০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

চলনবিলে মাছের আকাল

বেশির ভাগ শুঁটকি চাতাল খালি
মহিশলুটিতে মাছের অভাবে ফাঁকা পড়ে আছে শুঁটকি চাতাল : নয়া দিগন্ত -

মৎস্যভাণ্ডারখ্যাত চলনবিলে বর্তমানে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। এ কারণে প্লাবনভূমিতে এই শুঁটকি মৌসুমেও মাছসঙ্কটে পড়েছেন চাতাল মালিকরা। তাই শুঁটকি ব্যবসায়ীরা এবার লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
এবারের বর্ষায় চলনবিলে আগের মতো সেই উথাল-পাথাল ঢেউ ছিল না। পানির অভাবে প্লাবনভূমিসহ চলনবিলে মাছের বংশ বিস্তার ব্যাহত হয়েছে। জলাভূমিতে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে মাছের উৎপাদন। বিলে মাছ ধরা ও মাছ শুকানোর এই মৌসুমে অধিকাংশ শুঁটকি চাতালই খালি পড়ে আছে। মহাজনদের কাছ থেকে দাদনে টাকা নিয়ে চাতাল মালিকরা এখন লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা।
চলনবিল মূলত পদ্মা ও যমুনার প্লাবনভূমি। একটা সময় ছিল যখন চলনবিলের মাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলত। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ বরাবর ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মিত হয়। এতে চলনবিলের সাথে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় চলনবিলের মাছ ট্রেনে কলকাতায় যেত। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মিত হয়। ২০০২ সালে চলনবিলের বুক চিড়ে নির্মাণ করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বনপাড়া-হাটিকুমরুল-যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক। এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটারের চলনবিলের দেহের উপর এত অত্যাচারের পর এখন টিকে আছে শুধু ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে মাত্র ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সারা বছর পানি থাকে।
দেশী মাছকে কেন্দ্র করে চলনবিলে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৭০টি অস্থায়ী শুঁটকির চাতাল। তারাশের মহিষলুটি এলাকার চাতাল মালিক কামাল উদ্দিন জানান, গত বছর তার দু’টি চাতালে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ মণ শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। এ বছর চলনবিলের প্লাবনভূমিতে মাছ ধরা পড়ছে কম। এর ফলে মহিষলুটির ছয়টি চাতালসহ অধিকাংশ শুঁটকি চাতালে তাজা মাছের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ২৭০টি চাতালে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা মূল্যের চার শ’ থেকে সাড়ে চার শ’ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাড়ে চার শ’ টন শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় এক হাজার ৩৫০ মেট্্িরক টন কাঁচা মাছের প্রয়োজন। এ দিকে চলতি মৌসুমে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না। ফলে শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলে চাতাল মালিকরা জানান। তারা বলেন, মৌসুমের শুরুতে বড় বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দাদন নিয়ে চাতাল তৈরি করা হয়েছে। দাদনের সেই টাকা স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের অগ্রিম দিয়ে রাখতে হয়েছে মাছের জন্য; কিন্তু বিলে মাছের আকাল।
শুঁটকি মাছ মান ভেদে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের (ভালো মানের) শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। আর ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের শুঁটকি দেশের ভেতরে দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়।
চলনবিলের শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে-বিদেশে মিঠা পানির শুঁটকি মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে; কিন্তু এ ব্যাপারে মৎস্য বিভাগ উদাসীন। শুঁটকি উৎপাদনকারীদের স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করলে দাদন ব্যবসায়ীদের হাত থেকে শুঁটকি উৎপাদনকারীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেত।


আরো সংবাদ


premium cement