৩০ জুলাই ২০২১
`

‘জলাবদ্ধতার অভিশাপ’ থেকে কবে মুক্তি পাবে ডিএনডিবাসী

-

ডাইংয়ের নোংরা পানি, টয়লেটের নোংরা পানি এখন রাস্তায়। মানুষ চলাচল করতে পারে না। শিশুরা বাইরে খেলাধুলা করতে বের হতে পারে না। বৃষ্টি বেশি হলে ঘরেও পানি ঢোকে। আমরা খুব কষ্টে আছি। এত্ত ভোগান্তি আর সহ্য হয় না। নয়া দিগন্তকে এভাবেই নিজের আক্ষেপের কথা বললেন ফতুল্লার কাঠেরপুল ডিএনডি এলাকার বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান।
তিনি জানান, আমরা মনে করেছিলাম ডিএনডি জলাবদ্ধতার কাজ চলছে এবার মনে হয় মুক্তি পাবো। কিন্তু আমাদের সেই আশা হতাশায় রূপ নিয়েছে। আগে বর্ষাকালের মাঝামাঝি সময়ে পানিতে ডুবে থাকতাম। এবার বর্ষা শুরুর আগেই পানিতে ডুবে আছি। বাকি দিন কী হবে আল্লাহই ভালো জানেন।
তৈয়বের মতো ডিএনডিতে বসবাসকারী প্রায় ২২ মানুষের চোখে জলাবদ্ধতা নিয়ে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। সামনে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কী হবে তা নিয়ে ভেবে কূল পাচ্ছেন না তারা। কোটি কোটি টাকা খরচ পরেও কেন ডিএনডি এলাকায় জলাবদ্ধতা এমন প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএনডি প্রকল্পের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন কাজের জন্য নিয়োজিত ঠিকাদারদের বিনিয়োগ করা অর্থ পরিশোধ না করায় চলমান কাজ তারা বন্ধ করে দিয়েছে। হঠাৎ থমকে গেছে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ।
সম্প্রতি ফতুল্লা লালপুর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে জলাবদ্ধতা দেখে হতবাক হন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি লালপুরের রাস্তাঘাট ডুবন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এতে তিনি বিব্রত হয়ে পড়েন। শামীম ওসমান লালপুরের করুণ অবস্থা দেখে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপনের কাছে জানতে চান এখানে এমন জলাবদ্ধতার কারণ কী? তখন চেয়ারম্যান স্বপন তাকে জানান, শুধু লালপুর নয়, বরং গোটা ফতুল্লা ইউনিয়নের বিরাট অংশজুড়েই এমন জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
ইউপি চেয়ারম্যান জানান, ইসদাইর এলাকায় রেললাইনের যে বক্স কালভার্ট রয়েছে সেটি বন্ধ করে দিয়েছে রেলওয়ের নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অন্য দিকে ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিরসনে যে মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে সেই কাজ হচ্ছে না ফতুল্লা এলাকায়। মূলত এই দুই কারণেই গত কয়েক বছর ধরে এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
শামীম ওসমান এ সময় চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন বক্স কালভার্টের বাধা ভেঙে ফেলতে। এ ছাড়া তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্দেশ দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএনডি জলাদ্ধতার আরেক কারণ হলো ডিএনডি অধ্যুষিত খালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি খাল ডিএনডি প্রজেক্টের আওতাভুক্ত হয়নি। বাদ পড়া খালগুলোকে ছোট হিসেবে উল্লেখ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ছোট খাল যেগুলো আছে, সেগুলো প্রজেক্ট করার সময় হয়তো কোনো কারণে বাদ পড়ে গেছে। তবে যে কারণেই বাদ পড়ুক, খালগুলো ডিএনডি প্রজেক্টের আওতায় না আসায় বা দখলমুক্ত না হওয়ায় জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ বলছেÑ ডিএনডি অধ্যুষিত এলাকায় খালের মোট আয়তন ৯৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ডিএনডি প্রজেক্টের আওতায় এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৮৯ কিলোমিটার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিএনডি সেচ উপবিভাগের কার্যসহকারী মশিউর রহমান এই বিষয়ে জানান, ইসদাইরে খাল ছিল। সেটি ড্রেন হয়ে হয়ে আছে। সমস্যা হচ্ছে খালের পেপার দরকার হয়। ম্যাপে থাকতে হয়। কিন্তু ওই খালটির ক্ষেত্রে সেটি নেই। আগের আরএস ও সিএস জরিপের মধ্যে আমরা সেখানে খাল পাইনি। যেহেতু জলাবদ্ধতা রয়েছে, সেহেতু স্থানীয় বাসিন্দাদের বলা হয়েছে, তারা নিজেরা ঠিক করুক কিভাবে কী করবে, কারণ নকশা ছাড়া তো একটি জায়গায় লাল দাগ দেয়া যায় না।
ফতুল্লার পূর্ব লালপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাম্প হাউজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিস (ডিপিডিসি)। সম্প্রতি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত প্রায় ৩-৪ বছর আগে ফতুল্লার পূর্ব লালপুর খাদ এলাকায় একটি পাম্প হাউজ বসানো হয়। ওই পাম্প হাউজে বর্তমানে ৫০ ঘোড়ার একটি এবং ২৫ ঘোড়ার দু’টি পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে দু’টি পাম্প চলমান থাকলেও একটি বন্ধ রাখা হয়। এরপরও গত ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল জমেছে ৬২ লাখ টাকা। পাম্প বন্ধ হওয়ায় ওই সব এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।
ডিপিডিসির ফতুল্লা জোনের প্রকৌশলী মো: মাইনুদ্দিন বলেন, ৬২ লাখ টাকার মতো বিল জমেছে। পরিশোধ না করায় তা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফতুল্লা ছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। অনেকের বাসাবাড়িতে পানি ওঠার কারণে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে।
সিদ্ধিরগঞ্জ কদমতলী মধ্যপাড়া ও মধ্য পশ্চিমপাড়া এলাকার রাস্তাঘাটে হাঁটু পরিমাণ পানি। ড্রেনের ময়লা ও ডাইংয়ের কেমিক্যাল মিশ্রিত হয়ে কালো আলকাতরার মতো রঙ ধারণ করেছে আর এলাকাজুড়ে ছড়াচ্ছে ভয়ানক দুর্গন্ধ। পানি উঠেছে বেশির ভাগ বাড়ি ঘর, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ এলাকার সব ধরনের স্থাপনায়। বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছেন মানুষজন।
স্থানীয় বাসিন্দা শিহাব নয়া দিগন্তকে জানান, এলাকার রাস্তাটা উঁচু করার জন্য স্থানীয় কাউন্সিলর, মেয়র, সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে অনেকবার বলা হয়েছে। আমরা যে কী অবস্থায় আছি তাদের দেখার জন্য একটুও সময় নেই। ডিএনডির কাজ করে, কোটি কোটি টাকার কাজ করে। কিন্তু ছোট্ট একটা রাস্তা ৫ বছরেও উঁচু করার ক্ষমতা নেই।
জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের কারণে ক্ষোভ নিয়ে এলাকাবাসী জানান যে, তাদের এলাকায় মানুষ থাকতে চায় না; কোনো পরিবার যদি চলেও আসে তাহলে দুই এক মাসের মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। যে কারণে এলাকার অধিকাংশ বাড়ি ফাঁকা। মানুষজন না থাকায় এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। অনেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় শুরু করে এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে অনেকে ব্যবসায় ছেড়ে অন্যান্য পেশায় চলে গেছেন।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর আলী হোসেন আলা বলেন, ডিএনডি প্রকল্পের কাজের জন্য জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পাম্প বসানোর কাজ চলছে। আগামী ২০ দিনের মধ্যে জলাবদ্ধতা আর থাকবে না। জানা গেছে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গত তিন বছর ধরে চলছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পটির (দ্বিতীয় পর্যায়) কাজ। বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারদের প্রাপ্তি বিল পরিশোধ করতে না পারায় চলমান অধিকাংশ কাজ বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ঠিকাদারদের প্রাপ্তি বিল পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। এ দিকে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার নিচু এলাকা। ঠিকাদাররা কাজ না করায় ডিএনডির লাখ লাখ মানুষ সামনে আরো ভয়াবহ জলাদ্ধতার আশঙ্কা করছে। জানা যায়, ডিএনডির প্রায় ২২ লাখ বাসিন্দার দুই যুগের কৃত্রিম জলাবদ্ধতা আর অবর্ণনীয় দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান করতে সরকার ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট একনেক সভায় ৫৫৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প পাস হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রায় তিন বছর ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় ডিএনডির পুনঃউন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুমোদিত হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১,২৯,৯৯১ দশমিক ১৭ লাখ টাকা। মেয়াদ জুন ২০২৩ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৩৫০,৬১ দশমিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হলেও এডিপি অনুযায়ী প্রকল্পের অনুকূলে ৬,০০০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বরাদ্দ দেয়া অর্থ চার কিস্তিতে ছাড়ও দেয়া হয়েছে। চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরের অবশিষ্ট ২৯০,৬১ দশমিক ৬০ লাখ টাকা ছাড় চেয়ে প্রকল্প পরিচালক আবেদন করেছেন।

 



আরো সংবাদ