০৪ মার্চ ২০২১
`

কেরানীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জালজালিয়াতি, রাজস্ব লুটের রমরমা কারবার

-

ঢাকার কেরানীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল জালজালিয়াতি ছাড়াও রাজস্ব লুট করছে একটি চক্র। কিছু দলিল লেখক ও দুই সাব-রেজিস্ট্রার এ চক্রের মূল হোতা বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, কেরানীগঞ্জে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম ও জালজালিয়াতি করে জমির দলিল করার অভিযোগ করেছেন অনেকেই। এ ছাড়া সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দাতা-গ্রহীতাকে ভয় দেখিয়ে প্রভাবশালী এক নেতার নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব লুট করছে কিছু দলিল লেখক ও দুই সাব-রেজিস্ট্রার। এমনকি নামজারি নেই, তারপরেও হচ্ছে দলিল। পাওয়ার নামার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রকৃত মালিকের জমি দখল ও দলিলের ফটোকপি দিয়ে আবার দলিল করা। এ ছাড়া ডিক্লারেশন, বায়না, পাওয়ার দলিলপ্রতি সরকারি প্রদত্ত ফি বাদে সাব-রেজিস্ট্রার উৎকোচ গ্রহণ করেন সর্বনিম্নœ দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
অপর দিকে হস্তান্তর দলিলের ক্ষেত্রে সরকারি ফি বাদে মূল্যের ০.৫ শতাংশ আদায় করা হয় দলিল লেখকদের মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব লুটের মূল হোতা দলিল লেখক বিশ্বজিৎ সরকার। তার সনদ নম্বর ৬৩ ও তার সহকর্মী স্বপ্ন কুমার মণ্ডল পংকজ। এ ছাড়া আরো বেশ ক’জন রাজস্ব লুটে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ২৩ জানুয়ারি প্রায় ১১ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে একটি দলিল হয়েছে। দলিল নম্বর ৭৭০। নাল জমি আমন মূল্য লিখে এমনটা করা হয়। জমির দাতা-গ্রহীতা কোনো কিছু বলতে নারাজ। তারা বলেন, কেরানীগঞ্জে এমন এক প্রভাবশালী নেতার ভয় দেখানো হয়েছে যে, আইনকে শ্রদ্ধার কথা ভুলে গেছি। গত বছরের ১৭ নভেম্বর আইজিআর বরাবর দরখাস্ত করেছেন মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি দরখাস্তে উল্লেখ করেছেন যে, দলিল নং ১০০৪২, তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ এবং দলিল নং ১৩৫৭, তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ মোতাবেক দুইটা মিথ্যা পাওয়ার তার নামে করছে একটি চক্র। উক্ত জায়গাজমি দখলের পাঁয়তারা করছে চক্রটি। তিনি এ-ও উল্লেখ করেছেন যে, তার বড় ভাইয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে এনআরবিসি ব্যাংক ধানমন্ডি শাখায় বন্ধক রয়েছে। অথচ চক্রটি ভুয়া পাওয়ার নামা তৈরি করে তার ফ্ল্যাট ও ভবনটি দখল করার পাঁয়তারা করছে। তা ছাড়া তার নামে ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে এমনটা করছে। মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার মৃত্যুঞ্জয় শিকারি ও দলিল লেখক একটি চক্র জড়িত এ ধরনের কাজে। বহুবার তার কাছে ধর্ণা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। পরে আইজিআরের নলেজে দিলে ওই পাওয়ার বাতিল করা হয়। মডেল থানা এলাকার এক বাসিন্দা নাম-ঠিকানা প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার আটতলা ভবনটি তিন কোটি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন গত বছর। দলিল করতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখক দুই কোটি ২০ লাখ টাকায় দলিল করতে বাধ্য করান। এতে সরকারের প্রায় ২৮ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্ট্রার। মডেল থানা এলাকার আরেক বাড়িওয়ালা জানান, তার সাততলা বাড়িটি বছর দুই আগে বিক্রি করেন দুই কোটি ৭০ হাজার টাকা। দলিলে উল্লেখ করা হয় এক কোটি টাকা। এসব বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখক প্রভাবশালী এক নেতার ভয় দেখায়।
একাধিক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলিল লেখক বিশ্বজিৎ সরকার ও তার সহকর্মী পংকজ নামজারি, পাওয়ার, দলিলের ফটোকপি ও দাতা-গ্রহীতাকে উপস্থিত না করে সাব- রেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ করে প্রভাবশালী এক নেতার নাম ভাঙিয়ে রাজস্ব লুট করছে। এ ছাড়া হেবা দলিল, পাওয়ারের নামে দাতা-গ্রহীতাকে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। তার বিরুদ্ধে কথা বললে প্রভাবশালী ওই নেতাকে বিচার দেয়। এমনকি কারো বিরুদ্ধে গেলে তারা সব দলিল লেখককে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করান। তারা বলেন, বিশ্বজিৎ সরকার এ যাবৎ যত দলিল করছেন তা খতিয়ে দেখা হলে তার প্রমাণ মিলবে। এমনকি তার সহকারী স্বপন কুমার মণ্ডল পংকজের ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে সনদ দিতে সহযোগিতা করছে সাব-রেজিস্ট্রার ও প্রভাবশালী ওই নেতা ছাড়াও জেলা সাব- রেজিস্ট্রার। দলিল লেখক সনদ পেতে এইচএসসি সার্টিফিকেট ও কম্পিউটার সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক। তা অনেকেরই নেই। আর পংকজ তো জাল সার্টিফিকেট দিয়ে সনদ নিয়েছেন।
এ দিকে কেরানীগঞ্জে জমির একাধিক দালাল ও ডেভেলপার জানান, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিল লেখকরা জমি, ভবন ও ফ্ল্যাটের দলিল করছে। তাদের কথা না শুনলে প্রভাবশালী এক নেতার ভয় দেখানো হচ্ছে। তাই তারা তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ মডেলের সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গনি মণ্ডলের সাথে বারবার চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দক্ষিণের সাব-রেজিস্ট্রার মৃত্যুঞ্জয় শিকারি এ প্রতিবেদককে বলেন, তার সহকর্মী কিছু হলুদ সাংবাদিক দিয়ে তাকে হেনস্তা করছেন। দলিলের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম করা হয়নি বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে আই জি আর শহিদুল আলম ঝিনুক নয়া দিগন্তকে বলেন, কোনো-অনিয়ম দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।



আরো সংবাদ