২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯, ২৮ সফর ১৪৪৪ হিজরি
`

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ধকলে অস্থির আমন আবাদ

বৃষ্টিশূন্য মাঠে আমন আবাদের জন্য চাষ দেয়া হচ্ছে : নয়া দিগন্ত -

আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ। দুই পাশে ফসলি জমি আর ঝোপঝাড়। এই পথ ধরে এগিয়ে যেতে চোখে পড়ছে কর্মব্যস্ততা। বেশির ভাগ জমিতে আমন আবাদের জন্য চলছে ব্যস্ততা। জমিতে সেচ দেয়া শেষে কোদাল হাতে বাড়ি ফিরছিলেন নয়াকাটা গ্রামের কৃষক আবদুল আজিজ। সেচ মেশিন দিয়ে জমিতে পানি দেয়া হচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় এবার ধান উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে যাবে। চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই বীজ ও সার বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে। বৃষ্টির অভাবে জমি চাষ ও ধানের চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষকরা। অনেক কৃষকের আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে কয়েক দফা। এবার বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে আমনের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এপ্রিলের শুরু থেকেই এ অঞ্চলে তাপমাত্রাও অপেক্ষাকৃত বেশি। বর্ষাকালেও পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হয়নি। উপজেলার কয়েকজন কৃষক বলেন, বর্ষা মৌসুমের আমন আবাদে সাধারণত সেচের কোনো প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে এ বছর সেচযন্ত্র বসিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি সম্পসারণ বিভাগ জানায়, এ বছর ৩১ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পটুয়াখালী কৃষি সম্পাসারণ অধিদফতরের কার্যালয়ের উপপরিচালক এ কে এম মহিউদ্দিন জানান, জেলাভিত্তিক আবাদ ও উৎপাদনে পটুয়াখালী বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। এক মৌসুমে চাল উৎপাদন ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৭৯৮ টন। এ জেলায় মানুষের প্রয়োজন ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৬৫ টন। উদ্বৃত্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৩ টন চাল অন্য জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে পটুয়াখালীর সুনাম আছে। দেশে উৎপাদিত মুগ ডালের অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদিত হয় এখানে। দেড় হাজার কোটি টাকার তরমুজ আর সমপরিমাণ টাকার আমন ধান বিক্রি হয় এ জেলায়। চলতি রবি মৌসুমে প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৫০ টন মুগডাল উৎপন্ন হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এর সিংহভাগই অন্য জেলায় পাঠানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষি, পরিবহন, উৎপাদন, আমদানি, রফতানিসহ সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে মারাত্মক। আর এর মূল ভুক্তভোগী হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। বিশেষ করে কৃষিখাত থমকে দাঁড়াবে। হঠাৎ ডিজেলের দাম বাড়ার খবরে আকাশ ভেঙে পড়েছে কৃষকের মাথায়। গত বছরের নভেম্বরে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়ে। এবার নতুন করে ডিজেলের মূল্য ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ইউরিয়া সারে ছয় টাকা ও টিএসপিতে কেজি প্রতি আট টাকা মূল্যবৃদ্ধির ধকল। এখন প্রতি লিটার ডিজেল ১১৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর আগে গত বছরের ৪ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করেছিল সরকার। সরকার ডিজেলের দাম কম রেখে পেট্রল আর অকটেনের দাম বাড়ালে কৃষির ওপর কোনো প্রভাব পড়ত না। খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ত না। কারণ পেট্রল আর অকটেন তো ধনীদের তেল।
চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই বীজ ও সার বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে কৃষককে। সরকারি হিসাবে, প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ১০০, ইউরিয়া ৮০০, ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) ৮০০ ও এমওপির (মিউরেট অব পটাশ) দাম ৭৫০ টাকা। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দরে এসব সার বিক্রি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ১ আগস্ট থেকে ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু কৃষকদের ইউরিয়াসহ অন্য সব সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি তাপপ্রবাহের ফলে বর্ষা মৌসুমে মৌসুমি বায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেও জমাট বাঁধতে পারছে না। এতে বর্ষা মৌসুমে কম বৃষ্টি ঝরেছে। এবার জানুয়ারি থেকে তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সেই সাথে বৃষ্টিহীনতা তাপমাত্রাকে আরো অসহনীয় ও ঊর্ধ্বগামী করে তুলছে। জুন-জুলাই মূল বর্ষাকাল হলেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। মূলত অধিক তাপমাত্রার কারণেই এটা হয়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement