২৫ জানুয়ারি ২০২১
`

বলের আঘাতে মৃত্যু বার বার কাঁদিয়েছে ক্রিকেটকে

ফিল হিউজের মৃত্যু নাড়িয়ে দেয় ক্রিকেট বিশ্বকে। - ছবি : সংগৃহীত

মাথায় কিংবা বুকে বল লেগে ক্রিকেটারদের মৃত্যু বার বার কাঁদিয়েছে ক্রিকেট বিশ্বকে। তাই পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করা হয়েছে বিভিন্ন নিয়ম। ওই পরিবর্তনেরই একটা অংশ কনকাশন সাব।

সম্প্রতি ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে মিচেল স্টার্কের বল রবীন্দ্র জাদেজার মাথায় লাগে। ব্যাট হাতে ইনিংস শেষ করলেও বল করতে নামেননি তিনি। তার পরিবর্তে যুজবেন্দ্র চাহালকে দলে নেয় ভারত। কনকাশন সাব হিসেবে দলে আসেন তিনি।

২০১৯ সালে ক্রিকেটে কনকাশন সাব-এর নিয়ম চালু হয়। অস্ট্রেলিয়ার তরুণ ক্রিকেটার ফিল হিউজের মৃত্যু এর পিছনে যে বড় ভূমিকা নিয়েছিল, তা বলাই যায়। শন অ্যাবটের বলে ঘাড়ে আঘাত লাগে হিউজের। হাসপাতালে নিয়ে গেলে দুই দিন পর মৃত্যু হয় তার। ২০১৪ সালের সেই ঘটনা নাড়িয়ে দেয় ক্রিকেট বিশ্বকে।

কনকাশনের অর্থ- মাথায় আঘাতের ফলে মস্তিষ্কের ওপর তার প্রভাব। ক্রিকেট মাঠে বল এসে মাথায় লাগলে তার থেকে সমস্যা তৈরি হতে পারে ব্যাটসম্যানের। ঘটতে পারে মৃত্যুও। এই বিষয়কে মাথায় রেখেই কনকাশন সাব নিয়ম আনে আইসিসি।

এই নিয়মের ফলে কোনো ক্রিকেটারের মাথায় আঘাত লাগলে তার পরিবর্তে অন্য ক্রিকেটার দলে আনা যাবে ম্যাচ রেফারির অনুমতি নিয়ে। তবে ব্যাটসম্যানের বদলে ব্যাটসম্যান নিতে হবে বা বোলারের পরিবর্তে বোলার। যদি কোনো ব্যাটসম্যানের পরিবর্তে অলরাউন্ডার নেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে ম্যাচ রেফারি চাইলে ওই ক্রিকেটারকে বল করার অনুমতি নাও দিতে পারেন।

ভারতের সাবেক ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কার যদিও কনকাশন-সাবের বিরোধী। তাদের সময় বিনা হেলমেটে খেলা হলেও কনকাশন সাব ছিল না। এখন এতো সুরক্ষা ব্যবস্থার পরেও কনকাশন সাব মানতে পারেন না তিনি। যদিও শুক্রবার ভারত নিয়ম মেনেই কনকাশন সাব নিয়েছে বলে তার মত।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার টম মুডিও মেনে নিতে পারেননি এমন কনকাশন সাব। তিনি বলেন, ‘জাদেজার মাথায় বল লাগার পর কোনো চিকিৎসক তাকে দেখতে মাঠেই এলেন না, অথচ কনকাশন সাব নিলো ভারত।’ একই অভিযোগ করেন সাবেক ইংরেজ অধিনায়ক মাইকেল ভনও।

তবে এটিই প্রথম নয়। ক্রিকেট মাঠে প্রথম কনকাশন সাব হয় ২০১৯ সালে লর্ডসে অ্যাসেজ টেস্টের দ্বিতীয় দিনে। ইংল্যান্ডের জোফ্রা আর্চারের বিষাক্ত বাউন্সারে মাঠেই লুটিয়ে পড়েন স্টিভ স্মিথ। ঘাড়ে চোট পেয়ে ছিটকে যান এক টেস্টের জন্য। তার পরিবর্তে মাঠে নামেন মার্নাস লাবুশানে। ওই ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে লাবুশানে ৫৯ রানের ইনিংস খেলেন। আর ওই ইনিংস টেস্ট ক্রিকেটে তাকে যেন নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে।

মাথায় আঘাত লেগে মৃত্যু হয়েছে বেশ কজন ক্রিকেটারের। দেখে নেয়া যাক তেমনই কিছু ঘটনা :

একটি সূত্র বলছে, ১৬২৪ সালে জাস্পার ভিনাল প্রথম ক্রিকেটার, যিনি মাথায় আঘাত লেগে মারা যান। ক্রিকেটের আদি যুগ বলা যেতে পারে ওই সময়টাকে। ভিনাল ওই ম্যাচে ফিল্ডিং করার সময় তাকে বল ধরা থেকে আটকাতে যান ব্যাটসম্যান। তার ব্যাটের আঘাতে মৃত্যু হয় ইংল্যান্ডের এ ক্রিকেটারের। ঘটনাটি ঘটে ইংল্যান্ডের সাসেক্সে। আঘাত লাগার ১৩ দিন পর মৃত্যু হয় ভিনালের।

আবারো বল লেগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১৮৭০ সালে। নটিংহ্যামসায়ারের ক্রিকেটারের জর্জ সামার্স ওই দিন খেলতে নেমেছিলেন মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের বিরুদ্ধে। জন প্ল্যাটসের শর্ট বল এসে লাগে সামার্সের মাথায়। চার দিন পর ওই আঘাতের কারণেই মৃত্যু হয় তার।

ফ্রেডরিক র‍্যান্ডন সিনিয়র, ইংল্যান্ডের মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলতেন তিনি। ১৮৮১ সালে তার মাথায় বল লাগে। এর পর থেকে কোনোভাবেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। দুই বছর পর ১৮৮৩ সালে তিনি মারা যান।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে মারা যান ইংল্যান্ডের আর্থার আর্লাম। ফিল্ডিং করার সময় ব্যাটসম্যানের মারা বল এসে লাগে তার মাথায়। এতে মৃত্যু হয় তার।

পাকিস্তানের ক্রিকেটার আব্দুল আজিজ মারা যান ১৯৫৯ সালে। তবে মাথায় নয়, বুকে এসে লেগেছিল বল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার। কায়েদ-ই-আজামের হয়ে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করার সময় দিলদার আওয়ানের বল এসে তার বুকে লাগে। ফের স্টান্স নেয়ার জন্য দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যান তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে তার নামের পাশে লেখা হয় ‘হার্ট বাই ডেড’।

এক ভারতীয় ক্রিকেটারও মারা গিয়েছিল মাথায় বল লেগে। তার নাম রমন লাম্বা। তিনি মারা যান ১৯৯৮ সালে। ১৯৮৬ সালে ভারতের এক দিনের দলে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম অভিষেক ঘটে তার। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটও খেলেন তিনি। তবে ওই ম্যাচে আঙুলে চোট লাগলে তার বদলে মুহাম্মদ আজহারউদ্দিনকে সুযোগ দেয়া হয়। বাংলাদেশের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে তিনি ছিলেন যথেষ্ট পরিচিত। সেখানেই ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ফিল্ডিং করতে গিয়ে মাথায় বল লাগে তার। স্পিনার সাইফুল্লা খানের বলে ব্যাটসম্যানের অনেক কাছে দাঁড়িয়েও হেলমেট পরতে চাননি তিনি। মস্তিষ্কে ইন্টারনাল হ্যামারেজে মৃত্যু হয় তার।

২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ড্যারিন রান্ডল মারা যান মাথায় বল লেগে। মাঠের মধ্যে আঘাত লাগার সাথে সাথেই মারা যান তিনি।

তার পরের বছরই হয় ফিল হিউজের মৃত্যু। ২৫ নভেম্বর ২০১৪ সালে অ্যাবটের বল লাগে হিউজের মাথায়। দু’দিন পর হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলতে নামা হিউজের নামের পাশে এখনো লেখা থাকে ৬৩, অপরাজিত।

২০১৫ সালে মারা যান পশ্চিমবঙ্গের ক্রিকেটার অঙ্কিত কেশরী। অনূর্ধ্ব-১৯ বাংলা দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ক্যাচ নেয়ার সময় অন্য ফিল্ডারের সাথে সংঘর্ষে মৃত্যু হয় তার।



আরো সংবাদ