১৫ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১, ৮ মহররম ১৪৪৬
`

নিজ নামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে চিত্রনাট্যে অযাচিত মোচড়!

নিজ নামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে চিত্রনাট্যে অযাচিত মোচড়! - ছবি : সংগৃহীত

ভারতের এক ক্রিকেট ইতিহাসবিদ সোমবার রসিকতা করে বলেছেন, ‘রোববার আমদাবাদে অস্ট্রেলিয়া ভারতীয় গণতন্ত্রের হয়ে ব্যাট করেছে!’

প্রাথমিকভাবে শুনে মনে হতে পারে, রসিকতা! আসলে রসিকতাও নয়। বিশ্বকাপ ফাইনালের চিত্রনাট্য তৈরি ছিল। ম্যাচের আগে মোতেরা শহরের আকাশে ভারতীয় বিমান বাহিনীর ‘সূর্যকিরণ’ দলের প্রদর্শনী। দুই ইনিংসের মাঝে নামীদামী বলিউডি গায়কদের গান, আতশবাজি আর লেজার শো। শেষ প্রহরে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির আগমন এবং বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেয়া। কারো কোনো সন্দেহ ছিল না যে ভারতই ট্রফি নিয়ে যাবে। পুরো দেশ তো বটেই, তারও নয়। তার নামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে তারই সামনে ট্রফি নিয়ে যাবে অন্য দেশ, এমনটা আবার হয় নাকি!

আগামী বছর লোকসভা ভোট। যে ভোটে তৃতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীত্বের পরীক্ষায় ‘অবতীর্ণ’ হবেন তিনি। এর আগে তার কাছে ‘তুরুপের তাস’ ছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপ। এশিয়াডে ১০০ পদক আনার লক্ষ্য সফল। সাথে চাঁদের মাটিতে চন্দ্রযানের সফল অবতরণ। দেশের মাটিতে আয়োজিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্য। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া, উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্দেশে কড়া বার্তা রাখার সুযোগ। তার শাসনাধীন ভারত ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করলে অবিসংবাদিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতো নরেন্দ্র মোদির। তিনি আরো বেশ কয়েক কদম এগিয়ে যেতেন লোকসভা ভোটের আগে।

মোদি জানেন, ভারতে ক্রিকেট ধর্মের মতো। ক্রিকেটবিশ্বে ভারতীয় বোর্ড আর্থিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী। বিশ্বক্রিকেটের মোট লাভের ৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকেই। কোটি কোটি টাকা মূল্যে বিক্রি হয় আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব। যে কোটিপতি লিগে খেলার জন্য মুখিয়ে থাকে পৃথিবীর তাবড় ক্রিকেটারেরা। ক্রিকেটের সাথে, ক্রিকেটকে আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে-থাকা আবেগের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ মোদি সরকার হাতছাড়া করতে চায়নি। প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সেরা দু’টি ম্যাচ রাখা হয়েছিল আমদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে। ভারত-পাকিস্তান এবং ফাইনাল। পাকিস্তানকে হারিয়ে চিত্রনাট্যের প্রথমভাগ সফল করেছিল ‘টিম ইন্ডিয়া’। টানা ১০ ম্যাচ জিতে প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে ফাইনালে ওঠেছিল রোহিতের ভারত। পুরো দেশ ধরে নিয়েছিল, বিশ্বকাপ আসছেই। আর ওই কাপ ভারতীয় অধিনায়কের হাতে তুলে দেবেন ‘দেশের সর্বাধিনায়ক’। আর বিজেপি বলবে, মোদি থাকলে সবই সম্ভব।

নীল জার্সির দলের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেবেন বলে প্রধানমন্ত্রী। পরিচিত চুড়িদার-কুর্তার ওপরে পরে এসেছিলেন ভারতীয় দলের জার্সির নীল রঙে রাঙানো হাতকাটা জ্যাকেট। গলায় নীল রঙেরই উত্তরীয়। তাতে গেরুয়া পাড়। এক ঝলকে দেখলে ভারতের বিশ্বকাপ জার্সির সাথে অদ্ভুত মিল! মোদিকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনে, তারা জানে যে পোশাকের রঙের বিষয়ে তার যেমন খুঁতখুঁতানি আছে, তেমনই আছে নিজস্ব মতামতও। অনুষ্ঠানের ধরনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পোশাকের রঙ নির্বাচন করেন তিনি।

বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো মহামঞ্চে বিশ্বজয়ী দেশীয় ক্রিকেটারদের হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে তাদের এবং গ্যালারির নীল তরঙ্গের সাথে নীল সমুদ্রে মিশে যাওয়ার অপেক্ষা শুধু। কিন্তু চিত্রনাট্য মেলেনি।

প্রায় ফাঁকা নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে মোদিকে ট্রফি তুলে দিতে হলো হলুদ জার্সিধারীদের অধিনায়কের হাতে। সঙ্গী অস্ট্রেলিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস। অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের সাথে হাত মিলিয়ে ট্রফি তুলে দেয়ার পরেই মার্লেসকে নিয়ে দ্রুত মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ফাঁকা মঞ্চে বেশ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সদ্য বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কামিন্স।

রোবাবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোদি স্টেডিয়ামে পৌঁছান। কিছুক্ষণ পরেই দর্শকাসনে তিনি। তবে করপোরেট বক্সে নয়, সাধারণ দর্শকাসনে। এক পাশে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, অন্য পাশে অমিত-তনয় তথা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি জয় শাহ। তবে তিনি স্টেডিয়ামে ঢোকার আগেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। যেটুকু বাকি ছিল, তাও শেষ হয়ে গেল দ্রুত। ভারতের হার নিশ্চিত- এমন উৎকণ্ঠা এবং হতাশার সময়েও দর্শকদের দিকে হাত নেড়েছেন মোদি।

পুরস্কার বিতরণে পর ভারতীয় দলের সাজঘরে চলে যান মোদি। তার আগেই তার ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) থেকে পোস্ট করা হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের উদ্দেশে বলবর্ধক মন্তব্য। দৃশ্যতই ভেঙে-পড়া ক্রিকেটারদের সাথে গিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। একে একে তাদের সাথে হাত মেলান। আর বুকে জড়িয়ে ধরেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সফলতম বোলার মোহাম্মদ শামিকে। ভারতের পেস বোলার মুখ গুঁজে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বুকে আর প্রধানমন্ত্রী তার পিঠে রাখছেন সান্ত্বনার হাত।

সোমবার সাজঘরে মোদির সাথের ছবি পোস্ট করে শামি এক্সে লিখেছেন, ‘রোববার দিনটা আমাদের ছিল না। বিশ্বকাপ জুড়ে আমাদের পাশে থেকে সমর্থন করার জন্যে সমস্ত ভারতবাসীকে ধন্যবাদ। সাজঘরে এসে আমাদের চাঙ্গা করে তোলার জন্য আলাদা করে ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।’ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি পোস্ট করেছেন রবীন্দ্র জাদেজাও। ঘটনাচক্রে, যার স্ত্রী রিভাবা মোদির রাজ্য গুজরাটের মোদির দল বিজেপির বিধায়ক।

কিন্তু যাবতীয় মনোযোগ এবং নজর কাড়ছে মোদির বুকে শামির ছবি।

সমালোচকরা বলছে, মুসলিম ধর্মাবলম্বী শামিকে ওইভাবে জড়িয়ে ধরে মোদি কি আলাদা কোনো ‘বার্তা’ দিতে চাইলেন?

তবে ওই কটাক্ষ উড়িয়ে দিচ্ছে বিজেপির লোকজন। তাদের কথায়, শামি এবার ভারতের হয়ে দুর্ধর্ষ পারফর্ম করেছেন। প্রথম চারটি ম্যাচ না খেলেও এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তিনিই। কিন্তু তা সত্ত্বেও কাপ অধরাই থেকে গেল তার। শামির ওই অপ্রাপ্তি অনুভব করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই তাকেই সবচেয়ে বেশি সান্ত্বনা দিয়েছেন। এর মধ্যে রাজনীতি খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন এবং হাস্যকর।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা


আরো সংবাদ



premium cement