০৮ মে ২০২১
`

১৭ বছর পর বাবা মায়ের সন্ধান

-

ঢাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানো শেষে বাড়ি ফেরার পথে শিশুকালে হারিয়ে যাওয়া সবুজ ১৭ বছর পর বাবা-মায়ের সন্ধান পেলেন। মঙ্গলবার জনপ্রিয় রেডিও উপস্থাপক আর জে কিবরিয়ার ‘আপন ঠিকানা’ অনুষ্ঠানে সবুজকে নিয়ে আসেন বেসরকারি এনজিও ‘ফ্যামিলিজ ফর চিল্ড্রেন’-এর পরিচালক শিখা বিশ্বাস। সেখানে তাকে নিয়ে প্রচারিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তার পরিচয় এবং ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া গেছে। লাইভে কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে সবুজ আকুতি দিয়ে বলেন, ‘জীবনে একটাই চাওয়া, শুধু মায়েরে একবার মন ভইরা দেখতে চাই।’ সবুজ বর্তমানে সিরাজগঞ্জ খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। লকডাউন শেষে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে। সবুজ চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সুচিপড়া গ্রামের খলিল মেম্বার বাড়ির বাসু (বাশার বা বশির) মিয়ার ছেলে।
২০০৪ সালে ঢাকায় খালুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে চাঁদপুরের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় ডেমরা এলাকা থেকে হারিয়ে যান তিনি। এরপর দীর্ঘ দিন খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন সুচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের কাজী মাওলানা মোস্তফা কামাল এবং তার ছেলে হাসান মাহমুদ। মোবাইলে সবুজের মামা রাশেদ আলমও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সবুজের মামা রাশেদ আলম বলেন, ‘এই সবুজ ২০০৪ সালে হারিয়ে যাওয়া সবুজ। কারণ সবুজের দেয়া তথ্য অনুসারে তার অন্যান্য ভাইবোন, বাবা-মা, খালা-খালু এবং খালাতো ভাইয়ের নাম পুরোপুরি মিলে গেছে। তিনি বলেন, সে জানায় যে তার মায়ের নাম খোদেজা বেগম। পাঁচ ভাইবোন, বড় বোন শিউলি, তারপর সবুজ, এরপর ছোট বোন সাথী এবং ছোট ভাই শাকিব ও সাকিল। দাদা লাল মিয়া। তার দেয়া তথ্য হারিয়ে যাওয়া সবুজের তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে সবুজ তার দাদা লাল মিয়ার সাথে রাজধানী ঢাকাতে ফুফু এবং খালুর বাসায় বেড়াতে যান। খালুর বাসায় কয়েক দিন বেড়ানোর পর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তারা। বাড়ি ফেরার সময় তার খালা সবুজকে কিছু টাকা দেন খেলনা কেনার জন্য। বাড়ি ফেরার পথে খেলনার দোকান দেখে সবুজ বেঁকে বসেন ফুটবল কিনে দিতে হবে। দাদা লাল মিয়া তাকে বাড়ি গিয়ে খেলনা কিনে দেয়ার কথা বললেও তিনি নাছোড়বান্দা, খেলনা ছাড়া বাড়ি যাবে না। এতে দাদা লাল মিয়া রাগ করে একটু সামনে গেলে অগণিত মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে দাদা-নাতির বিচ্ছেদ হয়ে যায়। অনেক খুঁজেও দাদা নাতিকে না পেয়ে বাড়ি ফেরেন বুকে কষ্ট নিয়ে।
ওদিকে দাদাকে হারিয়ে একা হয়ে গিয়ে সবুজ বসে বসে কাঁদতে থাকেন। তখন এক মুদি দোকানদার সবুজকে বাসায় নিয়ে যান। পরদিন তিনি ডেমরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তাকে পুলিশের কাছে দিয়ে আসেন। সবুজের পরিবারের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় থানা পুলিশ ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’ নামের একটি এনজিওর কাছে সবুজকে হস্তান্তর করে। এনজিওটি কয়েক মাস তাদের কাছে রেখে সবুজের পরিবারের সন্ধান না পেয়ে আরেক বেসরকারি এনজিও ‘ফ্যামিলিজ ফর চিল্ড্রেন’-এর কাছে হস্তান্তর করে ২০০৫ সালে।
ফ্যামিলিজ ফর চিল্ড্রেনের পরিচালক শিখা বিশ্বাস জানান, সবুজ অনেক মেধাবী ছাত্র। তাই স্থানীয় স্পন্সরের সহযোগিতায় আমরা তাকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছি। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ খাজা ইউনুচ আলী ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়ন করছেন। মঙ্গলবার জনপ্রিয় রেডিও উপস্থাপক আর জে কিবরিয়ার ‘আপন ঠিকানা’ অনুষ্ঠানে সবুজকে লাইভে নিয়ে আসেন ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেনের পরিচালক শিখা বিশ্বাস। ভিডিওটি প্রচারের সময় সবুজের বাল্যকালের কিছু ছবিও প্রদর্শন করা হয়। এ সময় সবুজের দেয়া তথ্য হারিয়ে যাওয়া সবুজের তথ্যের সাথে মিলে যাওয়ায় এক ঘণ্টার মধ্যে কেশরাঙা গ্রামের রাশেদ আলম (সবুজের মামা) নিশ্চিত করেন সবুজ তার ভাগিনা। সবুজের মামা রাশেদ আলম বলেন, বিষয়টি আমার বোন এবং ভগ্নিপতি নিশ্চিত করেন এবং তারা হারিয়ে যাওয়া ছেলের সন্ধান পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে আছেন। সবুজের মা ও মামা খোরশেদ আলম জানান, লকডাউন শেষ হলেই যোগাযোগ করে আমরা সবুজের সাথে দেখা করব। তাকে বাড়ি নিয়ে আসব ইনশা আল্লাহ। এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছি।



আরো সংবাদ