১২ আগস্ট ২০২০

আষাঢ় শেষের পথে, কিন্তু হাসি ফুটছে না জেলেদের মুখে

-
24tkt

ভোলার লালমোহনের মেঘনায় ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে ইলিশ উঠছে না। দেখা দিয়েছে আকাল। হতাশ হয়ে পরছে জেলে-মাঝি-মাল্লারা। তবুও মাছ শিকারে যাচ্ছে জেলেরা। কখনো চারটি, কখনো সাতটি, সর্বোচ্চ দুই হালি করে ইলিশ মিলছে। এতে করে তেল খরচ এবং ১৪ থেকে ১৬ জন মাঝি মাল্লার খরচ পোষায় না। যে দাদন নিয়ে বা দেনা করে নদীতে নামতে হয়েছে তা আর ফিরিয়ে দেয়া যাচ্ছে না মহাজনদের। কথাগুলো আক্ষেপ করে বললেন মেঘনা নদীর কূলবর্তী ভোলার লালমোহন কামারের খালের জেলে নজু ও ইউসুফ মাঝি।

তারা জানান, গত বছর এই দিনে নৌকা ভরে ইলিশ নিয়ে ফিরেছেন। সবার দৈনিক খরচ পোষাতো। আর এ বছর সম্পূর্ণ তার উল্টো। গভীর সমুদ্রে ইলিশের দেখা মিললেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে যেতে পারে না ক্ষুদ্র জেলেরা। গত বছর এই দিনে চার জেলের সলিল সমাধি হয়েছে গভীর সমুদ্রে গিয়ে। ডুবেছে তিনটি ট্রলার। আহত হয়েও উদ্ধার হয়েছে ওই তিন ট্রলারের আরো ৪৪ জন জেলে। মেঘনা নদী এ বছর ইলিশ শূন্য। ভরা মৌসুমে মাছ না পাওয়ায় জেলে পাড়ায় চলছে হাহাকার। সব জেলেরাই কোনো না কোনোভাবে দায় দেনাগ্রস্ত। মেঘনা নদীর উপরই তাদের ভরসা। এ মেঘনাতেই জীবিকা নির্বাহ করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। শত দেনা থাকলেও আশা থাকে নদীতে নৌকা ভরে ইলিশ শিকার করবে। সেই ইলিশ বিক্রি করে পরিবার, সন্তান ও মা-বাবাকে নিয়ে সুখে কাটবে ইলিশ মৌসুমটুকু। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আষাঢ় শেষ হয়ে যাচ্ছে, এখনো জেলেদের মুখে হাসি নেই। ইলিশ সব গভীর সাগরে চলে গেছে, যেখানে গেলে জীবন নিয়ে ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই জেলেদের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে গত বছর লালমোহনের চার জেলের সলিল সমাধি হয়েছে। সে আতঙ্কে গভীর সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ জেলেদের। মেঘনা নদীতে যা পায় তা নিয়েই ভরসা।

সরেজমিনে লালমোহনের বাতিরখাল মৎস্য আড়তে গিয়ে কথা হয় মৎস্য আড়ৎদার মোঃ ছালাউদ্দীন দালালের সাথে। তিনি জানান, বাতিরখাল ঘাটে তিন শ’ নৌকা আছে। ব্যবসার অবস্থা ভালো না। এ বছরের মতো এতো কম মাছ আর কখনো পড়েনি। মেঘনায় এখন ইলিশের আকাল। জলবায়ু পরিবর্তন ও ভারতের পানি এসে পলি জমে মেঘনায় অনেক চর হয়ে গেছে। নদীতে এখন গভীরতাও নেই। মেঘনায় ইলিশ না থাকলেও গভীর সাগরে ইলিশ ধরা পড়ছে প্রচুর। সেখানে বড় বড় ফিসিং বোট নিয়ে চট্টগ্রাম, মহিপুর, কুয়াকাটার জেলেরা মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জেলেরা সেখানে যেতে পারে না। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গত বছরের ৩০ জুলাই এখানকার ফিরোজ মাঝির এফভি জিহাদ নামে একটি ট্রলার সাগরের মোহনায় যায় ইলিশ শিকারে। সেদিন সাগরের কালকিনির চর নামক স্থানে ১৫ মাঝি মাল্লাসহ ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে ১৪ জেলে উদ্ধার হলেও এখন পর্যন্ত নূরুদ্দীন নামের এক জেলেকে পাওয়া যায়নি। গভীর সমুদ্রে নুরুদ্দীনের সলিল সমাধি হয়। উদ্ধার হয়নি জাল সরঞ্জামসহ ট্রলারটি। নূরুদ্দীনের আরেক বড় ভাই হারুন প্রায় ৩০ বছর আগে মাছ ধরতে গিয়ে সাগরে সলিল সমাধি হয়। গত বছরের ১ আগষ্ট একই এলাকার ইউসুফ মিয়ার একটি ট্রলার ১৪ জন জেলে নিয়ে ডুবে যায়। এতে সবাই উদ্ধার হলেও ট্রলারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের (১৪ আগষ্ট) মঙ্গলবার লালমোহন লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের সরকারের খাল নামক ঘাটের একটি মাছ ধরা ট্রলার ১৯ জন জেলে নিয়ে সাগরের কালকিনি নামক স্থানে ডুবে যায়। এতে ১৬ জনকে পাশ্ববর্তী বেতুয়া ঘাটের একটি ট্রলার উদ্ধার করতে পারলেও তিনজনকে উদ্ধার করতে পারেনি আজও।

নিখোঁজ তিন জেলে লালমোহন পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের পাঙ্গাসিয়া গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে মোঃ খালেক ও একই এলাকার খালেক বেপারীর ছেলে মোঃ আবু ছায়েদ এবং আসলামপুর ইউনিয়নের কালামুল্লাপোল এলাকার হাসেমের ছেলে মিরাজ। ওই ট্রলারটিও জালসহ ডুবে যাওয়ায় কিছুই পায়নি ট্রলার মালিক। এ কারণেই মেঘনার জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ইলিশ শিকারে যেতে চাচ্ছে না।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, গভীর সাগরে গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিনের অবরোধ চলমান রয়েছে। এ সময় গভীর সমুদ্রে গিয়ে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ে প্রজনন করে, সে কারণেও গভীর সাগরে মাছ শিকার করতে যাচ্ছে না জেলেরা।

এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুদিপ্ত মিশ্র বলেন, মেঘনায় ইলিশ এখন না পাওয়া গেলেও কিছুদিনের মধ্যে হয়ত পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যেতে পারে। জেলেদের হতাশ না হয়ে অপেক্ষা করতে হবে।


আরো সংবাদ