১৩ জুলাই ২০২০

দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধিদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

তিন মাসে ১০০ বরখাস্ত
-

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে গত ২৫ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। করোনার প্রাদুর্ভাবে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষ অসহায় হয়ে পড়লে তাদের দুর্দশা লাঘবে সরকার চাল, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেয়। আর তখনই শুরু হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের লুটপাটের মহোৎসব। সাধারণ ছুটি শেষ হলেও তাদের লুটপাট থেমে নেই। দিন যত যাচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধিদের তালিকা ততই দীর্ঘ হচ্ছে।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নগদ অর্থসহায়তা, হতদরিদ্র জনসাধারণের জন্য বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাৎ এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে শুক্রবার পর্যন্ত ১০০ জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ৩০ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৬৪ জন ইউপি সদস্য, একজন জেলা পরিষদ সদস্য, চারজন পৌর কাউন্সিলর এবং একজন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান।

দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে এ পর্যন্ত সাময়িকভাবে বরখাস্তকৃত জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। ওই প্রজ্ঞাপনে বরখাস্ত হওয়া জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি ও অনিয়ম সরেজমিন তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, করোনার প্রাদুর্ভাবে দিন এনে দিন খেটে খাওয়া কর্মহীন শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষেরা অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করতে থাকে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় দিন এনে দিন খেটে খাওয়া গরিব মানুষেরা খাদ্য সঙ্কটে অসহায় হয়ে পড়ে। মানবেতর জীবন-যাপনকারী ওই সব মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্য সরকার বরাদ্দ দেয় ভিজিএফ, ভিজিডি এবং ওএমএসের চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। কিন্তু সেই গরিবের হকের ওপর হামলে পড়ে কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

৫০ লাখ গরিব ও দুস্থ পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত খোদ প্রধানমন্ত্রীর নগদ আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমেও কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা নয়-ছয় করায় দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

গত বুধবারও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ১১ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থসহায়তা কর্মসূচির সুবিধা ভোগীদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মেহারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: আলম মিয়া এবং সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য ফরিদা বেগমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এ ছাড়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনসাধারণের জন্য বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাৎ, উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য মনিরুল ইসলাম ও ৮ নং ওয়ার্ডের মো: আবুল কালাম, মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য কাঞ্চন মিয়া, ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার ৪ নং কুমারগাতা ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো: মফিজুল ইসলাম, ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য রইছ উদ্দিন, জয়পুরহাট জেলার সদর উপজেলাধীন বম্বু ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য পারভীন আক্তার ও ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো: লোকমান হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য মুসলেমা বেগম এবং নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার চরকিং ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো: ইকবালকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এর আগে গত ১২ এপ্রিল তিনজন জনপ্রতিনিধিকে বহিষ্কার করে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। তারপরও চাল চুরিসহ নানা অভিযোগে গত ১৫ এপ্রিল ৯ জন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার, গত ১৯ এপ্রিল ১২ জন, গত ২৯ এপ্রিল একজন ইউপি চেয়ারম্যান ও তিন ইউপি সদস্য, গত ৩০ এপ্রিল ৩ জন, গত ৭ মে ৩ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। এ কারণে জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাও নেই। আমাদের দেশে বিচারের আইনি প্রক্রিয়াটা খুব শ্লথ। যারা এগুলো করছে তাদের এখনো পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। যদি অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে সবার মনে একটি ভয় তৈরি হতো। তখন এভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ত না।

তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দিকটাও এখানে পরিলক্ষিত হয়। এগুলো যারা করছে তারা মনে করে তাদের তো বস আছে। ফলে তারা ধরেই নিয়েছে, যা কিছু করুক না কেন তাদের কোনো বিচার হবে না। ড. রেহমান বলেন, দেশের এই সঙ্কটের মধ্যে চাল চুরি, গম চুরি এটা খুবই অপরাধ। গুরুত্বর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের এই পরিস্থিতিতে গরীবের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি চাল আত্মসাতের ঘটনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা দায়ী হলেও সরকারও কম দায়ী নয়। কারণ জনপ্রতিনিধি হতে এখন তো নির্বাচন লাগে না। সরকারি সিদ্ধান্তে হয়। আর ভালো মানুষ বাদ দিয়ে খারাপ মানুষকে সিলেকশন করা হয়। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়া হয়। দল যাকে মনোনয়ন দেবে সেই চেয়ারম্যান। আর চেয়ারম্যান হতে তো নির্বাচন লাগে না। ফলে জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতাও নেই। এভাবে ইউনিয়ন পরিষদকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।


আরো সংবাদ