০১ ডিসেম্বর ২০২০

৩ বছরেও সুরাহা হয়নি শিশু তাহারাত হত্যারহস্যের

হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু তাহারাত ও (ডানে) অভিযুক্ত আরিফ - ছবি : সংগৃহীত

চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে শিশু তাহারাত হত্যাকাণ্ডের তিন বছরেও কোনো সুরাহা হয়নি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা ও ঘটনার সাথে জড়িত এক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিলেও ময়নাতদন্ত রিপোর্টে ওই শিশুকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এখন পর্যন্ত এই মামলায় একজন আসামি আটক হয়েছে মাত্র। কিন্তু ঘটনার সাথে আরো লোক জড়িত থাকতে পারে বলে দাবি করেছে হতভাগ্য ওই শিশুর বাবা মো: মনির হোসেন।

জানা যায়, শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের আয়নাতলী দক্ষিণ পাড়া জিয়াউদ্দিন পাটোয়ারী বাড়ির মৃত হেদায়েত উল্যাহর ছেলে মো: মনির হোসেনের ছেলে মো: আশরাফুল ইসলাম তাহারাত (১১) ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার নিখোঁজ হয়। শাহরাস্তি থানা এলাকা, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও নোয়াখালীর চাটখিল এলাকায় খোঁজাখুঁজির সময় গত ২৬ আগস্ট দুপুরে পুলিশ পাশের সেতীনারায়ণপুর গ্রামের স্পেন প্রবাসী নূরু ভুঁইয়ার বাড়ির পরিত্যক্ত রান্নাঘর থেকে লাকড়ি ও খড়কুটা চাপা অবস্থায় শিশুটির বিকৃত লাশ উদ্ধার করে। ঘটনার এক মাস পর ২২ সেপ্টেম্বর লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে তাহারাতকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে নিশ্চিত হবার পর ওইদিন তার বাবা মো: মনির হোসেন শাহরাস্তি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।

শাহরাস্তি থানাধীন উঘারিয়া তদন্ত কেন্দ্রের তদানীন্তন উপ-পরিদর্শক মো: রফিকুল ইসলামকে মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পুলিশ ওই মামলার কোনো ক্লু উদ্ধারে সক্ষম না হওয়ায় পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় পিবিআইকে।

ঘটনার পর প্রায় আড়াই বছর ওই এলাকার সেতীনারায়নপুর গ্রামের মফিজ মিয়ার ছেলে আরিফ হোসেন এলাকায় অনুপস্থিত থাকলেও তাকে নিহতের পরিবার বা পুলিশ কেউ সন্দেহ করেনি। চলতি বছরে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার একটি হত্যা মামলায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার মাস্টার বউবাজার বাউল সাহেবের বাড়ি থেকে আরিফকে আটকের পর বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়। তাহারাত হত্যাকাণ্ডে আরিফ জড়িত থাকতে পারে মর্মে শিশুটির বাবা মনির হোসেন পুলিশকে জানালে ওই মামলায় তাকে আটক দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গত ৮ আগস্ট আসামি আরিফ হোসেন চাঁদপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: কামাল হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে আরিফ জানান, ঘটনার আগে তিনি ঢাকায় একটি জিন্স প্যান্ট ওয়াশ কোম্পানিতে কাজ করতেন। সেখানে এক বড়ভাইয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। তার বিদেশ যাওয়ার খুব শখ কিন্তু অর্থের যোগান নেই একথা জানার পর ওই বড়ভাই তাকে এলাকা থেকে বাচ্চা অপহরণ করে তার অভিভাবকদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার অর্থ উপার্জনের পরামর্শ দেন। এরপর আরিফ গ্রামের বাড়ি চলে যান এবং সেখানে থাকাবস্থায় ওই পরামর্শের কথা মনে পড়ে তার। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি তাহারাতের বাড়ির সামনে মাচাংয়ে আড্ডা দিতে থাকেন।

ঘটনার দিন (২৪ আগস্ট, ২০১৭) বিকেল ৪টার দিকে মাচাংয়ে বসা অবস্থায় শিশুটি আরিফের কাছে কোরবানির গরুর বাজার কোথায় জানতে চান। আরিফ তাকে নূরু ভুঁইয়ার বাড়ির সামনে বসতে বলেন ও আরিফ তার চাচার বাড়ি গিয়ে ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসেন। সন্ধ্যা ৫টা বা সাড়ে ৫টার দিকে আরিফ দুটি পাখি ধরে আনার প্রলোভনে শিশুটিকে নূরু ভুঁইয়ার বাড়ির পিছনে খালি জায়গায় নিয়ে শুইতে বলেন। শিশুটি শুইলে আরিফ তার বুকের উপর বসেন এবং তার দু’হাত পায়ের নিচে চাপ দিয়ে ধরেন। বাম হাতে ভিকটিমের মুখ চেপে ধরে ডানহাতে থাকা চাকু দিয়ে তার গলা কাটেন। ৫ মিনিটের মধ্যে শিশু তাহারাতের মৃত্যু হলে তার দেহ রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ভিতরে ফেলে দেয় এবং চাকুটি বাড়ির বাউন্ডারির বাইরে থাকা জমিতে গেঁথে রাখে। এরপর বাড়িতে গিয়ে গোসল করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে থাকেন। রাত ৮টার দিকে এলাকার ছেলেদের সাথে তাহারাতকে খুঁজতে বের হন এবং পরদিন শুক্রবার ঢাকা চলে যান। যে বড়ভাইয়ের পরামর্শে তিনি শিশু অপহরণের সিদ্ধান্ত নেয়, সে বড়ভাইয়ের নাম তার মনে নেই বলে তিনি স্বীকারোক্তিতে আদালতকে জানান।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এলাকায় চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি আগানগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানিক হাজী বাড়ির তৃতীয় তলার বাসিন্দা পটুয়াখালী জেলার বাউফলের প্লেনশিট ব্যবসায়ী মো: শাহাবুদ্দিন চৌকিদারের ছেলে একটি মাদরাসার কিতাবখানার ছাত্র মো: মোকছেদুলকে (১৭) অপহরণ করে ২ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে শাহরাস্তি উপজেলার সেতীনারায়ণপুর গ্রামের আরিফ হোসেন, একই উপজেলার মো: রাজু (আরিফের বন্ধু) ও চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানাধীন চাকতাই এলাকার ফাহিম (ভিকটিমের সহপাঠী)। মোকছেদুলের বাবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা পরিশোধ করলেও তার ছেলেকে ফেরত না পেয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব-১০) শরণাপন্ন হন। র‌্যাব তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ফাহিমকে আটক করলে তার দেয়া তথ্যমতে কেরানীগঞ্জ থানাধীন হাবিবনগর রতনের খামারের পাশে পরিত্যক্ত বালুর মাঠের নিচু জমিতে মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় মোকছেদুলের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার (মামলা নং ৫০/১১০) মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে।

এদিকে মুক্তিপণের জন্য মো: আশরাফুল ইসলাম তাহারাতকে একাই আরিফ হোসেন হত্যা করেছে একথা মানতে রাজি নন তার বাবা ও মামলার বাদী মো: মনির হোসেন। তার মতে, আরিফ একার পক্ষে তার পুত্রকে হত্যা করতে সক্ষম নন। আরিফের সাথে আরো লোকজন জড়িত থাকতে পারে। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য তার ছেলেকে আটক করা হলেও তার কাছে কেউ মুক্তিপণ দাবি করেনি। নিহতের লাশ উদ্ধারের সময় দেখা গেছে, তার মাথা হতে কোমর পর্যন্ত এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হয়েছে। ঘটনার সময় ওই বাড়ির মঞ্জুর হোসেন বাবু’র অটোরিকশার ব্যাটারির এসিড শূন্য ছিল। আদালতের স্বীকারোক্তিতে আরিফ যে বড়ভাইয়ের কথা বলেছিল সেই বড়ভাইয়ের নাম না বলে এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের বাঁচাতে চাচ্ছেন। ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচারের জন্য এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের খুঁজে বের করার দাবি জানান মনির হোসেন।

চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: জোবায়েদ কবির বাহাদুর জানান, মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে এই মামলায় জড়িত এক আসামি গ্রেফতার হয়েছে। আটককৃত আরিফ হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানন্দি দিয়েছেন বলে মামলার বাদী সূত্রে জানতে পেরেছি। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অপরাধ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। আশা করছি, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো: কবির হোসেন জানান, আদালতের স্বীকারোক্তিতে আসামি আরিফ হোসেন একাই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রদানের প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে, চলতি বছরের প্রথমদিকে তাহারাত হত্যাকাণ্ডের আদলেই ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে হত্যা করা হয় মাদরাসাছাত্র মো: মোকছেদুলকে (১৭)। যার সাথে জড়িত থাকায় তাহারাত হত্যাকাণ্ডের একমাত্র আসামি শাহরাস্তি উপজেলার সেতীনারায়ণপুর গ্রামের আরিফ হোসেন, একই উপজেলার মো: রাজু (আরিফের বন্ধু) ও চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানাধীন চাকতাই এলাকার ফাহিমকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো: ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব।


আরো সংবাদ