২৩ এপ্রিল ২০২১
`

ঢাকা ওয়াসার পিপিআই প্রকল্পের ৪৪৫ কোটি টাকা লুটপাট

দুদকের তদন্তে ধীরগতি
-

দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের কারণে ঢাকা ওয়াসার বিলুপ্ত হওয়া পিপিআই প্রকল্পের ৪৪৫ কোটি টাকা লুটপাটের বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। পিপিআই প্রকল্পের নামে এই লুটপাটের ঘটনায় দুদক অনুসন্ধান শুরু করলেও তা চলছে ধীরগতিতে। এ অবস্থায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড পরিচালিত ঢাকা ওয়াসার পিপিআই প্রকল্পটি নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর পরই দীর্ঘ ২২ বছর ধরে পরিচালিত এই প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা লুটপাটের বিষয়টি উঠে আসে। এ প্রকল্পের কর্মকর্তারা লুটপাট করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তাদের বিরুদ্ধে পিপিআই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ গড়ার অভিযোগ ওঠে।
সূত্র জানায়, পিপিআই প্রকল্পে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে। পিপিআই প্রকল্পে দুর্নীতির ব্যাপারে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি সিবিএ নেতা সাহাবুদ্দিন সরকার দুদকে একটি অভিযোগ দাখিল করেন। এর পরিেেপ্রক্ষিতে ১ এপ্রিল দুদকের পক্ষ থেকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়। একই সাথে দুদক বিষটি নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব ভট্টাচার্য বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয় অনুসন্ধানের জন্য দুদকের একাধিক টিম কাজ করেছে। তারা প্রাথমিকভাবে সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেন। একই সাথে দুদক অনুসন্ধান করছে। এ দিকে দুদকের নির্দেশের পর ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকা ওয়াসার এমডির স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পিপিআই কর্তৃপক্ষের কাছে ২২ বছরের আয়-ব্যয়, পরিসম্পদ ও দায়ের তথ্য প্রেরণের জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব দাখিল করেননি তখনকার পিপিআই প্রকল্পের কর্মকর্তারা।
ওয়াসার এমডি স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ৪৪৫ কোটি টাকা ওয়াসা থেকে পিপিআই প্রকল্পের জনতা ব্যাংকের কাওরানবাজার করপোরেট শাখায় (চলতি হিসাব নং-২০০০২৬৩৪৬) জমা দেয়া হয়েছে। এই হিসাব থেকে নিয়মিত লাইফলাইন শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের এক্সিম ব্যাংকের (চলতি হিসাব নং-০৮৮১১১০০০১৬৮৪১) অ্যাকাউন্টে এবং বনলতা কর্মদক্ষতা উন্নয়ন শ্রমজীবী সমিতির এনবিএল অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানান্তরিত টাকা পিপিআই প্রকল্পের একটানা ২২ বছর ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকা হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়া ও অন্যান্য কর্মকর্তা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া পিপিআই প্রকল্প বিলুপ্ত হওয়ার প্রাক্কালে তার (হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়া) কাছে গচ্ছিত নগদ টাকারও হিসাব দেননি। ওয়াসার রাজস্ব পরিদর্শক ও পিপিআই প্রকল্পে প্রেষণে নিযুক্ত ক্যাশিয়ার হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়া প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা ২২ বছর একই দায়িত্বে ছিলেন। আয়-ব্যয়ের হিসাব, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ-বদলি মূলত তিনি করতেন। তার বেতনের সাথে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন পিপিআইর চেয়ারম্যানের সব অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়া জানার কারণে তাকে এই পদ থেকে কখনো অপসারণ করা হয়নি। তিনি পিপিআই প্রকল্পে অর্ধশতাধিক আত্মীয়স্বজনকে চাকরি দিয়েছেন। যারা এখনো ওয়াসায় কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার কথা থাকলেও নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি।
সূত্র জানায়, পিপিআইর ক্যাশিয়ার হওয়ার সুবাদে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও কোটি কোটি টাকার মালিক তিনি। জানা গেছে, তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়ায় একাধিক ফ্ল্যাট, উত্তরার রানাবুলায় ১০ কাঠার প্লট। মিরপুরে ৫ কাঠা জমিতে ওয়াসার রাজস্ব জোন-৬ এর রাজস্ব পরিদর্শক খায়রুল হাসান নিপুর সাথে যৌথভাবে বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। রাজারবাগে ১১ শতাংশ, কমলাপুরে ১১ শতাংশ, চন্দ্রপাড়া মৌজায় ৬৬ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। এ ছাড়া সাভারে তিন দাগে কেনা ১১৪ শতাংশ জমি ২০১২ সালে এক লাখ ১০ হাজার টাকা শতাংশ দরে একটি সমিতির কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তার নিজ এলাকা চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে দীঘিসহ ১৩ একর জায়গা কিনেছেন। রাজশাহীতে রয়েছে একাধিক আম বাগান। এ ছাড়া তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে রিসোর্টের মালিক। সাভারে ওয়াসার রাজস্ব পরিদর্শক জিপি সরকারের সাথে যৌথভাবে ওয়াশিং প্লান্ট ও গার্মেন্ট রয়েছে। তবে সম্পদের বেশির ভাগই তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা। নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা রেখেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে এ বিষয় কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি ওয়াসার এমডির সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।



আরো সংবাদ