০১ এপ্রিল ২০২০

জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আসছেন বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতানেত্রী

পাপিয়া - সংগৃহীত

পাপিয়া কেলেঙ্কারিতে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আসছেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতানেত্রী। যাদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়া। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে যাদের নাম উঠে এসেছে, যাদের ইন্ধনে অন্ধকার জগতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলে পাপিয়া কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা, তাদেরও পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ ছাড়াও পাপিয়ার আয়ের উৎস ও আধিপত্য বিস্তারে কে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন। তিনি বলেন, পাপিয়ার বিরুদ্ধে র্যাব তিনটি মামলা করেছে। ওই সব মামলায় পাপিয়া এখন ১৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। বুধবার রাতে মামলাগুলো ডিবিতে হস্তান্তর হয়েছে। এখনো জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি। পাপিয়ার সাথে কারা জড়িত, কারা ইন্ধনদাতা, তার অর্থের উৎস কী, এত বেপরোয়া হওয়ার পেছনে শক্তির উৎস কীÑ সবই তদন্ত করে দেখা হবে। এমনকি অনৈতিক বিষয় থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে।

জানা গেছে, পাপিয়া গ্রেফতারের পর থেকেই যে বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে তা যেন হার মানাচ্ছে আরব্য রজনীর মালিকা হামিরা ও মেহেরাঙ্গেজ চরিত্রগুলোকেও। কৌশলে দলের প্রভাবশালী নেতানেত্রীর সাথে ছবি তুলে নিজের অবস্থান জানান দিতেন এই নেত্রী। দলের শীর্ষ নেতাদের বাগে এনে পদপদবিও বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। তার পরিচিতির সাথে সাথে বাড়ে তার অপরাধজগতের পরিধিও। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, পাপিয়া তার অতিথিদের প্রথমেই নিয়ে যেতেন গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে। লাঞ্চ ও ডিনার শেষে সেখান থেকে নিয়ে যেতেন তার নামে বরাদ্দকৃত বিলাসবহুল প্রেসিডেনসিয়াল স্যুটে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৩ তলাবিশিষ্ট ওয়েস্টিন হোটেলের লেভেল-২২-এ এক হাজার ৪১১ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিলাসবহুল এই প্রেসিডেনসিয়াল স্যুট। সেখানে অতিথিদের নিয়ে সুন্দরী তরুণীদের সাথে কিছুক্ষণ বৈঠক করতেন পাপিয়া। এরপর পছন্দসই তরুণীকে নিয়ে গোপন কক্ষে প্রবেশ করতেন ভিআইপিরা। ওয়েস্টিনের ২২ তলায় চার বেডরুমের ওই স্যুইটের প্রতি রাতের ভাড়া সাধারণভাবে দুই হাজার ডলারের মতো। পাপিয়ার রাজ্যে বিচরণ ছিল প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থার অনেক শীর্ষ ব্যক্তিরই। ওয়েস্টিন হোটেলের কর্মকর্তারাও জানত তার অপকর্ম সম্পর্কে। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও পাপিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে যেতেন হোটেল ওয়েস্টিনে। রিমান্ডে প্রতিদিনই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন পাপিয়া। ইতোমধ্যে অনেক রাঘব বোয়ালের নাম বলেছেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়ার অন্ধকার জগতের সব তথ্য উঠে আসছে। ধানমন্ডিতেও পাপিয়ার আরেকটি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আবাহনী ক্লাব-সংলগ্ন একটি ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেখানেও সুন্দরীদের পাঠাতেন পাপিয়া। খদ্দের ছিলেন নেতারা। তা ছাড়া নেতাদের জন্য ঢাকার একটি সরকারি মহিলা কলেজের কিছু ছাত্রী পাপিয়ার মাধ্যমে নেতাদের ফ্ল্যাটে আসা-যাওয়া করতেন।

পাপিয়ার কার্যকলাপ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, একটি হোটেলে কী ধরনের কার্যকলাপ চলতে পারে, তাদের কী নিয়ম কানুন আছে, কারা ভাড়া নিয়ে হোটেলে থাকতে পারবেÑ তা চেক করে দেখা হবে। এর বাইরে সেখানে কী কী করার নিয়ম আছে তা-ও দেখা হবে। পাপিয়ার অবস্থানের বিষয়ে হোটেলের কী দায় আছে তা-ও দেখা হবে। এ ছাড়া পাপিয়ার বিষয়ে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে সেই অভিযোগগুলোও তদন্ত করা হবে বলে জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার।
তিনি বলেন, সরাইখানা আইনে আছে, আবাসিক হোটেলে প্রতিদিন কারা অবস্থান করবে তাদের তালিকা নিকটস্থ থানায় জমা দিতে হবে। দেশী-বিদেশী যারাই থাক না কেন তাদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা জমা দিতে হবে। তবে এত বেশিসংখ্যক আবাসিক হোটেল যে, প্রতিনিয়ত সেটি করা হয় না। প্রতিনিয়ত করলে হোটেল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয় এবং পুলিশেরও তদারকিতে অসুবিধা হয়। তাই খুব বেশি তদারকি করা হয় না। এখন থেকে হোটেলগুলোতে যাতে অসামাজিক কার্যকলাপ না হয় এবং হোটেল পরিচালনার যে নীতিমালা রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে। সেখানে যাতে ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটিজ না ঘটে সে ব্যাপারে সজাগ থাকবে পুলিশ।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোববার গোপনে দেশত্যাগের সময় নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সেক্রেটারি শামিমা নূর পাপিয়াকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করে র্যাব। গ্রেফতার অন্য তিনজন হলেনÑ পাপিয়ার স্বামী ও তার অবৈধ আয়ের হিসাবরক্ষক মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন, পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী শেখ তায়্যিবা ও সাব্বির খন্দকার। এই নেত্রীর প্রকাশ্য আয়ের উৎস গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা। তবে এর আড়ালে জাল মুদ্রা সরবরাহ, বিদেশে অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাপিয়া গ্রেফতার হওয়ার পরই বেরিয়ে আসতে শুরু করে তার অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর কাহিনী।

এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেনসিয়াল স্যুট এবং ফার্মগেট ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডের রওশনস ডমিনো রিলিভো নামের বিলাসবহুল ভবনে তাদের দু’টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে বিপুল টাকা, আগ্নেয়াস্ত্র, বিদেশী মদসহ অনেক অবৈধ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

র্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়, পাপিয়ার উপার্জনের প্রায় সব উৎসই অবৈধ। তার মূল উপার্জন ছিল ওপর তলার লোকদের মনোরঞ্জন করে অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেয়া। আর এভাবেই সে গড়ে তোলে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিত্তবৈভব। মাসের বেশির ভাগ দিনই তার কাটত পাঁচ তারকা হোটেলে। মাসে কোটি টাকার ওপরে ভাড়া আসত সেসব হোটেল কক্ষের। এমনও দিন গেছে যেদিন পাপিয়ার মদের বিলই এসেছে দুই লাখ টাকার ওপরে। ২৪ ফেব্রুয়ারি জাল টাকা উদ্ধার, অস্ত্র ও মাদকের পৃথক তিন মামলায় পাপিয়ার ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তার স্বামী মফিজুর রহমানেরও ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা করা হয়। এ ছাড়া মামলার অপর দুই আসামি পাপিয়ার সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকেও রিমান্ডে নেয়া হয়। জাল টাকা সরবরাহ, মাদক কারবার, অনৈতিক কাজ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক রাখার অভিযোগে পাপিয়া, তার স্বামীসহ চারজনকে গত মঙ্গলবার থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে রাজধানীর বিমানবন্দর থানা পুলিশ। এরপর বুধবার রাতে মামলা ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়।


আরো সংবাদ