০৬ এপ্রিল ২০২০

অনিরাপদ রেলযাত্রীরা, পাথর নিক্ষেপকারীরা ধরা পড়ছে না

উপবন এক্সপ্রেসের দুই যাত্রী রক্তাক্ত; পুলিশ বলছে অপরাধী ধরতে অভিযান চলছে
-

বাংলাদেশের রেলপথ অনেকটা ‘নিরাপদ’ হলেও এর যাত্রীরা এখনো অনিরাপদ অবস্থায় চলাচল করছেন। কখন, কোথায় যাত্রীরা চোর, ছিনতাইকারী আর পাথর নিক্ষেপকারীদের রোষানলে পড়ে যান, তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছেন না। মাঝে মধ্যে চলন্ত ট্রেনে যাত্রী রক্তাক্তের ঘটনা ঘটছে। অথচ যেসব দুর্বৃত্তের হাতে প্রতিনিয়ত যাত্রী হয়রানি ও রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে তারা বরাবরের মতোই রয়ে যাচ্ছে নাগালের বাইরে।
সর্বশেষ শনিবার রাতে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে এক সাংবাদিকসহ দুই যাত্রী পাথর নিপেক্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত হন। তাদের একজনকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। ঘটনার পর আহতদের মধ্যে একজনের বক্তব্য গ্রহণ করলেও কারা এ ঘটনার সাথে জড়িত তাদের শনাক্ত করতে পারেনি কমলাপুর জিআরপি থানা পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনীসহ কোনো সংস্থাই।
চলন্ত ট্রেনে বড় বড় পাথর ছুড়ে মারার ঘটনায় ট্রেনে বিভিন্ন গন্তব্যে পাড়ি জমানো নানা পেশার যাত্রীদের (জানালার পাশে বসা) প্রতিনিয়ত ‘পাথর’ আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীদের দাবি যেকোনো উপায়েই হোক তারা এর থেকে দ্রুত পরিত্রাণ চান।
উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে একজন সাংবাদিকসহ দুই যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনার বিষয়ে গতকাল রোববার সন্ধ্যার পর কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি রকিব উল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনার পর পরই আমরা ওই এলাকায় অভিযান চালিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ধরতে পারিনি। তবে চেষ্টা অব্যাহত আছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যে স্থানটিতে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানকার আশপাশে বস্তির বাসিন্দারা থাকে। সেখানে অনেকে ফাইজলামি করে পাথর নিক্ষেপ করে থাকে। আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ৮টা ৩০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি সিলেটের উদ্দেশে কমলাপুর রেলস্টেশন ত্যাগ করে। ট্রেনটি খিলগাঁও বাজার অতিক্রম করার কিছু পর ‘ট’ নম্বর বগির ৩৫ নম্বর সিটে বসা যাত্রীর মাথায় হঠাৎ একটি পাথর এসে পড়ে। সাথে সাথে যাত্রীর মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তাৎক্ষণিক ওই ট্রেনের যাত্রীরা বিষয়টি রেলওয়ে কন্ট্রোল রুমকে অবহিত করেন। পরে ট্রেনটি বিমানবন্দর রেলস্টেশনে গিয়ে থামলে তখন সেখানকার নিরাপত্তা পুলিশ ওই যাত্রীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে তার বক্তব্য গ্রহণ করে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আহত যাত্রী ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক মীম ওয়ালিউল্লাহ (৩৩) পাথর নিক্ষেপের ঘটনা জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, অল্পের জন্য আমি বেঁচে গেছি। আজ তো পাথর নিক্ষেপের কারণে মারাই যেতাম। ট্রেনটি কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময় আমি ট নম্বর বগির ৩৫ নম্বর সিটে বসা ছিলাম। ১০ মিনিট পর সম্ভবত ৮টা ৪০ মিনিটের সময় খিলগাঁও বাজার পার হওয়ার পরই বড় একটি পাথর এসে প্রথমে জানালার ওপরে আঘাত করে সোজা আমার মাথায় লেগে সেটি আবার ট্রেনের ভেতরের অন্য দিকে আঘাত করে। ওই সময় অন্য যাত্রীরা থাকলেও তাদের কারো গায়ে পাথর লাগেনি। আমার মাথা দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। ওই অবস্থায় বিমানবন্দরে গেলে তখন জিআরপি পুলিশ এসে আমার বক্তব্য নেন। এরপর চিকিৎসা করাতে পাঠান আমাকে। তিনি বলেন, আমরা এখন ট্রেন যাত্রীরা সম্পূর্ণ অনিরাপদ। একই ট্রেনের আমার সামনের বগিতে থাকা সিলেটগামী অপর এক যাত্রী একই সময়ে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন। শুনেছি তার হাতে লেগেছে। মাঝে মধ্যেই ট্রেনের পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে শুধু পাথর নিক্ষেপ নয়, প্রায় ট্রেনের ভেতর থেকে যাত্রীদের মালামাল চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটছে। যার বেশির ভাগই অভিযোগ দিচ্ছে না সাধারণ যাত্রীরা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে ট্রেনের মালামাল খোয়া গেলে সেটি ফিরে পাওয়া যায় না। তাই ভুক্তভোগীরা থানায় যান না।
গতকাল সন্ধ্যার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক এম শামসুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করার পরও তিনি টেলিফোন ধরেননি।
তবে ঢাকা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা রেলওয়েতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। এটেনডেন্টদের নির্দেশনা দেয়া আছে কিছু কিছু এলাকা দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় ট্রেনের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে। তারপরও প্রায়ই এসব ঘটনা ঘটছে। তার মতে, পাথর নিক্ষেপের মতো ভয়াহব ঘটনা যাতে না হয় সে জন্য সারা দেশের রেলপথে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বছরজুড়ে চলছে। তারপরও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছেই।
ক্ষুব্ধ যাত্রীরা বলছেন, যেসব স্থানে রেলকর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন ওই স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপের যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। তাদের অভিযোগ, ট্রেনে যাত্রীদের নিরপত্তা দেয়ার জন্য যাদের দায়িত্ব দেয়া হয় তারা বেশির ভাগ সময় ‘অন্য ধান্ধায়’ থাকে। শুধু চাকরি রক্ষার স্বার্থে তারা ট্রেনের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো কার্যক্রম সাধারণ যাত্রীদের চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ পুরনো। এর থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ট্রেনযাত্রা যাত্রীদের কাছে দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন ট্রেন চলাচল নিয়ে গবেষণা করেন এমন বিশ্লেষকরা।


আরো সংবাদ