২০ অক্টোবর ২০২০
ঢাবিতে সাদা দলের মানববন্ধন

ড. মোর্শেদকে আইন লঙ্ঘন করে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে

-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন লঙ্ঘন করে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু ড. মোর্শেদ নয় এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কুঠারাঘাত করা হয়েছে। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই মন্তব্য করেন। ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানকে বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে এই মানববন্ধন হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সাদা দলের আহবায়ক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। মানববন্ধন পরিচালনা করেন সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ড. মো: হাসানুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, অধ্যাপক মো: আলামিন প্রমুখ।
এ সময় অন্যানের মধ্যে অধ্যাপক ড. মুজাহিদুল ইসলাম, ড. এহসান মাহবুব যুবায়ের, আবুল কালাম সরকার, মো: শহীদুল ইসলাম, ড. গোলাম রব্বানী, এম এম কাউসার, মো: মিজানুর রহমান, ড. মো: সাইফুল্লাহ, ইসরাফিল প্রামাণিক রতন, মো: নুরুল আমিন, মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রায় শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্তবুদ্ধির লালন ও চর্চার কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ঐতিহ্য। কিন্তু আমরা হতাশা ও উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সুমহান ঐতিহ্যটি নস্যাৎ হতে চলেছে। ড. মোর্শেদ হাসান খান মার্কেটিং বিভাগের একজন অধ্যাপক। একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধের সূত্র ধরে উদ্ভূত প্রতিক্রিয়া ও পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল প্রথমে তার বিরুদ্ধে একটি শাস্তির সুপারিশ করেছিল। কিন্তু একটি মহল এটি জানতে পেরে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার জন্য এ বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের ব্যবস্থা করে। একটি সংগঠন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিলও করে এবং একটি পরিস্থিতি তৈরি করে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে গত ৯ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় ড. মোর্শেদ হাসান খানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬ ধারার ৩ উপধারা এবং ১ ম স্ট্যাটিউটের ৪৫ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ, অদক্ষতা এবং চাকরিবিধি পরিপন্থী কাজের সাথে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা যায়। ড. মোর্শেদ ওই রূপ কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত নন। ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ঢাবি পরিচালিত হয় ১৯৭৩ সালের আদেশে। ওই আদেশের ৫৬ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা রাজনীতি করার তথা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার রাখেন। একটি দৈনিক পত্রিকায় লিখিত একটি নিবন্ধে কিছু বক্তব্যের কারণে (নিবন্ধটি প্রত্যাহার, দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা সত্ত্বেও) তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদানের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক।
এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত চাকরিবিধিরও সুস্পষ্ট ব্যত্যয়। এটি স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিশ্ববিদ্যালয়ের সুমহান ঐতিহ্যেরও পরিপন্থী।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ঐতিহ্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নির্ধারিত আইন ও প্রচলিত বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে শুধু ভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের অনুসারী হওয়ায়, কেবল ভিন্ন মতের প্রতি আক্রোশের কারণেই সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে ড. মোর্শেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। আমরা এ ধরনের নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা এ সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। ড. মামুন আহমেদ বলেন, কেবল কিছু মানুষের অযৌক্তিক দাবির কাছে নত হয়ে ড. মোর্শেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এমন অমানবিক আচরণ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করতে পারে তা বিশ্বের কোনো দেশে আছে বলে বিশ্বাস করি না। শুধু দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের প্রতি চরম অন্যায় করা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কুঠারাঘাত করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে সব শিক্ষককে প্রতিবাদ করতে হবে। শুধু ব্যক্তি মোর্শেদ নয় এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদার প্রতি কুঠারাঘাত।
ড. মো: হাসানুজ্জামান বলেন, শুধু দলীয় কারণে ড. মোর্শেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এভাবে একদলীয়ভাবে কাউকে স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হলে ভবিষ্যতে আরো খারাপ খবর শুনতে হবে। অবিলম্বে ড. মোর্শদকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার জন্য দাবি জানান মো: হাসানুজ্জামান।
অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ড. মোর্শেদকে অব্যাহতি দেয়ার মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও শিক্ষক সমাজের প্রতি অন্যায়।
ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ ও স্ট্যাটিউটে কলঙ্ক লেপন করা হলো ড. মোর্শেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার মাধ্যমে। আদেশ লঙ্ঘন মানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও অপমান করার শামিল। এটি বহাল থাকলে ভবিষ্যতেও কিন্তু ঢাবির আদেশের অপব্যবহার করা হতে পারে।


আরো সংবাদ