০৯ আগস্ট ২০২০
নেপথ্যে শাসক দলের চাঁদাবাজি

দুর্ভোগের আরেক নাম কাওটাইল খেয়াঘাট

-
24tkt

ঢাকার কেরানীগঞ্জের কাওটাইল ব্রাহ্মণগাঁও জাজিরা ও মোল্লা বাজারের অসংখ্য নারী-পুরুষের যাতায়াত কাওটাইল খেয়াঘাট দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা তথা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এক সময় এই ঘাটে পারাপারের জন্য ছোট ছোট নৌকা ছিল। যুগের আধুনিকায়নে ইঞ্জিনচালিত মাঝারি সাইজের ট্রলারে মানুষ পারাপার হচ্ছে। এতে স্বল্প সময়ে নদী পার, নৌ দুর্ঘটনা এড়ানো, বড় ঢেউ প্রতিরোধসহ অনেক উপকার হয়েছে। কিন্তু শত শত সিএনজি, ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশা, অবৈধ দোকান, মাদক বিক্রি, ছোট ছোট ঘর তুলে রাতে দেহ ব্যবসার মতো অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঐতিয্যবাহী এই কাওটাইল খেয়াঘাটে। সবই হচ্ছে শাসক দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা ও নেত্রীর নেতৃত্বে। খেয়াঘাটে অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড বানিয়ে এক নেত্রী টাকা আদায় করছে প্রতিমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে। এসব কারণে থানা আওয়ামী লীগ যেমন অসন্তোষ তেমনি প্রতিদিন নাজেহাল হচ্ছে নিরীহ মানুষ, অটোরিকশা ও সিএনজি চালক। গতকাল রোববার কেরানীগঞ্জের কাওটাইল ব্রাহ্মণগাঁও জাজিরা ও মোল্লাবাজারে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
কাওটাইল খেয়াঘাট দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পারাপার হওয়া যাত্রী আনোয়ার হোসেন, সেকান্দার ও মমিন জানান, প্রতি বছর কাওটাইল খেয়াঘাট নিলামে নারায়ণগঞ্জের একজন ক্ষমতার নেতার লোকেরাই পেয়ে থাকে। এ কারণে বারবারই ওপারের লোকদের কাছে এই ঘাটের ইজারাদার চলে যাচ্ছে। এ জন্য তাদের ইচ্ছে মতো ভাড়া নির্ধারণসহ যেনতেন ব্যবহার করে যাচ্ছে পারাপার হওয়া প্রতিটি যাত্রীর সাথে। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই। আজ ট্রলার দিয়ে রিজার্ভ পার হওয়ার সময় ত্রিশ টাকা চাইলে আমরা জিজ্ঞাসা করায় মাঝি বলল ঘাট জমা বাড়াইছে। আগে দশ টাকার জায়গায় ঘাট জমা বাড়াইছে দিনপ্রতি বিশ টাকা। আর দশ টাকা ভাড়া বাড়াইছে খ্যাপপ্রতি। লোকালে পারাপারের জন্য সাধারণ মানুষের জনপ্রতি তিন টাকার পরিবর্তে পাঁচ টাকা করা হয়েছে। আবার রাত দশটার পর প্রায়ই পাঁচ টাকার পরিবর্তে দশ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হয়। আমরা জানি এ সবই ইজারাদার গোষ্ঠীর ইচ্ছা ও স্থানীয় কয়েকজন পাতি নেতার জোর জুলুমে হয়। আমরা এভাবে আর কত সহ্য করব।
সরেজমিন দেখা যায়, কাওটাইল খেয়াঘাট দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় যাওয়ার জন্য যাত্রীরা ট্রলারে ওঠানামা করছে। ঘাট থেকে মূল সড়কে যেতে যাত্রীদের পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। ঘাটের পাশেই নদী দখল করে গড়ে উঠেছে হাইস্প্রিট লঞ্চ কোম্পানির ডকইয়ার্ড। ঘাটের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়ায় দেয়া হয়েছে চায়ের দোকান, রিকশার গ্যারেজসহ বেশ কয়েকটি দোকান। একপাশে পড়ে আছে ময়লার স্তূপ এ কারণে দুর্গন্ধে নাক চেপে চলাচল করতে হয় স্থানীয়দের। ঘাটের অন্যপাশে রয়েছে পাবনা মসজিদ সেটিও দখল থেকে রক্ষা পায়নি। ঘাট এলাকায় দোকানঘর স্থাপিত হওয়ায় সড়কের একাংশ দখল হয়ে গেছে। ফলে সড়ক সরু হওয়ায় যানজট সেখানে নিত্যদিনের ঘটনা।
কোন্ডা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা রাবেয়া ইয়াসমিনসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন নাম না বলা শর্তে অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় আলেক মিয়া এবং তার ভাই জাহাঙ্গীর কাওটাইল ঘাট দখল করে স্থায়ী স্থাপনা তুলেছেন। ফারুকসহ কয়েকজনকে এসব স্থাপনায় দোকান ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে অর্ধলক্ষ টাকা আদায় করছেন। নিজে একটি ঘর দখলে রেখে সেখানে রাতে দেহ ব্যবসা পরিচালনা করছে। তার ভাই জাহাঙ্গীর খেয়াঘাটের একটি ঘরে বসে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য আলেক মিয়া এবং তার ভাই জাহাঙ্গীরকে পাওয়া যায়নি। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।
অন্য দিকে খেয়াঘাটের সিএনজি চালক মোতালেব, লিটন, শরীফ ও আকতারসহ কয়েকজন সিএনজি চালক অভিযোগ করে বলেন, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা রাবেয়া ইয়াসমিন খেয়াঘাটের রাস্তা দখল করে অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড বানিয়ে প্রতিদিন শতাধিক সিএনজি ও অটো রিকশার থেকে বিশ টাকা করে চাঁদা করছে। টাকা না দিলে গাড়ি আটক থেকে শুরু করে চলে নানা রকম নির্যাতন। এ ব্যাপারে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাবেয়া ইয়াসমিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কাওটাইল খেয়াঘাটে মাটি ভরাট করে ঘাটের জায়গা বড় করেছি। আমার দুইটা কিডনি নষ্ট তাই প্রতিমন্ত্রী আমাকে এই ঘাট দেখা শোনার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি প্রতিদিন বিশ টাকা করে চাঁদা আদায় করার কথা স্বীকার করেন।
কোন্ডা ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ পলাশ নয়া দিগন্তকে বলেন, কাওটাইল খেয়াঘাট দখল করে আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে আলেক মিয়া ও তার ভাই জাহাঙ্গীরসহ যারা মাদক বিক্রি, দেহ ব্যবসাসহ শত শত অপকর্ম করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তারা আসলে আওয়ামী লীগের কেউ নয়। তাদেরকে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ পছন্দ করেন না। তাদের কারণে পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান চৌধুরী ফারুকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কাওটাইল খেয়াঘাট দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উঠানো বা অসামাজিক কার্যকলাপের ব্যাপারে আমার জানা নেই, ঘটনা সত্য হলে আমি আপনাদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এবং বিষয়টি আমি নিজেও খতিয়ে দেখব। নদীবন্দরের পাশে একটি ব্যস্ততম খেয়াঘাটে এত দুর্ভোগের কারণ জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর পোর্ট অফিসার এ কে এম আরিফুর রহমান বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।


আরো সংবাদ