০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

কক্সবাজারের বনভূমিতে প্রশাসন একাডেমির বরাদ্দ বাতিলের দাবি

বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ সভা আজ
-

বনভূমিতে প্রশাসন একাডেমি কেন? এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে। দাবি উঠেছে কক্সবাজারের ফুসফুস খ্যাত শুকনাছড়ির ‘বেআইনি’ এই বরাদ্দ বাতিলের। আজ রোববার কক্সবাজার শহরে ১৮টি পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন সংগঠন বরাদ্দ বাতিল চেয়ে শহরে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে। এসব সংগঠনের দাবি বরাদ্দকৃত বনভূমির ওই এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সঙ্কটাপন্ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই বনভূমি যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস), গ্রিন ভয়েস, কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলন, তারুণ্যের প্রতিবাদ, টিম ইলেভেন কক্সবাজার, দরিয়ানগর গ্রিন ভয়েস, কক্সিয়ান এক্সপ্রেস, পশ্চিম বাহারছড়া যুব কল্যাণ সঙ্ঘ, ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস কক্সবাজার, সেইফ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, একতা ছাত্র পরিষদ, রাখাইন একতা সঙ্ঘ, বড়বাজার রাখাইন যুব সঙ্ঘ, রাজধানী ফ্রেন্ডস সার্কেল, টেকপাড়া রাখাইন ছাত্র পরিষদ এবং রাখাইন ক্রীড়া সংস্থা। এসব সংগঠনের পক্ষে ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির সমন্বয়ক ইব্রাহিম খলিল মামুন ও সাংবাদিক নজরুল ইসলাম জানান, পরিবেশ বিধ্বংসী এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমরা নাগরিক দায়বোধ থেকে প্রতিবাদ করছি।
একটি প্রশাসন একাডেমির জন্য ৭০০ একর জমি আইন বহির্ভূতভাবে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ অবন্দোবস্তযোগ্য এই পাহাড়ে ৫৮ প্রজাতির বৃক্ষ আছে। এর মধ্যে আছে গর্জন, অর্জুন, চাপালিশ, তেলসুর, কড়ই, বাটনা, ভাদি, বহেরাসহ অনেক দুর্লভ প্রজাতির গাছ। এ ছাড়া বন্য প্রাণীর মধ্যে আছে এশীয় বন্যহাতি, বানর, বন্য শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখি। তাই আমরা এগুলো রক্ষায় মাঠে নেমেছি এবং বেআইনি এই বরাদ্দ বাতিলের দাবি করছি। এই বরাদ্দ বাতিল করতেই হবে। তারা আরো বলেন, আমরা দেখে আসছি কক্সবাজারে সরকারের অনেক দফতর ও বিভাগের অফিস বা আবাসিক ভবন ব্যবহার করা হয় বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে। এখন জমির পরিমাণ ও স্থান বিবেচনায় এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠে আসছে যে এটা কী প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি নাকি বিণোদন কেন্দ্র? বনভূমিতে প্রশাসন অ্যাকাডেমি কেন?’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আরেকটি প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ করতে ‘সংরক্ষিত বনভূমির’ ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন ঝিলংজা বনভূমির ওই এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সঙ্কটাপন্ন। বন বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে ভূমি মন্ত্রণালয় এই জমি বরাদ্দ দিয়েছে। বন বিভাগের দাবি, এই জমি তাদের এবং বন আইন অনুযায়ী, পাহাড় ও ছড়াসমৃদ্ধ এই বনভূমির ইজারা দেয়া বা না দেয়ার এখতিয়ার কেবল বন বিভাগের। সূত্র মতে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দপত্রে দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বনভূমিকে অকৃষি খাসজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় বলেছে, বরাদ্দ দেয়া জমির ৪০০ একর পাহাড় ও ৩০০ একর ছড়া বা ঝরনা। তারা জমির মূল্য ধরেছে চার হাজার ৮০৩ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু একাডেমির জন্য প্রতীকী মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র এক লাখ টাকা। এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওই বনভূমির মালিক বন বিভাগ। কিন্তু ইজারার জন্য কেউ আমাদের চিঠি দেয়নি। ভূমি মন্ত্রণালয় যে বনভূমি ইজারা দিয়েছে, তাও আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানি না।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের একটি রক্ষিত বন ও প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকাকে স্থাপনা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া অবৈধ। আমরা সংসদীয় কমিটি থেকে বরাদ্দ না দিতে চিঠিও দিয়েছিলাম। সরকার যেখানে বেহাত বনভূমি উদ্ধারের চেষ্টা করছে, সেখানে সরকারি সংস্থা যদি অবৈধভাবে বনভূমি ইজারা নেয়, তাহলে বনভূমি রক্ষা হবে কিভাবে? বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য সাভারে বিপিএটিসি আছে। প্রশিক্ষণের জন্য আরো স্থান দরকার হলে সেখানে বহুতল ভবন করা যায় বা তার পরিধি বাড়ানো যায়। তা না করে পরিবেশগতভাবে সঙ্কটাপন্ন একটি বনভূমি ধ্বংস করে কেন এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে, তা বোধগম্য নয়। এই পরিকল্পনা থেকে অবশ্যই সরে আসা উচিত। এ দিকে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ দেয়ার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। ওই বনভূমি ধ্বংস করে সেখানে বঙ্গবন্ধু সিভিল সার্ভিস একাডেমি (বিএপিএ) ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএসএ) নিজস্ব ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিলেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া দেশের বন পেশাজীবীদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব ফরেস্টারস বাংলাদেশ (আইএফবি) থেকেও রক্ষিত ওই বন এবং প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন ওই এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত স্থগিতের আহ্বান জানানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সংগঠন দু’টি পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘বিপন্ন এশিয় বন্যহাতিসহ দেশের অনেক বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণির নিরাপদ বসতি কক্সবাজারের এই সংরক্ষিত বনভূমি। এই বনভূমিতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, তা স্পষ্টত আইনবিরোধী এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ, তাই অবিলম্বে বনভূমি উজাড় করা এই উদ্যোগ বাতিলের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।’


আরো সংবাদ


premium cement