২৪ জুন ২০২১
`
সভাপতির পদ থেকে এমপি জাফরকে অব্যাহতি

চকরিয়ায় আ’লীগের ২ পক্ষে উত্তেজনা

-

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ ও চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমের সাথে অন্যদের মধ্যে চলা দীর্ঘ দিনের বিরোধ এবার প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার জেলা আওয়ামী লীগ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এমপি জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে বিক্ষোভ করে জাফর আলম সমর্থকরা। এতে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার উভয় দিক থেকে আসা শতাধিক যানবাহন কয়েক ঘণ্টা ধরে আটকা পড়ে তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে উভয় দিক থেকে আসা হাজার হাজার যাত্রীকে। সর্বশেষ রাত ১২টায় এমপি জাফর মাইকে তার নেতাকর্মীদের ব্যারিকেড তুলে নিতে আহ্বান জানালে যান চলাচল শুরু হয়।
জানা গেছে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার (১০ জুন) কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জরুরি সভায় কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সরওয়ার আলমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই সাথে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সুপারিশ করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্র বলছে, গত মঙ্গলবার চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী ও চকরিয়া পৌরসভার নৌকার মনোনীত মেয়র প্রার্থী বর্তমান মেয়র আলমগীর চৌধুরীর ওপর হামলা ও দলীয় সিদ্ধান্ত ভঙ্গের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এদিকে সংসদ সদস্য জাফর আলমকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা চট্টগ্রাম-কক্সবাবাজার মহাসড়কে ব্যারিকেড দেয়। রাত সাড়ে ৮টা থেকে চকরিয়া পৌর শহর চিরিংগায় বিক্ষোভ চলছিল। এতে মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এছাড়া পাশের পেকুয়া উপজেলায়ও বিক্ষোভ করে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। সেখানেও তারা সড়ক অবরোধ করে।
তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলামকে বহিষ্কার করে জেলা আওয়ামী লীগ। এ ঘটনার জের ধরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে, যেখানে একপক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পৌরসভার চিংড়ি চত্বর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে সংসদ সদস্য ধাক্কাধাক্কিতে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
জাহেদুল ইসলামের বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান।
দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় আঘাত পেয়েছেন চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী ও উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রেফায়েত সিকদার।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিরোধিতা করা ও নির্বাচনী সফরের সময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদকের সভায় উপস্থিত না হওয়ার অভিযোগে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশে মঙ্গলবার জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরে চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলামকে সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোসলেহ উদ্দিন মানিককে। এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জাহেদুল ইসলামের সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী নেতাকর্মী ও স্থানীয় লোকজন বলেন, মঙ্গলবার রাতে পৌরসভা এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা শেষে পৌর ভবনের পাশে চিংড়ি চত্বর এলাকায় বসে আলোচনা করছিলেন চকরিয়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আলমগীর চৌধুরী, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী, যুবলীগের নেতা রেফায়েত সিকদারসহ ৪০-৫০ জন নেতাকর্মী।
ওই সময় বেতুয়া বাজার এলাকায় এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নামাজে জানাজা শেষে পৌরসভার চিংড়ি চত্বর এলাকা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কক্সবাজার-১ আসনের (চকরিয়া-পেকুয়া) সংসদ সদস্য জাফর আলম।
ওই এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেখে প্লাস্টিকের লাঠি হাতে গাড়ি থেকে নামেন সংসদ সদস্য। এ সময় কয়েকজন কর্মী-সমর্থককে পিটুনি দেন তিনি।
তার সঙ্গে থাকা ডুলাহাজারা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাসানুল ইসলাম আওয়ামী লীগের নেতা আতিক ও যুবলীগের নেতা রেফায়েত সিকদারকে ধাক্কা দেন। এতে তারা আহত হন।
ওই সময় চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটুও সংসদ সদস্যের গাড়ি থেকে নেমে কয়েকটি চেয়ার ভাঙচুর করেন।
পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা মেয়র আলমগীর চৌধুরী সংসদ সদস্যকে গাড়িতে তুলে দিলে তিনি বাড়ি ফিরে যান। তবে খবর ছড়িয়ে পড়ে মেয়র প্রার্থী আলমগীর চৌধুরীর ওপর প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা করেছে।
এ খবরে মেয়র প্রার্থীর বাড়ির এলাকা কাহারিয়াঘোনা থেকে শতাধিক কর্মী-সমর্থক লাঠিসোটা নিয়ে চিংড়ি চত্বর এলাকায় যান। এ সময় আলমগীরের কর্মী-সমর্থকরা জাফর আলম ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জিয়াবুল হকের (সংসদ সদস্যের ভাতিজা) বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্য হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে লাঠি হাতে নেতাকর্মীদের ধাওয়া করেন। তার সঙ্গে থাকা হাসানুল ইসলাম ও জাহেদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গায়ে হাত তোলেন।
সংসদ সদস্যের এমন আচরণ সম্পর্কে আলমগীর চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্যের ভাতিজা জিয়াবুল হক ২১ জুন অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মেয়র পদে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। তাছাড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া জাহেদুল ইসলাম এমপির অনুসারী। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে ও জাহেদুলকে অব্যাহতির খবরে সংসদ সদস্য এমন আচরণ করেছেন।
চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও এসি ল্যান্ড মো: তানভীর হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ মহাসড়ক থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সরিয়ে দিতে গিয়ে পিছু হটে।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাকের মোহাম্মদ যুবায়ের বলেন, মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার প্রায় ৩৯ কিলোমিটার মহাসড়কের এক প্রান্তের আজিজনগর এবং অপর প্রান্তের খুটাখালী পর্যন্ত কিছুদূর পর পর অন্তত ২০ পয়েন্টে ব্যারিকেড দেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। রাতে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়নি।
ওসি বলেন, অল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনে দলের মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এমপি জাফর আলম বলেন, আমি দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেইনি। জেলা আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেট নির্ভর রাজনীতি করার জন্য হটকারী ও অন্যায্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর দলের কোনো নেতাকর্মী বা সমর্থক এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। তিনি এ জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানকে দায়ী করেন।
বতর্মানে পরিস্থিতি উত্তেজনাকর। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।



আরো সংবাদ