০৬ এপ্রিল ২০২০

পাত্রী দেখেও বিয়ে করা হলো না জসিমের

দুই সহোদরের লাশের খাটিয়ার পাশে আরেক ভাইয়ের আহাজারি। নিহত জসিম - ছবি : নয়া দিগন্ত

সব ঠিকঠাক থাকলে শিগগিরই বিয়ের পিঁড়িতে বসতো জসিম উদ্দিন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বিয়ে করা হলো না তার। ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিয়েছে প্রাণ। একা নয় সাথে আপন ছোটভাইও দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।

গত শনিবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতী জাঙ্গালিয়া এলাকায় ট্রাক-হিউম্যান হলার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৫ জন নিহতের ঘটনায় পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বটতলী মোটর স্টেশনের মোবাইল কর্ণারের দোকানদার তাওহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘লোহাগাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আমার পাশেই দাঁড়িয়ে জামায়াতে এশার সালাত আদায় করেছে জসিম। পরে অফিস বন্ধ করে ছোট ভাই বেলালকে সাথে নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। জসিম আমাদের বিল্ডিংয়ে ঐতিহ্য কম্পিউটার নামে একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার চালাতো। পাশাপাশি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করতো। সম্প্রতি বিয়ের প্রস্ততি নিয়েছিল। বিভিন্ন জায়গায় একাধিক পাত্রীও দেখা হয়েছিল।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার আইডির ইউজার নেম ছিল নীর জসিম। আজ যেন সত্যিকার অর্থেই চিরদিনের জন্য আজন্ম নীরবতার পথে হাটলেন এই তরুণ। রোববার সারাদিন এলাকায় মুখে মুখে ছিল মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার কথা। এঘটনায় ঝরে গেছে ১৫ তাজা প্রাণ। জসিমের সহোদর তাওরাত হোসেন বেলাল ছিল হাফেজে কোরআন। সে তার বড় ভাইয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসতো। দুই সন্তানকে একসাথে হারিয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে মা-বাবা।

নিহতদের বড় ভাই সাংবাদিক কাইছার হামিদ কান্নাগড়িত কণ্ঠে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি আমার মা-বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। দুই ভাইয়ের জন্য সকলের কাছে দোয়া চান তিনি।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি দাবি উঠছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহসড়ক চারলেইনে উন্নীত করার। এই মহাসড়কে লেগেই থাকে দুর্ঘটনা।

প্রায় প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে জাঙ্গালিয়ার টেক এলাকায় কিছুদিন পর পর বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কয়েকমাস আগেও সেখানে আটজন নিহতের ঘটনা ঘটেছিল।

অভিযোগ উঠেছে, ফিটনেস বিহীন, লক্করঝক্কর মার্কা এই হিউমান হলারগুলো মহাসড়কে চলাচলের অনুমতি না থাকলেও পুলিশকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে চলতো এসব গাড়ি। এসব বন্ধে প্রশাসনের উর্দ্ধতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

এদিকে নিহতদের বেশ কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। রোববার সকালে লোহাগাড়া থানার ডিউটি অফিসার দুলাল বাড়ৈ মোবাইলে নয়া দিগন্তকে বলেন, চুনতী জাঙ্গালিয়ার টেকের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সবার পরিচয় এখনো পাওয়া যায় নি। ঘটনাস্থলে ১৩ জন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে আরো ২ জন সর্বমোট ১৫ জন নিহত হয় বলে নিশ্চিত করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

তারা হলেন, চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের কোরবানিয়া ঘোনার আব্বাস উদ্দিনের পুত্র জসীম উদ্দিন (৩৩) ও তাওরাত হোসেন বেলাল (১৮), বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারীর কালা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ বাদশা (৩৮), চকরিয়ার উত্তর হারবাংয়ের মৃত আমির হোছেনের পুত্র আবদুস সালাম (৭০), লোহাগাড়ার চুনতি মীরখিলের আবদুর রশিদের পুত্র সিরাজুল ইসলাম (৪০), বড়হাতিয়ার কুমিরাঘোনার আবদুল মাবুদের পুত্র মোহাম্মদ রুবেল (২০), লোহারদিঘির জাফর আহমদের পুত্র জহির উদ্দিন (২৪), উত্তর কলাউজানের আবুল হোছনের পুত্র মোহাম্মদ এনাম (৪৪), অজ্ঞাত আবদুর রশিদ (৫০), নবী হোছাইন (৪০), লেগুনা চালক চকরিয়ার মৃত ছৈয়দ আহমদের পুত্র ফরহাদ উদ্দিন (১৮) ও হেলপার খুটাখালী গর্জনীয়া পাহাড় এলাকার নূর মোহাম্মদের পুত্র মোহাম্মদ সুমন (১৫) এর পরিচয় পাওয়া গেছে।

এদিকে রোববার সকাল ১১টায় আজিজনগর এলাকার নিজ গ্রামে দুই সহোদর জসিম উদ্দিন ও তাওরাত হোসেন বেলালের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তারা দুইজনই বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ পত্রিকার সাবেক লোহাগাড়া প্রতিনিধি কাইছার হামিদের ছোট ভাই। করোনা পরিস্থিতিতে সর্তকর্তার মধ্যেও জানাজায় মুসল্লীর ঢল নামে।


আরো সংবাদ