২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`
কুয়েট শিক্ষকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিবাদ

একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন কালো ব্যাজ ধারণ

-

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. সেলিম হোসেনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি। গতকাল একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করে ক্যাম্পাসের দুর্বার বাংলা চত্বরে এক প্রতিবাদ সভায় এ দাবি জানানো হয়। ১৫০ জন শিক্ষক কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন। পরে শিক্ষকরা বিশ্ববিদালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। সভায় শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলেন, সেলিম হোসেন ছিলেন অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির একজন মানুষ। তিনি কখনো শিক্ষার্থীদের সাথে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না। কুয়েট থেকে লেখাপড়া শেষ করে, তিনি এখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি শেষ করে এসে তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। তিনি কুয়েটের একমাত্র ক্রিপ্টোগ্রাফিতে পিএইচডি করা অধ্যাপক। তার ওপর ভিত্তি করে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে একটি নতুন ল্যাব তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পিছিয়ে পড়ল। সেলিম হোসেনের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু না। মৃত্যুর দেড় ঘণ্টা আগে কিছু বিপথগামী ছাত্র তাকে পথরোধ করে একাডেমিক কার্যালয়ে নিয়ে আসে। সেখানে ছোট একটি রুমে প্রায় ৪০ জন ছাত্র তাকে মানসিক নির্যাতন করে। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শিক্ষককে যেসব ছাত্র অপদস্থ করেছে, তাদের আমরা কিভাবে আদর্শ মানুষ বানাবো।
বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ভূমিকায় আমরা হতাশ। মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকশূন্য। আমরা ক্লাস বর্জন করেছি। তবুও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের দাবিতে কোনো সাড়া আসেনি। আমরা ক্লাসে ফিরতে চাই, তাই প্রশাসনের উচিত অতিদ্রুত সেলিম হোসেনকে অপদস্থ করা শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করা। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু প্রশাসন আমাদের পক্ষে সায় দিচ্ছে না।
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রতীক চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে বক্তৃতা করেন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সজল অধিকারী, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সোবহান মিঞা, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীল, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো: সাইফুর রহমান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শেখর চন্দ্র শিকদার, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: আলমগীর হোসেন, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা সরোয়ার প্রমুখ।
উল্লেখ্য, গত ৩০ নভেম্বর বেলা ৩টার দিকে হার্টঅ্যাটাকে মারা যান কুয়েট শিক্ষক প্রফেসর ড. মো: সেলিম হোসেন। তিনি কুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ও লালন শাহ হলের প্রভোস্ট ছিলেন।
সম্প্রতি কুয়েটের লালন শাহ আবাসিক হলের ডিসেম্বর মাসের খাদ্য-ব্যবস্থাপক (ডাইনিং ম্যানেজার) নির্বাচন নিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান প্যানেলের বিরুদ্ধে নির্বাচনপ্রক্রিয়া প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। ওই প্যানেলের সদস্যরা হলের প্রভোস্ট ড. সেলিম হোসেনকে নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিল তাদের মনোনীত প্রার্থীকে নির্বাচন করার জন্য। তারই ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের একটি ক্যাডার গ্রুপ ক্যাম্পাসের রাস্তা থেকে ড. সেলিম হোসেনকে জেরা করা শুরু করে। পরে তারা শিক্ষককে অনুসরণ করে তার ব্যক্তিগত কক্ষে (তড়িৎ প্রকৌশল ভবন) প্রবেশ করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা আনুমানিক আধা ঘণ্টা ওই শিক্ষকের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ও অসুস্থ হয়ে যান। পরবর্তীতে, শিক্ষক ড. সেলিম হোসেন দুপুরে খাবারের উদ্দেশে ক্যাম্পাসের নিকটস্থ বাসায় যাওয়ার পর বেলা আড়াইটার দিকে তার স্ত্রী লক্ষ করেন তিনি বাথরুম থেকে বের হচ্ছেন না। পরে, দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ব্যাপারে কুয়েট ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক ড. ইসমাইল সাইফুল্লাহ বলেন, এ ঘটনায় ড. রজিবুল আহসানকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত তাদের রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আরো সংবাদ


premium cement