২৮ মার্চ ২০২০

মিরসরাইয়ে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয়

মিরসরাইয়ে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয় - সংগৃহীত

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে চলতি মৌসুমে বোরো চাষে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। উপজেলায় ১ হাজার ৪৫০ হেক্টরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে মাত্র ৯০০ হেক্টরে। বাকি জমিতে বোরো আবাদের সম্ভাবনা কম। এ কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫০০ হেক্টর কম জমিতে বোরো আবাদ হবে।

উপজেলার অনেক এলাকায় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও অনেক কৃষক থেমে নেই বোরো আবাদে। কিন্তু ধানের মূল্য কম হওয়ায় অনেক কৃষক আগ্রহ হারাচ্ছে। আবার ফেনী নদী থেকে সেচের ক্ষেত্রে প্রি-পেইড কার্ড চালুতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা আরো হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের রহমতাবাদ গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বোরো চাষাবাদ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন মাঠে। তিনি বলেন, গত বছর নিজের ও বর্গাসহ দেড়কানি জমিতে বোরা চাষ করেছি। মহামায়া সেচ প্রকল্প হয়ে দুর্গাপুর হয়ে বয়ে আসা খালটি মজে যাওয়ায় পর আবার খনন করায় এবার পানি পর্যাপ্ত। কিন্তু তাঁর মতো শত শত কৃষকদের দুঃশ্চিন্তা এখন ধানের দাম বাজারে একদম কম। সরকার ২৬ টাকা মূল্য দিলে ও পাইকাররা দিচ্ছে মাত্র ১৭ টাকা।

অপরদিকে সার কীটনাশক, মজুরি খরচসহ সব মিলিয়ে ধান ঘরে তুলে লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই। তাই এই মাঠের কৃষকরা বোরো চাষ করলেও পার্শ্ববর্তী অনেকেই ঝুঁকি নিতে নারাজ।

জানা গেছে, উপজেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ পাম্প আছে ১৪০টি। মূলত বোরো মৌসুমে সেচ দেয়ার জন্য এসব পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তবে চলতি বোরো মৌসুমে ৭০ শতাংশ সেচ পাম্পই বন্ধ পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রমাগত লোকসানের কারণে ধান আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। কৃষকরা আগ্রহী না হওয়ায় ভর মৌসুমেও সেচ পাম্প চালু করা হয়নি। এ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় বিএডিসির ১৪০টি সেচ পাম্প আছে। এসব পাম্প দিয়ে সেচের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে স্থানীয়রা কৃষকরা বোরো ও বিভিন্ন শাকসবজির চাষ করে থাকেন। বিনিময়ে বিএডিসি নির্দিষ্ট একটি ফি নিয়ে থাকে। কিন্তু এবার বোরো মৌসুমে প্রায় ১০০টি সেচ পাম্পই বন্ধ পড়ে আছে। অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি পাম্প দিয়ে এবার সেচ দেয়া হচ্ছে না। এতে যেসব কৃষক বোরো আবাদ করছেন তারাও বিপাকে পড়েছেন।

উপজেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো আবাদে আলাদা করে সেচের প্রয়োজন হয়। তাই খরচ বেশি পড়ে। কিন্তু উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের বাজারমূল্য কম হওয়ায় তারা এবার বোরো আবাদ করছেন না বা কমিয়ে দিয়েছেন।

তারা জানান, প্রতি কানি জমিতে বোরো আবাদ করতে খরচ হয় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু এ জমি থেকে ধান পাওয়া যায় ৪৫-৫০ মণ, যার বাজারমূল্য ২০-২৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক কানিতে কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা লোকসান হয়। তাই অনেকে বোরো আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

এক কৃষক বলেন, এক শতক জমিতে বোরো আবাদ করতে খরচ হয় ২৫০-৩০০ টাকা। কিন্তু ধান হয় মাত্র ১২-১৫ কেজি, যার বাজারমূল্য মাত্র ১৫০-১৬০ টাকা। এত লোকসান দিয়ে কে ধান চাষ করবে?

কৃষক আহসান উল্লাহ জানান, আগে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে কৃষককে বিপাকে পড়তে হতো। খরায় মাটি ফেটে ধানের ফলন কমে গিয়ে লোকসান গুণতে হতো। এখন আবার সেচের জন্য কার্ড কিনতে গন্ডা প্রতি কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। একদিকে ধানের দাম কম, অপর দিকে চাষের খরচ সীমাহীন বৃদ্ধি এভাবে হলে বাপ দাদার কৃষি জমি সবটুকু চাষ না করে বিক্রি দিয়ে অন্য পেশায় যেতে হবে।

উপজেলা সহকারী কৃষি কাজী নুরুল আলম বলেন, এবার উপজেলায় ১৪৫০ হেক্টর জমি ছিল লক্ষ্যমাত্রা। কিন্তু ১২ শত হেক্টর পূরণ হওয়াও কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে হয় না। প্রথমত কৃষকরা মূল্য পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত করেরহাট অঞ্চলে পাউবো প্রবর্তিত নিয়মে নদী থেকে সেচ কার্যক্রমে কার্ড সিস্টেম করায় সেখানে অনেক কৃষক অনুৎসাহিত হয়ে এবার চাষাবাদ করতে রাজী নয়। সব মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বহুমুখী বাধার সম্মুখীন কৃষি বিভাগ বলে জানান তিনি।

এই বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রঘুনাথ নাহা বলেন, আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টাসহ নানাভাবে বীজ সার ও অন্যান্য সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করছি। সরকার ধানের বিষয়ে আরো আন্তরিক উদ্যোগ নিলে কৃষকরা সুফল পেত।


আরো সংবাদ