০৬ আগস্ট ২০২০

এসএসসির ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায় : এক অসহায় মায়ের কান্না

আমেনার অসহায় মায়ের কান্না - ছবি : নয়া দিগন্ত
24tkt

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা রতনপুর আবদুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান আমেনা আক্তার। আমেনার বাবা গনি মিয়া মারা গেছেন ১০ বছর আগে। ছোট ভাই সুমন সেলুনে কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। ফরম পূরণের অতিরিক্ত টাকা জোগার করতে গিয়ে চোখের পানিতে ভাসছেন তার দুঃখিনী মা। রাত-দিন সেলুনে কাজ করে বড় বোনের পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা জোগার করেছে ১২ বছরের সুমন।

সুমন বলে, ‘আমার লেখাপড়ার ইচ্ছা থাকলেও সংসারের অভাবের কারণে লেখা পড়া করতে পারছি না। রাত-দিন সেলুনে কাজ করে বড় বোনের পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা জোগার করেছি।’

আমেনার মা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘অভাবের সংসার, এক বেলা খেলে আরেক বেলা খেতে পারি না। ইস্কুলের আপা পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিল, গ্রামের কিছু লোকজনের সাহায্য নিয়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে আমার মেয়ের ফরম পূরণ করেছি।’

২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষার সরকারি নিবন্ধন ফি বিজ্ঞান বিভাগ- ১৯৭০ টাকা, মানবিক বিভাগ ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা- ১৮৫০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা মানছে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিভাবকরা স্কুল কর্তৃপক্ষের ধার্য করা টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

একাধিক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরম পূরণ নামে রীতিমতো বাণিজ্য হয়েছে। উপজেলার রতনপুর আবদুল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ে বুধবার সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফরম পূরণ ফি বাবদ তিন হাজার চার শ’ টাকা ও কোচিং ফি বাবদ ছয় শ’ টাকা, আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে তাদেরকে কোনো রশিদও দেয়া হয়নি।

রতনপুর আবদুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির সদস্য ডা: মো: শাহজান বলেন, ‘আমি নিজে একজনের ফরম পূরণের জন্য তিন হাজার টাকা দিয়েছি, কিন্তু আমাকে কোনো রিসিট দেয়া হয়নি।’

ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসাক মিয়া, ভোমিক, তাহমিনা আক্তার, নাহিদা, আরফিন, খাদিজা বেগম, পপি, মুক্তা ও সুমাইয়া বলে, আমাদের কোনো বকেয়া বেতন নেই। ফরম পূরণের জন্য তিন হাজার চার শ’ টাকা আর কোচিংয়ের জন্য ছয় শ’ টাকা নিয়েছে। আমরা জমা দেয়ার টাকার রিসিট চাইলে পরে দিবে বলে আমাদেরকে বিদায় করে দেন।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও সাবেক সভাপতি আবু উমর মিল্কী বলেন, প্রধান শিক্ষকের ইচ্ছামতো ফরম পূরণের টাকা নিচ্ছেন, আমার কাছে অনেকেই অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে রতনপুর আবদুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তানজিনা আক্তার আলেয়া বলেন, ‘দুই হাজার টাকা করে নিয়েছি, যাদের বকেয়া বেতন আছে তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকাও নিয়েছি। রিসিট না থাকার কারণে রিসিট দিতে পারি নাই। পরে রিসিট এনে সবাইকে দিয়ে দেব।’

নবীনগর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ফরম পূরণের সাথে জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সালের বেতনসহ আলাদা রসিদে ৮৫০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে এমন অভিযোগের জবাবে, নবীনগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু মোছা জানান, ‘প্রথমে বোর্ডের নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত ৮৫০ টাকা নেয়া হলেও বর্তমানে বিভিন্ন খরচ ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতের জন্য ৪০০ টাকা নেয়া হয়েছে। যাদের কাছ থেকে ৮৫০ টাকা নেয়া হয়েছে তাদেরকে ৪৫০ টাকা ফেরৎ দেয়া হবে।’

এ বিষয়ে নবীনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোকাররম হোসেন জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই বিদ্যালয়ে (আজ বৃহস্পতিবার) পরিদর্শন করেছি। ফরম পূরণে বোর্ডের নির্ধারিত ফি’র চেয়ে কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত আর কোনো খাতে টাকা নেয়া যাবে না। অতিরিক্ত টাকা যাদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে তাদের টাকা আগামী সোমবারের মধ্যে ফেরত দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নবীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘বোর্ড কর্তৃক উল্লেখিত ফি’র অতিরিক্ত কোনো প্রকার টাকা নেয়া যাবে না। বোর্ডের নিয়ম মেনে চলার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিকট অনুরোধ করেছিলাম। এরপরও যদি কেউ ফরম পূরণের সময় অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মানবিক কারণে অসহায় আমেনাকে সহযোগিতা করতে ০১৮৩৫৯২৩৮৩৬ নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে।


আরো সংবাদ