১১ আগস্ট ২০২২
`

উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম হাটে ক্রেতা নেই লোকসানের শঙ্কায় খামারিরা

বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুরহাটে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি গুরু আমদানি হলেও ক্রেতা কম : নয়া দিগন্ত -

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আগাম বন্যার ক্ষয়ক্ষতিতে দেশের অর্খনীতির পর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সেই ধাক্কা পড়েছে পশুরহাটগুলোতে। এদিকে পাবনা-সিরাজগঞ্জের গো-খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গবাদিপশু সড়ক ও নৌপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন পশুরহাটে পাঠিয়েছেন। এ অঞ্চলের খামারি, চাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সাধারণত হাইব্রিড জাতের গরু লালন-পালন করে থাকেন। হাট-বাজারে তিন থেকে চার মণ ওজনের গরুর চাহিদা ও দাম বেড়েছে। তবে হাইব্রিড জাতের গরুর চাহিদা ও দাম কমেছে। ফলে এ অঞ্চলের খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, এবার ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৯৮ লাখ। কিন্তু সারা দেশের খামার ও চাষিদের বাড়িতে এক কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার গরু-মহিষ, ছাগল, ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই চাহিদার তুলনায় ২৫ লাখ ৫০ পশু বেশি প্রস্তুত হয়েছে। গত বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল এক কোটি ১৯ লাখ পশু। এর মধ্যে ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। সেই হিসেবে গত বছরের ২৮ লাখ পশু অবিক্রীত ছিল। সংশ্লিষ্ট দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এবার কোরবানির পশুর যে চাহিদা নিরূপণ করেছে, তা থেকে ১৫-২০ শতাংশ গবাদিপশু বিক্রি কম হবে। কারণ ক্রেতাদের হাতে টাকা নেই।
গবাদিপশু বিশেষ করে গরু ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বেড়ার সিঅ্যান্ডবি চতুরহাট, নাকালিয়া, নগরবাড়িহাট, সাঁথিয়ার ধুলাউড়িহাট, আতাইকুলার পুষ্পপাড়াহাট, দাসুড়িয়াহাট, চাটমোহরের অমৃতকুন্ডা, শাহজাদপুরের তালগাছি, উল্লাপাড়ার গোয়ালিয়াহাট, গ্যাসেরহাট, তারাশ চলনবিল এলাকার নওগাঁহাট, চৌহালীর এনায়েতপুরহাট ও বেলকুচির সমেশপুর পশুরহাটে দেশি জাতের প্রচুর গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আমদানি হচ্ছে। ক্রেতার জন্য হাপিত্যেস করছেন বিক্রেতারা।
এ অঞ্চলের খামারি ও চাষিরা এবার সারা দেশের কোরবানীর হাটে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরু-মহিষ সরবরাহ করার জন্য প্রস্তুত করেছেন। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের গরু রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। কিন্তু বন্যার কারণে হাট-বাজারে গবাদিপশু বিক্রি হচ্ছে খুব কম। এবার গরুর বেপারীরা খামারি ও চাষিদের বাড়ি থেকে গরু কিনছেন না। হাটে দেশী গরুর প্রচুর আমদানি হচ্ছে। ছোট সাইজের ৩ থেকে ৪ মণ ওজনের গরু বেশি বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে প্রতি মণ গরুর গোশত ২৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এখন দাম কমে ২৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশী ক্রস পাবনা ব্রিড ও বিদেশী হাইব্রিড জাতের গরু প্রচুর আমদানি হলেও ক্রেতার অভাবে বিক্রি হচ্ছে কম। গত বছর যে গরু দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেই মানের গরু এক লাখ ২৫-৩০ হাজার টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ছাগল।


মঙ্গলবার উত্তরাঞ্চলের প্রধান পশুরহাট বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুরহাট সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাটে গবাদিপশুতে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। দূর-দুরান্ত থেকে চাষি, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খামারিরা শত শত ট্রাক, নসিমন, করিমন ও নৌকায় করে হাজার হাজার গরু নিয়ে এসেছে। হাটের মধ্যে জায়গা না হওয়ায় বাঁধের উভয় পাশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাব্যাপী পশুরহাট বসেছে। ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরনের গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া আমদানি হয়েছে। পশুরহাটে জায়গা না হওয়ায় অনেকেই গবাদিপশু ফেরত নিয়ে যেতে দেখা গেছে। কোরবানির এ সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেপারীরা এসে পাবনা-সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাটে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কিনতেন। সেলন্দা গ্রামের খামারি আজাদ হোসেন তার খামারের সবচেয়ে বড় ষাঁড় গরুটি বিক্রি করতে হাটে নিয়ে এসেছেন। আজাদ বলেন, দাম হাঁকিয়েছি তিন লাখ টাকা। কিন্তু এখন দেখছি ক্রেতা নেই। বেপারী নেই। স্থানীয় কিছু ক্রেতা ও বেপারী দাম বলছে, এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। বড় গরুর দাম একেবারেই নেই। বেপারী ও ক্রেতা না থাকায় বড় গরুর দাম কম বলে জানালেন বিক্রেতারা।
শাহজাদপুর উপজেলার চরবন্যা গ্রামের সামছুল মিয়া নামের গরু ব্যবসায়ী বললেন, এ সময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় বেপারীরা আসতেন হাটগুলোয়। তারা ট্রাকভর্তি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া নিয়ে যেতেন। কিন্তু এবার বন্যা ও আর্থিক সঙ্কটের কারণে দূর-দুরান্ত থেকে বেপারীরা আসছেন না। গরু বিক্রি করতে না পারায় সংসার চালানো নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। কয়েকজন খামারি জানিয়েছেন, কোরবানির ঈদে দেশি ও শংকর জাতের গরু ভালো দাম পাওয়া যাবে বলে আশা ছিল তাদের। কিন্তু বন্যা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে গোটা চিত্র। এতে কাপাল পুড়েছে এ অঞ্চলের খামারি ও মৌসুমব্যবসায়ীদের। তারা লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কোরবানির পশুর হাট বসে পাবনার বেড়া উপজেলার সিঅ্যান্ডবিতে। এবার দেশি গরুর দখলে রয়েছে হাটটি। তবে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেপারী ও ক্রেতা না আসায় গরু-মহিষের চাহিদা ও দাম দুটোই কমেছে। এবার হাটে গরুর চেয়ে ছাগল বিক্রি হচ্ছে বেশি। খামারিরা ভেবেছিলেন, এ বছর ভারতীয় গরু না আসায় ভালো দামে গরু বিক্রি করা যাবে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। বর্তমানে হাটে ৬০ থেকে এক লাখ টাকায় গরু এবং ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় ছাগল পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ডেইরি ডেভলপমেন্ট ফোরাম (বিডিডিএফ) সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ মানুষ এবার কোরবানি দিতে পারবে না। দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা খারাপ। এ ছাড়া ১৫টি জেলায় ভয়াবহ বন্যার কারণে হাটে পশু বিক্রি হচ্ছে কম। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে যে পরিমাণ গবাদিপশু আছে সেখান থেকেই ৩০ থেকে ৩৫ লাখ পশু এবার অবিক্রীত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement