১৩ আগস্ট ২০২২
`
টুংটাং শব্দে মুখরিত কামারপাড়া

সামনে কোরবানির ঈদ, তাই ব্যস্ত লালমোহনের কামারশিল্পীরা

সামনে কোরবানির ঈদ, তাই ব্যস্ত লালমোহনের কামারশিল্পীরা - ছবি : নয়া দিগন্ত

আগামী ১০ জুলাই রোববার দেশে ঈদ উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমোহনের বিভিন্ন হাট-বাজারের কামাররা। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের ব্যস্ততা। এই ঈদে গরু, ছাগল, মহিষ ইত্যাদি কোরবানির পশু হিসেবে জবাই করা হয়। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কোরবানির পশু জবাই চলে। এসব পশুর গোশত কাটতে দাঁ-বটি, ছুরি-কাতু, ধামা, চাপাতি ইত্যাদি ধাতব হাতিয়ার অপরিহার্য।

যেহেতু কোরবানির পশু কাটা-কুটিতে চাই ধারালো দাঁ, বটি, চাপাতি ও ছুরি। তাই কয়লার চুলায় দগদগে আগুনে গরম লোহার পিটাপিটিতে টুং টাং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে ভোলার লালমোহনের কামারপাড়াগুলো। লকডাউনের কারণে গত বছর অনেকেই পশু জবাইয়ের যন্ত্রপাতি ঠিক করতে পারেনি দোকানগুলো বন্ধ থাকার কারণে।

এবার কামারশালাগুলো ব্যাপকভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সেই যন্ত্রপাতি তৈরিতে। আগুনের শিখায় তাপ দেয়া হাতুড়ি পেটানোর টুং টাং শব্দে তৈরি হচ্ছে দা-বটি, চাপাতি ও ছুরি। পশু কুরবানিতে এসব অতীব প্রয়োজনীয়। দম ফেলারও যেন সময় নেই কামারদের। নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজ করছেন শিল্পীরা। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ চলে তাদের। সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও কোরবানির মৌসুমে ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েকগুণ ব্যস্ততা বেড়ে গেছে কামারদের।

কয়েকজন কামারের সাথে আলাপ করে জানা যায়, পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, দাঁ ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বটি ২৫০ থেকে ৫০০, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চাপাতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে অনেক ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

পশু জবাইয়ের সরঞ্জামাদি কিনতেও লোকজন ভিড় করছেন কামারদের এসব দোকানে। আগে যেসব দোকানে দু’জন করে শ্রমিক কাজ করতো, এখন সেসব দোকানে ৫-৬ জন করে শ্রমিক কাজ করছেন।

কামার দোকানদারদের অভিযোগ কোরবানির ঈদ উপলক্ষে কয়লার দাম ও শ্রমিকদের দাম বেড়ে গেছে। অপরদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ ঈদ উপলক্ষে দাঁ, চাপাতি ও ছুরির দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। ছুরি শান দেয়ার জন্য ৫০ টাকা থেকে শুরু করে কাজের গুণাগুণের উপর ভিত্তি করে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে।

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে কামারদের বেচা-কেনা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। কয়লার দামও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলার কর্তার হাট, গজারিয়া, রায়চাঁদ, চতলা, লর্ডহার্ডিঞ্জ, মঙ্গল সিকদার, হরিগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা গেছে কামারদের কর্মব্যস্ততা।

রায়চাঁদ বাজারের বাবুল কর্মকার, চতলা বাজারের শংকর চন্দ্র দাস বলেন, সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কোরবানির ঈদের সময় আমাদের কাজের চাহিদা বেড়ে যায়। ঈদ চলে গেলে আমাদের বসে থাকতে হয়, কাজ থাকে না। পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ এবং ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ বহন করতে কষ্ট করতে হয় আমাদের।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক কামার বা কর্মকার বলেন, সরকারের প্রতি আমাদের প্রাণের দাবি, আমরা যারা এ পেশায় আছি তাদেরকে যেন সরকারিভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। মঙ্গল সিকদারের কামার বা কর্মকার নিত্যলাল ও নিমাই চন্দ্র বলেন, ঈদকে সামনে রেখে কাজের চাপ বেশি। কাজের চাপে কখন খাওয়ার সময় চলে যাচ্ছে আমরা টেরও পাই না। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে আমাদের বিক্রি তত বাড়ছে।

রায়চাঁদ বাজারের কর্মকার বাবুল চন্দ্র দাস বলেন, নতুন করে অর্ডার নেয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে বাইরের এলাকা থেকেও অর্ডার নেয়া হয়েছে। সারা বছর কাজের চাপ থাকে না। যা লাভ এই ঈদ মৌসুমেই। তাই ঈদে সামান্য একটু বেশি নিয়ে থাকি। তবে এবারের ঈদে চাপ বেশি। যেহেতু লকডাউনে দোকান বন্ধ ছিল, এ কারণে কাজের চাপ বেড়েছে।

কামাররা জানান, ঈদ এলে লোহার দাম না বাড়লেও কয়লার দাম বেড়ে যায়। ফলে তাদের ব্যবসা চালাতে বেশ বেগ পেতে হয়। কামার শিল্পীদের দাবি, সরকার যেন এ শিল্পে ভর্তুকি দিয়ে তাদের বেঁচে থাকার একটা সুব্যবস্থা করে দেয়।


আরো সংবাদ


premium cement