২৯ মার্চ ২০২০

আইনজীবীদের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও আন্দোলন

খালেদা জিয়ার জামিন
-

কারা হেফাজত থেকে ৭৭৬ দিন পর মুক্তি পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। ওই দিনই তাকে পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। সাজা ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা জানিয়ে ছিলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে তাকে বের করে আনা হবে। কিন্তু তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দু’বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেও সাফল্য পাননি। এরপর নি¤œ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল এবং জামিন আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট তাকে জামিন দেন। কিন্তু আপিল শুনানি শেষে সাজা বৃদ্ধি করে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। ফলে জামিন আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও খালেদা জিয়াকে সাত বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল ও জামিন আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে জামিন আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর আপিল বিভাগে জামিন আবেদন করা হলে আপিল বিভাগও তা খারিজ করে দেন। এর ফলে আইনি পথে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এরপর সর্বশেষ ফৌজদারি কার্যবিধি ৪০১(১) ধারায় প্রশাসনিক আদেশে সাজা স্থগিত করে ছয় মাসের জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় সরকার।
আইনজীবীরা আদালতে জামিন আবেদনের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিক্ষোভ-মানববন্ধন, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান। এ ছাড়া বারবার খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া বা ফৌজদারি কার্যবিধি ৪০১(১) ধারায় প্রশাসনিক আদেশে সাজা স্থগিত করে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি আইনজীবীরা আদালত অঙ্গন ও রাজপথেও আন্দোলন করেছেন।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম : আইনজীবীদের বৃহত্তর সংগঠন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক কমিটি গঠন হওয়ার পর থেকে সংগঠনটি আহ্বায়ক প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে আদালত অঙ্গনে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করে। এতে শত শত আইনজীবী অংশ নেন। বিক্ষোভ-মানববন্ধনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রশাসনিক আদেশে অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান। আইনজীবীদের এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী, আইনজীবী আবদুর রেজাক খান, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন, আইনজীবী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, তৈমূর আলম খন্দকার, আবেদ রাজা, সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, আইনজীবী এ বি এম রফিকুল হক তালুকদার রাজা, আক্তারুজ্জামান প্রমুখ।
এ বিষয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দীর্ঘ দিন থেকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্দোলন করেছি। সাত বছরের সাজায় একজন অসুস্থ ও বয়স্ক মহিলাকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জামিন না দেয়ায় উচ্চ আদালতের ভাবমর্যাদা দেশবাসীর কাছে চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে।
গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার মুক্তি আইনজীবী আন্দোলন : দীর্ঘদিন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কমিটি না থাকায় বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে তার মুক্তি দাবিতে আদালত অঙ্গনে বিএনপি ও সমমনা দলের সমর্থক আইনজীবীদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার মুক্তি আইনজীবী আন্দোলন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়ার পর থেকে তার মুক্তি দাবিতে সংগঠনটি আন্দোলন শুরু করে। এ সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। সাথে নিয়ে সংগঠনটির চেয়ারম্যান আইনজীবী তৈমূর আলম খন্দকার ও মহাসচিব এ বি এম রফিকুল হক তালুকদার রাজা ১০০টিরও বেশি কর্মসূচি পালন করেন। এসবের মধ্যে ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আইনজীবী সমাবেশ, সারা দেশের আইনজীবীদের সাথে মতবিনিময়, সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা, রাজপথে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, সুপ্রিম কোর্টে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ইত্যাদি। সংগঠনটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আনিছুর রহমান খান, সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের মহাসচিব আইয়ুব আলী আশরাফী দেশের সব জেলা বারে ঘুরে আইনজীবীদের সাথে মতবিনিময় করেন।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংগঠনটি মহাসমাবেশ করে। এতে বক্তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য প্রয়োজনে দেশের সব আইনজীবীকে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। মহাসমাবেশে অংশ নেন প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুর রহমান, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক সিনিয়র আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, শাহ আহমেদ বাদল, আবেদ রাজা, মো: শহীদুল ইসলাম, নাছিরউদ্দিন খান সম্রাট, সংগঠনটির মহিলা শাখার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকার প্রমুখ।
এ বিষয়ে সংগঠনের চেয়ারম্যান তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে বারবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জামিন যোগ্য মামলায় তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পাননি। অথচ তিনি জামিন পাওয়ার হকদার ছিলেন। তারপরও আমরা তার সাময়িক মুক্তিতে এখন স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলছি। বেগম খালেদা জিয়া এখন তার চাহিদা মতো চিকিৎসা নিতে পারবেন। তবে আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণ হয়নি। কারণ বেগম খালেদা জিয়াকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
সংগঠনের মহাসচিব এ বি এম রফিকুল হক তালুকদার রাজা বলেন, আমরা দীর্ঘ দিন থেকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছি। সরকার এখন তাকে মুক্তি দিয়েছে। দেরিতে হলেও সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। বেগম খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ার হকদার ছিলেন। আমরা চেয়েছিলাম আদালতের মাধ্যমে তার জামিন হবে। সরকার চাইলে তার জামিন হতো। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তিনি দ্রুত জামিনে বের হতে পারতেন।


আরো সংবাদ