১২ এপ্রিল ২০২১
`

রঙ পাল্টিয়েও গ্রেফতার এড়াতে পারেনি ঘাতক জাহাজ

দু’টি তদন্ত কমিটির গণশুনানিতে ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ
-

দুর্ঘটনার সময় ঘাতক কার্গো জাহাজের রঙ ছিল নীল। শীতলক্ষ্যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ সাবিত আল হাসানকে ধাক্কা দেয়ার পর ৩৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় গ্রেফতার এড়াতে রঙ পাল্টানো হয় সেই কার্গো জাহাজের। দেয়া হয় হালকা (অ্যাশ কালারের) রঙ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি কার্গো জাহাজ এমভি এসকেএল-৩-এর। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে আটক করা হয় ঘাতক জাহাজটি। এ সময় গ্রেফতার হয় জাহাজের চালকসহ ১৪ জন। কোস্টগার্ড পাগলা স্টেশনের একটি টিম এদের আটক করে।
কোস্টগার্ড পাগলা স্টেশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আশমাদুল ইসলাম বলেন, যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়ার পর দ্রুত কার্গো জাহাজটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় চলে যায়। সেখানে জাহাজটির রঙ বদলে ফেলা হয়। কার্গোটি গজারিয়ার কোস্টগার্ড স্টেশনের কাছাকাছি নোঙর করা ছিল। সেখানে অভিযান চালিয়ে কার্গো জাহাজ এসকেএল-৩ আটক করা হয়েছে। এ সময় কার্গোটির চালকসহ আটক করা হয়েছে ১৪ জনকে। কোস্টগার্ড জানায়, কোথাও কোনো দুর্ঘটনা, ডাকাতি বা দস্যুতার ঘটনা ঘটলেই আমাদের টহল টিমগুলোর সক্রিয় থাকে। লঞ্চডুবি ও হতাহতের ওই ঘটনায় কোস্টগার্ডের টহল টিম নজরদারি বৃদ্ধি করে।
তারা বলেন, ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড টিম জানতে পারে যে, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এলাকায় ঘাতক কার্গোটিকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত টহল টিম গজারিয়ায় পৌঁছে। কিন্তু দেখা যায় যে, ওই কার্গোটির রঙ পরিবর্তন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় কার্গোটি যে রঙ ছিল অভিযানের সময়কার কার্গোর রঙের অনেক পরিবর্তন। ভালো করে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয় যে, কার্গোটির গায়ের রঙ সম্প্রতি লাগানো। এরপরই টহল টিম ১৪ জন স্টাফসহ কার্গোটি আটক করে। কোনো কাগজপত্র তারা দেখাতে না পারলেও জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে এটিই সেই ঘাতক কার্গো। এরপরই আটক ১৪ জনসহ কার্গোটি আমরা মুন্সীগঞ্জ নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি।
গত রোববার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনাল থেকে সাবিত আল হাসান নামে লঞ্চটি অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট এলাকায় কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি নদীতে তলিয়ে যায়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ দিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩৪ যাত্রীকে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। মঙ্গলবার রাতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় মামলাটি করেন বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের উপপরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ট্রাফিক) বাবু লাল বৈদ্য।
মামলায় হত্যার উদ্দেশ্যে বেপরোয়া গতিতে পণ্যবাহী জাহাজ চালিয়ে লঞ্চটি ডুবিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলায় আসামি হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।
দু’টি তদন্ত কমিটির গণশুনানিতে ২৬ জনের সাক্ষ্য
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় কার্গো ‘এমভি-এসকেএল-৩’ জাহাজের ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ নামে মুন্সীগঞ্জগামী একটি লঞ্চ যাত্রীসহ ডুবে ৩৪ জন নিহতের ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের গঠিত দু’টি তদন্ত কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার গণশুনানি করেছে। শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে দুর্ঘটনাস্থল সৈয়দপুর কয়লাঘাট এলাকায় সকাল ১০টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটির কাছে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজন, বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শী ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
জানা গেছে, শীতলক্ষ্যায় কার্গো ‘এমভি-এসকেএল-৩’ জাহাজের ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ নামে মুন্সীগঞ্জগামী একটি লঞ্চ যাত্রীসহ ডুবে ৩৪ জন নিহতের ঘটনায় পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার গণশুনানি করে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুছ ছাত্তার শেখ। কমিটিতে সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) মো: রফিকুল ইসলাম। কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেনÑ নৌপরিবহন অধিদফতরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জসিম উদ্দিন সরকার, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) প্রধান প্রকৌশলী, নারায়ণগঞ্জ নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা, জেলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি (সদর এসি ল্যান্ড) হাসান বিন আলী, কোস্টগার্ড পাগলা স্টেশনের কমান্ডার আশমাদুল, বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের উপপরিচালক মোবারক হোসেন, উপপরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ট্রাফিক) বাবু লাল বৈদ্য। তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কমিটিকে দুর্ঘটনাস্থল এবং দুর্ঘটনাকবলিত নৌযান পরিদর্শন করে ১৯৭৬ সালের বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি/সংস্থাকে শনাক্ত করতে হবে। এ ছাড়া দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেবে। অপর দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি, সদর ইউএনও নাহিদা বারিক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গণশুনানিতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজন, বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শী ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। লঞ্চ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী সিরাজদিখান তালতলা এলাকার মুছা শেখের ছেলে মো: জাকির, মুন্সীগঞ্জ নয়াগাঁও এলাকার বাসিন্দা দুই বোন তানজিলা ও মনিরা আক্তার মুন্নি, আলো, লঞ্চের কেরানি মঞ্জুর আলী, মুন্সীগঞ্জ দক্ষিণ কোর্টগাও এলাকার রায়হান সরদার ইফাজ, নিহত রুনা আক্তারের চাচা মুন্সীগঞ্জের নুরুতলি কেওয়ার এলাকার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান, প্রত্যক্ষদর্শী নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা সেতুর শ্রমিক মো: হালিম, পূবালী সল্টের লেবার আলামিন সর্দার, মো: সাঈদ, মো: মামুন বেপারীসহ ২৬ জন দুর্ঘটনার বিবরণী তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির কাছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুছ ছাত্তার শেখ বলেন, গণশুনানি করলাম। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত কমিটি পরবর্তী সময়ে বসে নানা দিক পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেবো। কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে ৩৪টি মূল্যবান প্রাণ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। আমরা তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করি ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। আমরা যে ২৬ জন্য প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পেয়েছি তাদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছি কিভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে কী করণীয় সে বিষয়েও তাদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছি।



আরো সংবাদ