০৫ এপ্রিল ২০২০

আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণ

আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণ - ছবি : সংগৃহীত

দেশব্যাপী আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে চলছে শৈত্যপ্রবাহ, অন্য দিকে ঊর্ধ্বমুখী রাতের তাপমাত্রা। একই সময়ে ঘন কুয়াশায় সূর্যও দেখা যায় না। সাধারণত এক জায়গায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও তাপমাত্রা সমান অনুপাতে কমে যায়। কিন্তু চলতি বছর তাপমাত্রার একটি বিচিত্র আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। গতকাল বুধবার রাজশাহী, নওগাঁ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও রংপুর বিভাগের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে এবং তা আজ বৃহস্পতিবারও অব্যাহত থাকতে পারে যদিও কোনো কোনো এলাকায় তা প্রশমিত হয়ে যেতে পারে। তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার ঢাকায় নি¤œ তাপমাত্রা ছিল ১৪.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তেঁতুলিয়া ও রাজধানীর মধ্যে নি¤œ তাপমাত্রার পার্থক্য দ্বিগুণ। এই দুই এলাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় একই রকম। যেমন গতকাল রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং তেঁতুলিয়ার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৬.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাধারণত শৈত্যপ্রবাহ যে এলাকায় বয়ে যায় সেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনি¤œ তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য ১০ ডিগ্রির বেশি থাকে না। এ ক্ষেত্রে পার্থক্য ছিল ব্যাপক। এ কারণে আবহাওয়াবিদরা এটাকে বিচিত্র আচরণ বলছেন।

এ দিকে আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের প্রভাব শুধু যে পরিবেশে লক্ষিত হচ্ছে তা নয় এর প্রভাবে মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যাও সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন নতুন রোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে মানুষকে। এ ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু বিপর্যয়ের জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা।

ঘন কুয়াশার কারণে গতকাল বিমানের শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। হজরত শাহজালাল (রহ:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭ ঘণ্টা বিমান ওঠানামা বন্ধ থাকে। বড় নদীগুলোতে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা। রাতে দূরপাল্লার বাসগুলো খুবই স্বল্প গতিতে চলতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে ঢাকার বাইরে থেকে যে বাস ভোর রাতে অথবা সকালে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা তা ঢাকা এসে পৌঁছায় দুপুরের আগে আগে। এবার কুয়াশা এত ঘন যে তা সূর্যের আলো পৌঁছাতেও বাধা দিচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ মো: বজলুর রশীদ বলছেন এবার কুয়াশা একটু বেশি ছিল। হঠাৎ করে তাপমাত্রা পড়ে গেছে। তাপমাত্রা যদিও খুব বেশি নিচে নামেনি তথাপি ঘন কুয়াশায় সূর্য দেখা না যাওয়ায় ঠাণ্ডার অনুভূতি বেশি ছিল। এ বছরের আবহাওয়া অন্য বছরের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম তবে অস্বাভাবিক নয়। গত বছর শীতকাল তুলনামূলক উষ্ণ ছিল এবারের চেয়ে। বজলুর রশীদ বলেন, এটা ঠিক যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। এর একটা প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তবে এটা এক বছরের আবহাওয়ার প্রকৃতি থেকে নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ুতে যে পরিবর্তন হচ্ছে তার আলামত খুবই স্পষ্ট। এবার অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন নাসার বিজ্ঞানীরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, আবহাওয়া অথবা জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। আগে বাংলাদেশে নভেম্বরেই শীত পড়ে যেত, বেশ কয়েক বছর যাবত ডিসেম্বরে শীত পড়ছে। শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়া এবং পরিবেশে তাপমাত্রা বেশি থাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাসজনিত রোগ বাড়ছে। নভেম্বরেও নি¤œ তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা এডিস ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বংশবিস্তার করতে পারে। খুব ভালোভাবে বংশবিস্তার করে ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকলে। এবার বাংলাদেশে নভেম্বরেও ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ছিল। ফলে নভেম্বর তো বটেই ডিসেম্বরেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। চিকুনগুনিয়ার একই অবস্থা।

ড. আলমগীর বলেন, চিকুনগুনিয়া এডিস মশা দিয়েই ছড়ায়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়লেও ২০১৮ ও ২০১৯ সালে খুব বেশি দেখা যায়নি। এটা অবশ্য হয়েছে একটু ভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যের কারণে। ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস ইজিপ্টাই দিয়ে আর চিকুনগুনিয়া ছড়ায় এডিস অ্যালবুপিক্টাস প্রজাতির মাধ্যমে। অ্যালবুপিক্টাস প্রজাতিকে একবার ধাওয়া দিয়ে লোকালয়ের বাইরে পাঠিয়ে দিলে সে আর মানুষের কাছে আসে না। এ প্রজাতি তখন পশু ও পাখির রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু ডেঙ্গু জীবাণু বহনকারী এডিস ইজিপ্টাইকে মানুষের রক্তই খেতে হয়। এটাকে ধাওয়া দিলেও বারবার সে মানুষের কাছে ফিরে আসে। সে কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হয়। আর এ প্রজাতির মশাগুলোর বংশবৃদ্ধি হয়ে থাকে তাপমাত্রা বেশি থাকলে। ড. আলমগীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বাড়লে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বরের প্রকোপও বাড়তে থাকে। তবে বাংলাদেশে এই তিনটি রোগ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শস্যের গুণাগুণ ও উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন আসে; পানির স্বল্পতা ঘটবে, হ্রাস পাবে মাটির উর্বরতা। একই সাথে নতুন নতুন বালাই দেখা দিতে পারে। ফলে কৃষিতে কীটনাশক ও সারের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। সেচের ব্যাপকতা, ভূমিক্ষয়, মৎস্যবৈচিত্র্য কমে যাওয়া, রাসায়নিকের ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ফলে দারিদ্র্য বাড়বে এবং সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়বে। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ধান ও গমের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রের উপরিতলের উচ্চতা এক মিটার (এক গজ ৩ ইঞ্চি) উঁচু হতে পারে। এতে বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ১৮.৩ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হতে পারে। এমন হলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

অবসরপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী ড. তৌফিক হারিস জানিয়েছেন, বন্যার কারণে আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষক সেচনির্ভর বোরো ধানের দিকে ঝুঁকেছেন। অপর দিকে ধানের দিকে কৃষক বেশি ঝুঁকে পড়ায় ডাল চাষের জমি হ্রাস পেয়েছে। ফলে আবাদও হ্রাস পেয়েছে। তা ছাড়া পাট, গম ও আখের চাষ ও উৎপাদন উভয়ই লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের ১০ ফসল উৎপাদনে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, এটা নিয়ে চার বছর গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনোসোটা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অন দ্য এনভায়রনমেন্টের বিজ্ঞানীরা। তারা দেখেছেন, বিশ্বের ৮৩ শতাংশ খাবার আসে এই ১০টি ফসল থেকে। ফলাফলে তারা দেখিয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তনে সব ফসলের ক্ষতি হয় না। কোনো কোনো ফসলের উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বের প্রধান দু’টি ফসল ধান ও গম উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বে ধান উৎপাদন কমিয়েছে ০.৩ শতাংশ এবং গম উৎপাদন কমিয়েছে ০.৯ শতাংশ। তবে খরা সহনীয় ধান উৎপাদন বেড়েছে সাব-সাহারান এলাকায় ০.৭ শতাংশ এবং পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ০.৯ শতাংশ।

জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংস্থা (ইউএনসিসি) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন হলে নতুন নতুন রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বিশ্বে বছরে দুই কোটি ২৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকে।


আরো সংবাদ

আত্মহত্যার আগে মায়ের কাছে স্কুলছাত্রীর আবেগঘন চিঠি (১৩৫৩০)সিসিকের খাদ্য ফান্ডে খালেদা জিয়ার অনুদান (১২৬০৬)করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়া, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল (৯৩১৫)ভারতে তাবলিগিদের 'মানবতার শত্রু ' অভিহিত করে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ (৮৪৯০)করোনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ইতালির একটি পরিবার (৭৮৬৪)করোনার মধ্যেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আরেক যুদ্ধ (৭১৪০)করোনায় আটকে গেছে সাড়ে চার লাখ শিক্ষকের বেতন (৬৯৩১)ইসরাইলে গোঁড়া ইহুদির শহরে সবচেয়ে বেশি করোনার সংক্রমণ (৬৮৯০)ঢাকায় টিভি সাংবাদিক আক্রান্ত, একই চ্যানেলের ৪৭ জন কোয়ারান্টাইনে (৬৭৬১)করোনাভাইরাস ভয় : ইতালিতে প্রেমিকাকে হত্যা করল প্রেমিক (৬২৯৬)