১২ জুলাই ২০২০

জনপ্রতিনিধিরা কোণঠাসা

আমলাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিকার নেই; অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বরখাস্ত
-

করোনা পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। গত তিন মাসে ৭৪ জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সরকারের এমন কঠোর পদক্ষেপের সুযোগ নিচ্ছে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। মাঠ পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছেন তারা। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে জনপ্রতিনিধিদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১২ সালের একটি মামলা সামনে এনে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ইউএনওদের দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৪ মে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু তাহিরের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছাড়াই ভবন ভাঙা, দুর্যোগ মোকাবেলা তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণের নামে পাঁচ লাখ টাকা তুলে এককভাবে ব্যয় করা এবং কৃষকের উপস্থিতি ছাড়াই লটারি করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বদলগাছী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম খান। এ ঘটনার চার দিন পর গত ১৮ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-১ শাখা থেকে উপসচিব নুমেরী জামান স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।
ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ডিএম এনামুল হক গত ১৪ মে নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো: শামসুল আলম খানের বিরুদ্ধে বদলগাছী থানায় জিআর ২/১১(বদল), তারিখ ০৩ জানুয়ারি ২০১১ মামলা রয়েছে যা নওগাঁর বিজ্ঞ দায়রা জজ, দ্বিতীয় আদালতে বিচারাধীন (মামলা নম্বর ৪২৮/১১ দায়রা)।
প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ মে উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ [উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১১] এর ১৩ (খ) ধারা অনুযায়ী শামসুল আলম খানকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং প্যানেল চেয়ারম্যান-১-কে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে নিজে কিছুই জানেন না মুক্তিযোদ্ধা ডিএম এনামুল হক। তিনি গতকাল মঙ্গলবার নয়া দিগন্তকে বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কে বা কারা আমার নাম ব্যবহার করে অভিযোগটি দিয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম খান বলেন, যে অভিযোগে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তা ২০১১ সালের ঘটনা। ওই অভিযোগে যদি আমাকে বরখাস্ত করা হয়, তাহলে ২০১৯ সালে ভোট করতে দেয়া হলো কিভাবে। আমার প্রার্থিতা বাতিল হলো না কেন? তিনি বলেন ইউএনওর স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করায় এভাবে আমাকে হেনস্তা করা হচ্ছে। জানতে চাইলে ইউএনও মুহা. আবু তাহির নয়া দিগন্তকে বলেন, উনি আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। এরপরে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে সরকার সে বিষয়টি আমাকে অবহিত করেছে।
এদিকে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে উপজেলার চেয়ারম্যানসহ ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। সকল বরাদ্দে তার ঘুষ গ্রহণের ঘটনা ওপেন সিক্রেট। এমনকি গরিব মানুষের জন্য সরকারের অতিদরিদ্র কর্মসূচিতেও তিনি ১৫ শতাংশ ঘুষ নেন বলে অভিযোগ আছে। ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের (১%) বরাদ্দ ৯ মাস ধরে জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদে বন্ধ রেখেছেন তিনি। ওই ইউএনওর প্রতি জেলা প্রশাসকের আশীর্বাদ থাকায় তিনি এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগ দেন হুমায়ুন কবির। ৩০ ব্যাচের এই কর্মকর্তা এর আগে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেভিনিও ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়াও রায়পুরা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসেও কাজ করেছেন তিনি।
ইউএনও হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের প্রশ্রয়ে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎসহ সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ও পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকা-ের নামে ব্যাপক সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ আনে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি ইউনিয়নের সব চেয়ারম্যান। একই সাথে সরকারের সুনাম রক্ষায় দুর্নীতিবাজ ইউএনওকে বদলির দাবি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগ দায়ের করে।
লিখিত অভিযোগে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ন কবির ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ থেকে ১০ শতাংশ হারে, এলজিইডি শাখা থেকে ৫ শতাংশ হারে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছ থেকে ১৮ শতাংশ হারে, প্রতি নামজারিতে দুই হাজার টাকা, পৌরসভার উন্নয়নকাজে ২০ শতাংশ হারে, বালু উত্তোলনে ট্রাকপ্রতি ৫০০ টাকা সরাসরি ঘুষ গ্রহণ করেন।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য দুইবার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশনা দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ডিসির প্রভাব থাকায় কোনোবারই তদন্ত কর্মকর্তা তার দুর্নীতির কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
গত ২ ফেব্রুয়ারি আরেকটি অভিযোগে জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয় মন্ত্রিপরিষদের উপসচিব সাইফুল ইসলাম। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কারণে এবারো তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হবে না বলে আশঙ্কা ভুক্তভোগীদের।
জানতে চাইলে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান বলেন, হুমায়ুন কবির একজন আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ। প্রতিটি দফতরে তিনি ইচ্ছামাফিক কাজ করেন। ঘুষ না দিলে কোনো কাজ হয় না। এমনকি সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-েও তাকে ঘুষ দিতে হয়; অন্যথায় তিনি ফাইল আটকে রাখেন। আমার জীবনে অনেক ইউএনও দেখেছি; কিন্তু এমন দুর্নীতিবাজ অফিসার কখনো দেখিনি বলে হতাশা প্রকাশ করেন এই জনপ্রতিনিধি। জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির নয়া দিগন্তকে বলেন, যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা সঠিক নয়। নিয়ম মেনেই সব কাজ করা হয়েছে। কাজ করতে গেলে কিছু মানুষের বিরাগভাজন হতে হয়। এ জন্য তারা বিভিন্ন অভিযোগ আনে।
এদিকে কক্সবাজারের পেকুয়ায় ত্রাণের ১৫ টন চাল আত্মসাতের ঘটনায় এরই মধ্যেই তদন্ত শেষ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। গত ৪ মে দিনভর পেকুয়ার সব চেয়ারম্যান, ইউপি সচিব, পিআইও এবং উপজেলা কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য নিয়েছে তদন্ত কমিটি। এরপর গত ১০ মে দ্বিতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে অধিকতর শুনানির জন্য পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে তলব করা হয়। এরই মধ্যে পেকুয়া উপজেলার বহিষ্কৃৃত চেয়ারম্যান বাদে বাকি ছয় ইউপি চেয়ারম্যান ইউএনও সাঈকা শাহাদাতের কর্মকা- তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। একই অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক এবং সদস্যসচিবও।
সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি বেশ কয়েকজন বেসরকারি ভুক্তভোগীর বক্তব্যও নিয়েছেন। তারাও বিভিন্ন সময় পেকুয়ার আলোচিত উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ঘুষ দেয়ার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ দিয়েছেন লিখিতভাবে। এ ছাড়াও পেকুয়া উপজেলার বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান বাদে বাকি ছয় ইউপি চেয়ারম্যান সাঈকা শাহাদাতের কর্মকা- তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সম্মিলিত আবেদন করেছেন। এদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব যৌথভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের আবেদন জানান। তদন্তকারীদের কাছে সাক্ষ্য দেয়া বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায় তদন্ত কমিটির কাছে যত অভিযোগের তীর ইউএনওকে ঘিরেই।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ৬০ হাজার জনপ্রতিনিধির মধ্যে ৭৪ জন বরখাস্ত এটি খুব বড় বিষয় না। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের পাশে যেভাবে দাঁড়ানো দরকার সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে একটা তোষামোদের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে জনগণের সমস্যা তুলে না ধরে তোষামোদ করে যাচ্ছে। ফলে এসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমাদের এখন উচিত হবে স্বাস্থ্যসেবার অনিয়ম দুর্নীতির দিকে নজর দেয়া।

 


আরো সংবাদ