১৯ এপ্রিল ২০২১
`

কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে হাওয়া হয়ে যেত চক্রটি

১১টি ব্যাংক-লিজিং কোম্পানির সাথে প্রতারণা : সংশ্লিষ্টতায় চাকরি হারিয়েছে ৪৪ ইসি কর্মচারী
-

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে ফ্ল্যাট মালিক কিংবা ক্রেতা সেজে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিত একটি চক্র। এরপর ঋণ ফেরত দেয়ার সময় এলে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যেত না। এভাবে চক্রটি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে হাওয়া হয়ে যেত। যে এনআইডি জাল করে ঋণ নেয়া হতো তার কাছে গেলেই টনক নড়ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। ততক্ষণে টাকা নিয়ে হাওয়া চক্রটি। জাতীয় পরিচয়পত্র পরিবর্তন করে তাদের এই জালিয়াতির কাজে সহায়তা করত নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা।
অভিনব পন্থায় প্রতারণা করা এমনই এক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চক্রটি এ পর্যন্ত ১১টি ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির সাথে প্রতারণা করেছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। এর আগে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ডিবির মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনাল টিম। গ্রেফতারকৃতরা হলেনÑ মূল হোতা আল আমিন ওরফে জমিল শরীফ, খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুৎ, আব্দুল্লাহ আল শহীদ, রেজাউল ইসলাম ও শাহজাহান। তাদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ভুয়া এনআইডি, টিনসহ অন্যান্য তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গত বছরের ডিসেম্বরে খিলগাঁও ও পল্টন থানায় মামলা হয়। এ মামলা তদন্ত শুরু করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে একজনকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে। ১ মার্চ আদালতে সে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। পরে অন্য পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ চক্রের মূল হোতা আল আমিন। বিদ্যুৎ ও আল আমিন তাদের অন্য সহযোগীদের প্রয়োজন অনুয়ায়ী কখনো ক্রেতা আবার কখনো বিক্রেতা, কখনো জমির মালিক, কখনো বা ফ্ল্যাটের মালিক সাজায়। আব্দুল্লাহ আল শহীদ ভুয়া এনআইডি তৈরির মিডলম্যান হিসেবে কাজ করে। রেজাউল ইসলাম ও শাহজাহান ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট তৈরি করে।
হাফিজ আক্তার আরো বলেন, চক্রটি কৌশলে কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকের কাছে থেকে ফ্ল্যাট কিনবে বলে তার এনআইডি ও অন্যান্য কাগজ নিয়ে নেয়। এরপর নির্বাচন কমিশনের অসাধু কর্মচারীদের সহযোগিতায় এনআইডির সব তথ্য ঠিক রেখে শুধু ছবি পরিবর্তন করে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক যখন এনআইডি সার্ভারে যাচাই করতে যায়, তখন সব তথ্য সঠিক পায়। সার্ভারের এসব তথ্য দেখে আশ্বস্ত হয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং ঋণ অনুমোদন করে।
এসব প্রতারণায় ব্যাংকের কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের যারা জড়িত আছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ৪৪ কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে ডিবি পুলিশকে জানানো হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানা ও পল্টন থানায় পৃথক দু’টি মামলা রুজু হয়েছে। চক্রটি একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক কোটি ৭০ লাখ টাকা নিয়ে হাওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
যেভাবে প্রতারকরা ব্যাংকের চোখে ফাঁকি দেয় : প্রথমে প্রতারকরা ব্যাংকে যায়, গিয়ে বলে তারা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নেবে। তখন ব্যাংক মূল ওই ফ্ল্যাট ভিজিট করতে চাইলে প্রতারকরা ব্যাংকারসহ ফ্ল্যাট দেখতে যায়। প্রতারকরা আগে থেকেই তাদের নিজস্ব লোক ঠিক করে রাখে। তারপর ব্যাংকের লোকসহ ফ্ল্যাট ভিজিটে গেলে ব্যাংক সবকিছু ঠিক দেখতে পায়।
পরবর্তী সময়ে প্রতারক দল ফ্ল্যাটের মালিকের কাছ থেকে এনআইডি ও ফ্ল্যাটের কাগজপত্রের ফটোকপি নিয়ে আসে। তারপর প্রতারকরা ফ্ল্যাট মালিকের এনআইডি হুবহু নকল করে শুধু ছবি পরিবর্তন করে এনআইডি তৈরি করে। যে এনআইডি আবার সার্ভার বা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেখা যায়। ব্যাংকের কর্মকর্তারা এনআইডি সার্ভারে সার্চ দিলে তা সঠিক দেখতে পায়। এরপর ব্যাংক প্রতারকদের অফিস ভিজিটে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতারকরা অফিস ভাড়া নেয় এক-দুই মাসের জন্য। ব্যাংকের লোক প্রতারকদের অফিস ভিজিটে গিয়ে অফিস গোছানো এবং সব ঠিক আছে দেখতে পায়। তারপর ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করার দিন ব্যাংকের লোক উপস্থিত থাকে। যেহেতু ফ্ল্যাট ভিজিট করেছে, এনআইডি সার্ভারে এনআইডি সঠিক পেয়েছে, ওদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সঠিক পেয়েছে, সব কিছু ঠিক দেখে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন হওয়ার দু-এক দিন পর লোনের পে-অর্ডার দিয়ে দেয় ফ্ল্যাটের সাজানো ক্রেতা-বিক্রেতাকে। পরবর্তী সময়ে যখন লোনের কিস্তি পরিশোধ করে না তখন তারা প্রতারকদের দেয়া এনআইডির বিস্তারিত দেখতে গেলে ব্যাংক বুঝতে পারেন যে, তারা প্রতারিত হয়েছেন।



আরো সংবাদ