচ্ছে।

গ্যাস লুটের নেপথ্যে একজন যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা উদ্যানের সাবেক বিডিআর সদস্য ওসমান, তিতাসের ঠিকাদার হুমায়ুন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোখলেছুর রহমান, তিতাস গ্যাস জোন-৫ এর টিম লিডার সেলিম ও একতা গৃহনির্মাণ হাউজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানেও এর বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছে বৈধ গ্রাহকরা। দিনে অন্তত ১৫-১৬ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ না থাকায় গৃহস্থলি কাজে চরম সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। কারখানাগুলো কম্প্রেশার মেশিনের সাহায্যে লাইনের গ্যাস টেনে নেয়ার অভিযোগ করেছেন অসংখ্য আবাসিক গ্রাহক।

এ দিকে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় শত শত বাড়িতে অবৈধ সংযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগ প্রদান করতে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানান একাধিক বাড়ির মালিক। বর্তমানে ওই চক্র প্রতিমাসে চুলা হারে মালিকদের কাছ থেকে বিল আদায় করছে বলে জানান তারা।

তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহের লাইনগুলো নিয়মিত তদারকি করা যাচ্ছে না। তাছাড়া কর্তৃপক্ষের দৃষ্টির বাইরে হাজার হাজার ফুট অবৈধ সংযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জানে না বলে জানান তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা।

ঠিকাদারদের অবৈধ কাজ রোধে ৩৯টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আবার ওই ব্যক্তিরা ভিন্ন নামে লাইসেন্স নিয়ে একই কাজ করছে। তিতাসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আর ঠিকাদার মিলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিস্তার করে চলছেন। এসব অসাধু ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েও তাদের অবৈধ তৎপরতা থামানো যাচ্ছে না বলে জানান তিতাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

থামানো যাচ্ছে না গ্যাস লুট চক্রদের। মাঠপর্যায়ে লোকবল না থাকায় ডোর টু ডোর গিয়ে অবৈধ সংযোগের খবর রাখা সম্ভব হয় না বলে জানান তারা। এ জন্য কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে জনগণকে আহ্বান জানানো হয়।

সূত্র আরো জানায়, কামরাঙ্গীর চর এলাকায় ঝাউল্লাহাটি চৌরাস্তা থেকে উত্তর দিকের গলিতে ৩ ইঞ্চি লাইন বসিয়ে ২৫টি বাড়িতে ও নার্সারির গলিতে অবৈধ গ্যাস চেম্বারের মাধ্যমে ৪টি কারখানা, নিউ সরদার এন্টারপ্রাইজের মালিক তারেক ঝাউচর গুদারাঘাট এলাকায় নিষিদ্ধ গ্যাস চেম্বারের মাধ্যমে কয়েকটি কারখানা, বাদশা মিয়া স্কুলের গলিতে লাল মিয়ার কারখানা, ঢাকা মেটাল, ইমন মেটাল, জাহিদ মেটাল, রাসেল মেটাল, মা মেটাল ও সোহাগ মেটাল।

কাজির ঘাট এলাকার হুমায়নের ভাট্টি, ওয়াজ উদ্দিন স্কুলের সমনের ভাট্টি ও ভিআইপি মেটালের মালিক শাহ্ আলম, নিউ সরদার এন্টারপ্রাইজের মালিক তারেক নবীনগর লোকমান এন্টারপ্রাইজ, হুজুর পাড়া মা মেটাল। খোলামোড়া আরেফেন সিয়াম, মাহতাব, সিরাজ মল্লিক, সোহরাব মল্লিক, পদ্মা স্টিলসহ র্যাক-ঢালাই ও নিকেল কারখানা ও নানা রকমের প্রায় দেড় শতাধিক কারখানা তিতাসের অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে চলে আসছে।
আর এসব কারখানা থেকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৫৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আদায় করছে বলে জানিয়েছেন অবৈধ গ্যাস চেম্বার ব্যবসায়ী মিলন ও অপর কয়েকজন ব্যবসায়ী। এলাকার র‌্যাক (রান্না ঘরের ছোট আলমারি) ব্যাবসায়ীরা একটি সমিতি করে তিতাসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজের দায়িত্ব নিয়েছে।

এই সমিতির নেতা হচ্ছেন মোজাম্মেল নামে একজন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিম ও ক্যাসিয়ারের দায়িত্বে আছেন তাহের ও তার ভাই। এরাই অবৈধ কারখানাগুলোর দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন।

স্থানীয় আহমেদ নামে এক ব্যক্তি জানান, গত বছর আমরা তিতাসের বরাবর প্রায় ৩০ জনের গণস্বাক্ষরকৃত একটি অভিযোগপত্র দেই। এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ তিতাস থেকে নেয়া হচ্ছে না। তিতাসের অভিযানকৃত গাড়ি প্রতিনিয়ত দেখা যায় কিন্তু কোনো কারখানায় গিয়ে অভিযান চালাতে দেখা যায় না।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোং লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী মোহাম্মদ আল মামুন নয়া দিগন্তকে বলেন, অবৈধ গ্যাসলাইনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। প্রতিদিন দু’টি করে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বেশ কয়েকজন ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এমনকি কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকেও হুঁশিয়ারি করা হয়েছে। তারপরেও যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যাবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।


আরো সংবাদ